দেশের কারাগারগুলোকে মাদকমুক্ত করতে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে কারা অধিদপ্তর। সেপ্টেম্বর মাসকে মাদকবিরোধী কার্যক্রমের মাস হিসেবে ঘোষণা দিয়ে এই অভিযান শুরু হয়েছে। ১ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে মাসজুড়ে সন্দেহভাজন কারারক্ষী, বন্দি, এমনকি দর্শনার্থীদের ‘ডোপ টেস্ট’ করা হচ্ছে। এ জন্য কারাগারে বসানো হয়েছে ডোপ টেস্টের অত্যাধুনিক নতুন মেশিন।
ভ্রাম্যমাণ এই মেশিন ইতোমধ্যেই দেশের বিভিন্ন কারাগারে নিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে ডোপ টেস্ট করার কাজ শুরু হয়েছে। এই টেস্টে সন্দেহভাজনদের অনেকেই মাদকাসক্ত বলে প্রমাণিতও হয়েছেন। এ রকমই এক কারারক্ষীকে ডোপ টেস্টের মুখোমুখি করা হলে তিনি কর্তৃপক্ষকে ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যান। মাদকের সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজনের তালিকায় রয়েছেন বন্দি-কারারক্ষীসহ সংশ্লিষ্ট তিন শতাধিক ব্যক্তি।
এ বিষয়ে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মুঠোফোনে কারা অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) জান্নাত-উল-ফরহাদ খবরের কাগজকে বলেন, চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে গতকাল (মঙ্গলবার) পর্যন্ত তল্লাশি চালিয়ে ৪ জন দর্শনার্থীর কাছ থেকে বেশ কিছু পরিমাণ গাঁজা ও ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া সন্দেভাজন অন্তত ১০ জন কারারক্ষী, কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের ডোপ টেস্ট করা হয়েছে। এই কাজ চলমান থাকবে।
কারাগারে মাদক ঠেকাতে যত উদ্যোগ
কারা অধিদেপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, নতুন মেশিন দিয়ে বিভিন্ন পয়েন্টে তল্লাশি করা হচ্ছে। দর্শনার্থী, বন্দি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ডোপ টেস্ট করা হচ্ছে। ডোপ টেস্টে পজিটিভ প্রমাণিতদের সংশোধন-প্রশিক্ষণ, চিকিৎসা-কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা রেখেছে কর্তৃপক্ষ। কারা অধিদপ্তর মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে।
এসব বিষয়ে গতকাল সন্ধ্যায় কথা হয় অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক কর্নেল মোহাম্মদ মোস্তফা কামালের সঙ্গে। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, কারাগারে দর্শনার্থী, বন্দি, কার্মকর্তা ও কর্মচারীদের ডোপ টেস্ট করার জন্য নতুন মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ছাড়া তল্লাশির জন্যও নতুন একটি স্ক্যানার মেশিন আনা হয়েছে। তিনি বলেন, নতুন বন্দি এলে তারা মাদক সেবনের বিষয়টি স্বীকার করতে চান না। ফলে নতুন বন্দিদের প্রতি বিশেষ নজর রাখার পাশাপাশি ডোপ টেস্ট করা হচ্ছে।
ডোপ টেস্টের বিষয়ে কর্নেল মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল বলেন, কারাগারে মাদক সেবন করে এমন অনেকেই সন্দেহের তালিকায় রয়েছেন। প্রাথমিকভাবে ওই মেশিনের সহায়তায় সেবনকারীদের শনাক্তের চেষ্টা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে সিলেটে সন্দেহের তালিকায় থাকা এমন ১০ জনকে পরীক্ষা করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়া টের পেয়ে ইতোমধ্যে একজন কারারক্ষী পালিয়ে গেছেন।
তিনি বলেন, রাতারাতি চাইলেই কারাগার থেকে মাদক নির্মূল করা যাবে না। তবে মাদকের বিস্তার রোধে কঠোরভাবে কাজ করা হচ্ছে এবং এই বিষয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।
এদিকে গতকাল দুপুরে কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (প্রশাসন) আবুল বাশারের সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বর্তমান বিশ্বে মাদকের ভয়াবহতা প্রকট রূপ ধারণ করেছে। বাংলাদেশের বর্তমান আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটেও মাদকের প্রভাব সর্বগ্রাসী রূপ ধারণ করছে এবং তা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। দেশের কারাগারগুলো এই ক্ষতিকর প্রভাবের বাইরে নয়। এরই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ জেল সেপ্টেম্বর মাসকে মাদকবিরোধী কার্যক্রমের মাস হিসেবে ঘোষণা করে মাদকবিরোধী অভিযান শুরু করেছে।
এতে বলা হয়, বাংলাদেশ জেল মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে। এর অংশ হিসেবে কারাগার এলাকায় মাদক নির্মূল করতে স্থানীয় কারা প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহায়তায় বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।
মাদকসহ ধরা পড়েন একাধিক কারারক্ষী
২০২৩ বছরের ১১ ডিসেম্বর গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে মাদকসহ গ্রেপ্তার হন কারারক্ষী সোহেল রানা। সে সময় এক সপ্তাহের ব্যবধানে একইভাবে গ্রেপ্তার হন প্রধান কারারক্ষী সাইফুল ইসলাম। এদের মতো অনেক কারারক্ষী মাদক কারবারে যুক্ত রয়েছেন
।
একই বছরের সেপ্টেম্বরে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের এক কারারক্ষীকে মাদক মামলায় পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও ২ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এ ছাড়া অন্য আরেকটি ধারায় বিচারে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে ৬ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫০০ টাকা জরিমানা অনাদায়ে ১০ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। গাজীপুরের অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত-৩-এর বিচারক মোসাম্মাৎ রেহেনা আক্তার এ রায় দেন। একই বছরের ১৮ ডিসেম্বর দুপুরে কারাগারের ভেতরে প্রবেশের সময় গেটে তল্লাশিকালে প্রধান কারারক্ষী সাইফুলের পকেট থেকে ৩০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে কর্তৃপক্ষ। এ রকম আরও অনেকেই মাদক সংশ্লিষ্টতায় আটক হন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কারা সূত্রে জানা যায়, বন্দিদের সঙ্গে মিশে কারারক্ষীরা মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়ছেন। শুধু মাদকসংশ্লিষ্টতায় বিভাগীয় মামলায় ২৫ জন কারারক্ষীর শাস্তি হয়েছে। এ ছাড়া নজরদারিতে রয়েছেন ৩৫০ জন।