চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি। বরিশাল নগরীর কাশিপুরের হাতেম মীরার দিঘি থেকে মানবদেহের ছয়টি খণ্ডিত অংশ উদ্ধার করেছিল বিমানবন্দর থানা পুলিশ। কিন্তু আজ পর্যন্ত ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। রহস্য উদ্ঘাটনে এখনো চলছে তদন্ত কার্যক্রম। অন্যদিকে নগরীতে বিভিন্ন সময় চুরি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলেও অপরাধীদের শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। শহরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সিসি ক্যামেরাগুলো সচল থাকলে অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হতো বলে জানিয়েছেন পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা।
নগরবাসী বলছেন, নগরীর বিভিন্ন জায়গায় চুরি-ছিনতাই এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ব্যবসায়ীরা দোকান বন্ধ করে বাসায় গিয়ে চুরির আতঙ্কে থাকেন। এমন অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে সিসিক্যামেরাগুলো সচল করার দাবি তুলেছেন। সিটি করপোরেশন অবশ্য জানিয়েছে, তারা সামর্থ্য অনুযায়ী ক্যামেরাগুলো সচল করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৭ সালে ৩০টি ওয়ার্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিতে নগরীর ৫৮টি স্থানে ৪২০টি সিসি ক্যামেরা স্থাপন করে বরিশাল সিটি করপোরেশন (বসিক)। তবে দুই মাস পরই রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সিসি ক্যামেরাগুলো অচল হতে শুরু করে। এ ছাড়া অনেক ক্যামেরা চুরি হয়ে যায়। নিয়মিত তদারকি ও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নগরবাসীর নিরাপত্তায় নেওয়া আড়াই কোটি টাকার প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত ভেস্তে যায়।
এদিকে নগরীর আইনশৃঙ্খলা পর্যবেক্ষণের জন্য মেট্রোপলিটন পুলিশের উদ্যোগে ২৬০টি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। এগুলোর অবস্থাও সিটি করপোরেশনের সিসিক্যামেরার মতো। কিছু ক্যামেরা এরই মধ্যে চুরি হয়ে গেছে, কতগুলো হয়েছে বিকল। এতে করে শহরের বিভিন্ন সড়কে প্রতিনিয়ত চুরি, ছিনতাইসহ নানান অপ্রীতিকর ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের সহজেই শনাক্ত করা যাচ্ছে না। অপরাধ করে দোষীরা নির্বিঘ্নে পালিয়ে যেতে পারছেন।
নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সড়ক বিভাজনে স্থাপিত ক্যামেরা স্ট্যান্ড এবং বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে লাগানো বেশির ভাগ সিসি ক্যামেরার-ই অস্তিত্ব নেই। যেগুলো আছে সেগুলোও হয় ভেঙে ঝুলে আছে অথবা মাটির দিকে তাক করা অবস্থায় রয়েছে। কোথাও আবার ক্যামেরার বাক্স থাকলেও ভেতরে কোনো যন্ত্রাংশ নেই।
নগরের লঞ্চঘাট এলাকার ব্যবসায়ী জাহিদ হাসান বলেন, ‘লঞ্চঘাটে প্রতিদিন শ শ মানুষ আসা-যাওয়া করেন। এখানে চুরি, ছিনতাই নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিসি ক্যামেরা থাকলে এসব অপরাধ প্রতিরোধে সাহায্য হতো। এখন অপরাধীরা জানে তাদের শনাক্ত করার কোনো উপায় নেই।’
ফকিরবাড়ী রোডের ব্যবসায়ী সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘প্রতিদিন রাতে দোকান বন্ধ করার পর চুরির ভয়ে থাকি। কয়েকদিন আগে আমার পাশের দোকানের বিদ্যুতের সংযোগ চোরের দল কেটে নিয়ে গেছে। এই রোডের সিসি ক্যামেরাটি সচল থাকলে চোর শনাক্ত করার সম্ভব হতো।’
নগরের কালীবাড়ি রোডের ব্যবসায়ী মামুন হোসেন বলেছেন, ‘রাতের বেলা দোকান বন্ধ করার পর এলাকার আশপাশে প্রায়ই অপরিচিত লোকজন ঘোরাফেরা করে। আগে পুলিশ টহল আর সিসিটিভির কারণে একটু নিশ্চিন্ত থাকতাম, এখন অচল ক্যামেরার কারণে ভয় বেড়ে গেছে।’
বরিশাল বিভাগীয় পরিবেশ ও জন সুরক্ষা ফোরামের আহ্বায়ক শুভংকর চক্রবর্তী বলেন, ‘নগরের ৯০ শতাংশ ক্যামেরাই এখন আর কাজ করে না। সংগত কারণেই এখন অপরাধের প্রবণতা বেড়ে গেছে। যখন কোনো বাজেট আসে, কোনো পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়, তখন এর ভবিষ্যৎ বিবেচনা করা দরকার। কিন্তু সেটি করা হয় না। এটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্যও বাজেট থাকা উচিত।’
বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল বারী বলেন, ‘নগরীতে মেট্রোপলিটন পুলিশের কিছু ক্যামেরা আছে। এ ছাড়া সিটি করপোরেশনেরও রয়েছে। আমাদের যে কয়টি রয়েছে সেগুলো ঠিক করতে কত টাকা লাগবে, কীভাবে আমরা এগুলো নতুন করে সচল করতে পারব, তা নিয়ে একটা ডকুমেন্ট প্রস্তুত করছি। আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী সেগুলো স্থাপন করা হবে।’
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের (বিএমপি) উপ-কমিশনার (ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট) আব্দুল হান্নান বলেন, ‘বরিশাল সিটি করপোরেশনের বসানো অনেকগুলো ক্যামেরা অকেজো হয়ে গেছে। কিছু চুরিও হয়েছে। মেট্রোপলিটন পুলিশের উদ্যোগে ২৬০টি সিসিটিভি স্থাপন করা হয়। এগুলো দিয়ে পুরো নগরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। ওই ক্যামেরা দিয়ে ক্রাইম কন্ট্রোল, ট্রাফিক কন্ট্রোল পর্যবেক্ষণ করা হয়।’