মহারাজ আবুল সরকারকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে মানিকগঞ্জে বাউলশিল্পীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটনা ঘটে, সেই হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছেন যশোরের সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও মুক্তমনা মানুষেরা। একই সঙ্গে তারা বিনা শর্তে আবুল সরকারের মুক্তি দাবি করেন। সমাবেশে বক্তারা বাউল আবুল সরকারের মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালানোর হুঁশিয়ারি দেন।
মঙ্গলবার (২৫ নভেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে যশোর শহরের প্রাণকেন্দ্র নেতাজি সুভাষচন্দ্র রোডে ‘যশোরের সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহের’ ব্যানারে মানিকগঞ্জে বাউলশিল্পীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিলের আয়োজন করা হয়। স্থানীয় বাউলশিল্পীদের পরিবেশনায় ‘মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপারে তুই মূল হারাবি, মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’ লালন ফকিরের এই গান দিয়ে প্রতিবাদ সমাবেশের শুরু হয়।
গানের ফাঁকে পালা শিল্পী আবুল সরকারকে গ্রেপ্তার, মানিকগঞ্জে বাউলশিল্পীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে বক্তব্য রাখেন চিত্রশিল্পী মফিজুর রহমান রুননু।
তিনি বলেন, ‘যখন সমাজের একটি অংশ নিপীড়নের শিকার হয়, সঙ্গত কারণেই তার পাল্টা জবাব দেওয়ার জন্য মানুষ সমবেত হয়। বাউলশিল্পীদের ওপর হামলা মানে আমাদের সংস্কৃতির ওপর হামলা। তারা আক্রমণের মুখে রয়েছেন মানেই দেশ আক্রান্ত হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি হচ্ছে সহাবস্থানের। যুগের পর যুগ ধরে আমরা সব ধর্ম, বর্ণ, সংস্কৃতির মানুষ একইসঙ্গে বসবাস করছি, এটাই আমাদের পরিচয়। কিন্তু ধর্মের দোহাই দিয়ে সংস্কৃতির ওপর হামলার ঘটনা, সুস্থ কোনো মানুষ মেনে নেয় না। এই দেশটা আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির ওপরেই থাকবে, মরুভূমির কোনো সংস্কৃতি এখানে আমদানি করা চলবে না। আমরা সাম্প্রদায়িকতা চাই না, শান্তিপূর্ণভাবে থাকতে চাই। তাই সবার-মত, পথ ও চিন্তার স্বাধীনতা এ রাষ্ট্রকেই সুনিশ্চিত করতে হবে।’
শেষে দেশি বাদ্য বাজিয়ে, নানা স্লোগানে শহরে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলে ‘গরিব শাহের বাংলায় মব জুলুমের ঠাঁই নাই’, ‘শাহজালালের বাংলায় মব সন্ত্রাসের ঠাঁই নাই, ‘শাহ পরাণের বাংলায় মব জুলুমের ঠাঁই নাই’, ‘আউল-বাউলের বাংলায়, মব সন্ত্রাসীদের ঠাঁই নাই’, ‘বোরহানশাহের বাংলায় সন্ত্রাসীদের ঠাঁই নাই’ এরকম বিভিন্ন স্লোগান উচ্চারিত হয়। মিছিলটি চিত্রা মোড় হয়ে মাইক পট্টি দিয়ে যশোর টাউন হল মাঠে গিয়ে শেষ হয়। সমগ্র কর্মসূচিতে যশোরের সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, যুব সংগঠন, পেশাজীবী সংগঠন, ছাত্রসংগঠন, বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজন উপস্থিত ছিলেন।
বক্তারা আরও বলেন, ‘অসাম্প্রদায়িক চেতনার মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। এ দেশে কোনো সাম্প্রদায়িক সহিংসতা থাকবে না। ধর্মের নামে কোনো হানাহানি চলতে পারে না। বাংলাদেশ হবে অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলা। এখানে সব ধর্মের মানুষ তাদের অধিকার নিয়ে বসবাস করবে, তাদের উৎসব উদ্যাপন করবে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করবে। তাতে কোনো বাঁধা থাকবে না। বক্তারা অভিযোগ করেন, বাউল সরকারের আটকের মধ্য দিয়ে দেশের সাংস্কৃতিক চর্চাকে বাধাগ্রস্ত করার হুমকি লক্ষ্য করা যায়।
সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সবসময় একটি গোষ্ঠী সক্রিয় ছিলো বিগত সরকারের সময়ও তারা বাউল শিল্পী সাংস্কৃতিক কর্মীদের ওপর হামলা করেছে। এখনও তারা সক্রিয়। যে গোষ্ঠী সংগীত পছন্দ করে না; তারা সমাজকে অন্ধকারে নিতে চায়। তাদের বিরুদ্ধে বিগত সরকারের সময়েও বারবার রাজপথে আন্দোলন করতে হয়েছে, আজও প্রতিবাদে দাঁড়াতে হচ্ছে। শাসক পরিবর্তন হচ্ছে, কিন্তু আমরা লক্ষ্য করছি শাসকগোষ্ঠী সবসময় বারবার তাদের পক্ষেই দাঁড়াচ্ছে। একটি রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে ‘কারা কারা বেহেস্তের টিকিট পেয়েছেন’এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা হচ্ছে কি না, তা বিবেচনা করা জরুরি বলে বক্তারা প্রশ্ন রাখেন।
তুহিন/নাঈম