যশোরের চৌগাছা উপজেলায় ২ শতাধিক বছর ধরে চলে আসছে ঐতিহ্যবাহী বলুহ দেওয়ানের মেলা। পীর বলুহ দেওয়ানের (রহ.) প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ভাদ্র মাসের শেষ মঙ্গলবার থেকে শুরু হয় মেলা। এ বছরও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। বর্তমানে মেলা ঘিরে হাজারো গ্রাম এখন উৎসব আমেজে মুখরিত।
সরেজমিন দেখা যায়, সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মেলার মাঠে ভিড় লেগেই থাকছে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদের পদচারণা ও বিক্রেতাদের হাঁকডাকে জমজমাট মেলার মাঠ। গত ৯ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া ১০ দিনব্যাপী এ মেলা চলবে আজ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত।
কপোতাক্ষ নদের পাড়ে অবস্থিত চৌগাছা উপজেলার হাজরাখানা গ্রাম। এ হাজারখানা গ্রামে কয়েক শ বছর আগে বসতি স্থাপন করেছিলেন পীর বলুহ দেওয়ান (রহ.)। লোকমুখে তার অলৌকিক ক্ষমতার নানা গল্প প্রচলিত আছে। কেউ বলেন, তিনি গরু চরাতে গিয়ে গরুকে সাদা বক বানিয়ে গাছের ডালে বসিয়ে রাখতেন। আবার কেউ কেউ বলেন, ধান সেদ্ধ করার সময় খড়ির পরিবর্তে নিজের পা উনুনে দিতেন।
স্থানীয় সালাউদ্দিন মোল্লা বলেন, ‘বলুহ দেওয়ানের মেলা উপলক্ষে হাজারো গ্রামে আনন্দের জোয়ার নেমে আসে। গ্রামের মেয়েরা শ্বশুরবাড়ি থেকে বাবার বাড়িতে আসেন। প্রতিটি বাড়িতেই আত্মীয়-স্বজনের ভিড় জমে। বহু বছরের পুরোনো এ মেলা নিয়ে এলাকায় উচ্ছ্বাসের শেষ নেই।’
মেলায় ঘুরতে আসা আল আমিন রাব্বী বলেন, ‘সপরিবারে মেলার মাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছি। মেলার পরিবেশ অনেক ভালো। বাচ্চার জন্য খেলনা কিনেছি। আমরা ঘোরাঘুরি করছি, খাওয়া-দাওয়া করেছি। অনেক ভালো লাগছে।’
শান্তা শবনম নামে আরেকজন বলেন, ‘মেলা মানেই তো আনন্দ। অনেক মানুষের সমাগম হয়। বলুহ মেলায় আমরা প্রতি বছর আসি। এখানে অনেক দোকান বসেছে। এখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসসহ অনেক খাবারের আইটেম পাওয়া যাচ্ছে। নাগরদোলায় চড়েছি। নদীতে স্পিডবোটে চড়লাম। অনেক মজা করেছি পরিবারের সবাই মিলে।’
মেলা প্রাঙ্গণে গেলে দেখা যায় গ্রামীণ ঐতিহ্যের এক সুন্দর প্রতিফলন। এখানে হরেক রকমের খাবারের দোকান বসেছে। এর মধ্যে আছে বাদাম, পেঁয়াজু, বাতাসা, গজাসহ নানারকম খাবার। সেই সঙ্গে পাওয়া যাচ্ছে নানা ধরনের খেলনা, কসমেটিক সামগ্রী, গৃহস্থালি কাজে ব্যবহৃত নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এবং বিভিন্ন ধরনের আসবাবপত্র। বাঁশ ও বেতের তৈরি কুলা, ডালা, চালুনি থেকে শুরু করে কাঠের তৈরি পিঁড়ি, জলচৌকি এবং মাটির হাঁড়ি, পাতিল, খেলনাও মেলায় পাওয়া যাচ্ছে।
অন্যদিকে বিনোদনপ্রেমীদের জন্যও রয়েছে চমৎকার ব্যবস্থা। নাগরদোলা, ড্রাগন ট্রেন, স্লিপার, জাম্পার, ভূতের বাড়ি এবং নৌকা দোলার মতো মাধ্যমগুলো সব বয়সী মানুষের মন জয় করছে। দূর-দূরান্ত থেকে পণ্য বিক্রি করতে আসা দোকানিরা বলছেন, মেলার মাঠের পরিবেশ ভালো। প্রত্যেক বছর তারা দোকান নিয়ে বসেন এখানে।
ঢাকা থেকে খেলনা বিক্রি করতে আসা ইয়াছিন আরাফাত বলেন, ‘এ বছর প্রথম যশোরের এ মেলায় এসেছি। অনেকের মুখে এ মেলার নাম শুনেছি। শুরুর দিকে ভালোই লোক সমাগম হয়েছে। আশা করছি শেষ দিন ভালো কেনাবেচা হবে।’
মিষ্টি দোকানি মোহন ঘোষ বলেন, ‘১৬ বছর ধরে এ মেলায় মিষ্টি বিক্রি করতে আসি। মেলা শেষে আবার নিজ জেলা নড়াইলে চলে যাই। প্রতি বছর কেনাবেচা ভালো হয়। এ বছর মানুষের ভিড় বেশি। কিন্তু তেমন কেনাবেচা হচ্ছে না। দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কেমন কেনাবেচা হয়।’
মেলার মাঠে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে স্থানীয়ভাবে মেলা পরিচালনা কমিটি তৈরি করা হয়েছে। পুলিশ ও আনসার বাহিনীর সঙ্গে কাজ করছে স্বেচ্ছাসেবক টিম।
মেলা পরিচালনা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আক্তার বলেন, ‘এ বছর বলুহ দেওয়ান মেলায় ৫ শতাধিক দোকান বসেছে। এখন পর্যন্ত কোনো বিশৃঙ্খলা বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেনি। আশা করছি, কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে এ মেলা শেষ হবে।’