সিসা বিষাক্ত ভারী ধাতু। এই ধাতু নীরবে লাখো মানুষের বিশেষ করে শিশু ও অন্তঃসত্ত্বা নারীদের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে চলেছে। রক্তে কতটুকু সিসা থাকলে মানুষ নিরাপদ, তার নির্দিষ্ট মাত্রা নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) শিশুর রক্তে প্রতি লিটারে ৩৫ মাইক্রোগ্রামের বেশি সিসার উপস্থিতি উদ্বেগজনক বলে মনে করে।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে সিসার দূষণে আক্রান্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশ চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে। প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ শিশু রক্তে উচ্চমাত্রার সিসা নিয়ে জীবনধারণ করছে। এ জন্য বাংলাদেশে শিশুদের সিসার দূষণ থেকে বাঁচাতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে আইসিডিডিআরবি।
বুধবার (৬ আগস্ট) রাজধানীর মহাখালীতে ‘বাংলাদেশে সিসাদূষণ প্রতিরোধ: অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক আলোচনা সভার আয়োজন করে আইসিডিডিআরবি। এই সভার উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশে সিসাদূষণের ব্যাপকতা এবং এর ভয়াবহতা তুলে ধরা। কীভাবে এ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব, সেই নির্দেশনা দেওয়া।
অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, ২০০৯–২০১২ সালের মধ্যে ঢাকার বস্তি এলাকায় ২ বছরের কম বয়সী ৮৭ শতাংশ শিশুর রক্তে প্রতি লিটারে সিসার মাত্রা ৫০ মাইক্রোগ্রামের বেশি ছিল। এই মাত্রা তাদের শারীরিক বৃদ্ধির প্রতিবন্ধকতার একটি প্রধান কারণ।
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন আইসিডিডিআরবির হেলথ সিস্টেমস অ্যান্ড পপুলেশন স্টাডিজ ডিভিশনের সিনিয়র ডিরেক্টর ড. সারাহ স্যালওয়ে। তিনি বলেন, ‘সিসাদূষণ বাংলাদেশের একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা, যা প্রায়ই আমাদের নজর এড়িয়ে যায়। বিশেষ করে দূষণ সৃষ্টিকারী শিল্পকারখানার আশপাশের শিশুরা এর বড় শিকার।’
স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক এবং আইসিডিডিআরবির সাবেক পরিচালক প্রফেসর স্টিভ লুবি বলেন, সিসা শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। এতে বুদ্ধিমত্তা ও শেখার ক্ষমতা কমে যায়। পরবর্তী প্রজন্মের ওপর স্থায়ী প্রভাব ফেলে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা নিশ্বাসের সঙ্গে যে বাতাস নিই, যে খাবার খাই, দূষিত মাটি বা ধূলিকণা স্পর্শ করি, এমনকি গর্ভাবস্থায় মায়ের প্লাসেন্টা থেকেও সিসা শরীরে প্রবেশ করে। এ রকম নানাভাবে সিসা আমাদের শরীরে প্রবেশ করে বলে এ থেকে বাঁচতে হলে এর মূল উৎসগুলো বন্ধ করা জরুরি।’
আইসিডিডিআরবির প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর ডা. মো. মাহবুবুর রহমান গত ১০ বছরের সিসা-সম্পর্কিত গবেষণার ফলাফল তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সিসাদূষণের প্রধান উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে সিসা ও ব্যাটারি-সম্পর্কিত শিল্পকারখানা, সিসাযুক্ত রং, প্রসাধনী ও রান্নার পাত্রের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। তবে আশার কথা হলো, হলুদের ভেজাল (লেড ক্রোমেট দিয়ে পালিশ করা) প্রতিরোধ করে বেশ সফলতা পাওয়া গেছে।
স্ট্যানফোর্ড ও আইসিডিডিআরবির একটি দল গর্ভবতী মহিলাদের রক্তে সিসাদূষণের অন্যতম প্রধান উৎস হলুদকে চিহ্নিত করার পর বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নেতৃত্বে সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং আইন প্রয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ফলে ২০১৯ সালে যেখানে ৪৭ শতাংশ হলুদের নমুনায় সিসা পাওয়া যেত, তা কমে ২০২১ সালে শূন্যের কাছাকাছি চলে আসে।
আইসিডিডিআরবির অ্যাসিস্ট্যান্ট সায়েন্টিস্ট ডা. জেসমিন সুলতানা ২০২২-২০২৪ সালের মধ্যে ঢাকায় পরিচালিত সাম্প্রতিক গবেষণার প্রাথমিক ফলাফল তুলে ধরেন। এই গবেষণায় ২-৪ বছর বয়সী ৫০০ শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
তিনি জানান, প্রত্যেক শিশুর রক্তেই সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে (মধ্যমমাত্রা: ৬৭ মাইক্রোগ্রাম/লিটার) এবং ৯৮ শতাংশ শিশুর রক্তে সিডিসির উদ্বেগজনক মাত্রা ৩৫ মাইক্রোগ্রাম/লিটারের চেয়ে বেশি সিসা ছিল। এই গবেষণায় দেখা গেছে, সিসানির্ভর শিল্প স্থাপনার ১ কিলোমিটারের মধ্যে বসবাসকারী শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রা ছিল ৫ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে বসবাসকারী শিশুদের তুলনায় ৪৩ শতাংশ বেশি। অন্য উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে ঘরের ভেতরে ধূমপান, দূষিত ধূলিকণা, সিসাযুক্ত প্রসাধনসামগ্রী ও রান্নার পাত্রের ব্যবহার।
এই আলোচনা সভা থেকে সিসানির্ভর শিল্প স্থাপনা, যেমন সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারি বানানো বা রিসাইক্লিং করার কারখানা বা স্থাপনা অথবা যেসব কারখানা বা স্থাপনায় সিসা গলানো বা পোড়ানো হয়, সেগুলোর বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। কারণ এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরিয়ে নিলে বা দূষণ কমানোর ব্যবস্থা নিলে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার শিশুদের সিসাদূষণ থেকে বাঁচানো সম্ভব।
সমাপনী বক্তব্যে আইসিডিডিআরবির নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, ‘সিসা বিষক্রিয়া নীরবে আমাদের শিশুদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে কেড়ে নিচ্ছে। আমাদের এখনই সিসা নিঃসরণকারী ক্ষতিকর উৎসগুলো বন্ধ করতে হবে, যাতে প্রতিটি শিশু সুস্থ ও বুদ্ধিমান হয়ে বেড়ে উঠতে পারে।’ আলোচনা সভায় আইসিডিডিআরবি এবং স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষক ও সাংবাদিকরা অংশ নেন।