তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানাতে সিলেটে গড়ে তোলা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের স্মারক সংগ্রহশালা ও পাঠাগার। এটি চালুর কথা ছিল ২০১৪ সালে। কিন্তু ১১ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো সেটি আলোর মুখ দেখেনি।
একইভাবে অবহেলার আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে নীলফামারী জাদুঘর। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বরে একটি পুনোনো ভবনে এর অবস্থান। এখানেই লুকিয়ে আছে হাজারো বছরের ইতিহাস। দীর্ঘদিনের অবহেলায় এটি আজ অস্তিত্বের সংকটে।
সিলেট কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক)। সংগ্রহশালা ও পাঠাগার নির্মাণ, ব্যবস্থাপনার সহযোগিতায় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ব্যক্তিদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করেছিল সিসিক। দীর্ঘদিনেও এটি বাস্তবায়িত না হওয়ায় সিসিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ওই কমিটির সদস্যদের দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
জানা যায়, ২০১৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ‘তাওহিদি জনতা’র ব্যানারে একটি মিছিল থেকে শহিদ মিনারে ভাঙচুর করা হয়। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসে উদ্বোধন করা হয় সিলেটের নবনির্মিত কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার। নতুন শহিদ মিনার নির্মাণকালে আন্ডারগ্রাউন্ডে হাজার স্কয়ার ফুট জায়গায় ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের স্মারক, স্মৃতিচিহ্ন, আলোকচিত্রসংবলিত একটি সংগ্রহশালা এবং পাঠাগার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে পুনর্নির্মিত শহিদ মিনার উদ্বোধন করা হলেও নানা অজুহাতে আটকে যায় সংগ্রহশালা ও পাঠাগার নির্মাণ কাজ, যা এখনো সম্পূর্ণ হয়নি।
২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ৯৪ লাখ ৯১ হাজার টাকা ব্যয় ধরে শুরু হয় সংগ্রহশালাটির নির্মাণকাজ। কাজ শেষ হয় ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে। ২০২১ সালের মার্চ মাসে এটি উদ্বোধনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র। তখন মেয়রের দেওয়া এমন খবরে আশান্বিত হলেও মূল নকশার সঙ্গে মিল না রেখে কাজ করায় হতাশ ছিলেন সিলেটের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষজন।
ভিডিওতে সংগ্রহশালায় ঢুকলেই সামনের দেয়ালে শহিদ মিনারের ইতিহাস সম্পর্কিত একটি লেখা চোখে পড়ে। মোট ছয়টি দেয়ালিকায় লাগানো মুক্তিযুদ্ধের দুর্লভ ছবি, অস্ত্র, রেডিওসহ মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম। রয়েছে এর নিরাপত্তা ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের জন্য নির্ধারিত স্থান। রয়েছে বই পড়ার জন্য চেয়ার-টেবিলের ব্যবস্থা। মাঝখানে থাকা খুঁটিগুলোতে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ছবি সাঁটা।
সংগ্রহশালায় শুরুতেই হাসনরাজা, রাধারমণ ও শাহ আব্দুল করিমের ছবি সাঁটা রয়েছে দেয়ালিকার স্থানটিতে। কোনো ছবির সঙ্গেই নেই পরিচয়লিপি। বই পড়ার জন্য নেই কোনো টেবিল-চেয়ার। ছয় দেয়ালিকায় ঝুলছে পর্যটন স্থানের দৃশ্য। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার যেসব চিত্র প্রদর্শন করা হয়েছে, সেগুলোতেও নেই কোনো বর্ণনা।
গতকাল সরজমিনে দেখা যায়, সংগ্রহশালায় আগে সাঁটানো হাসনরাজা, রাধারমণ ও শাহ আব্দুল করিমের ছবি সরানো হয়ে গেছে। পাঠাগারের অংশে কিছু বই ও পরিপাটি করে চেয়ার টেবিল সাজানো আছে। সংগ্রহশালার একটি দেয়ালে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার বিভিন্ন ছবি দিয়ে করা একটি মানচিত্র এখনো অসম্পূর্ণ অবস্থায় আছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার কারণে ভেতরে কিছু অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মূল নকশার সঙ্গে মিল না রেখেই সংগ্রহশালার সাজসজ্জা করা হয়েছে। এ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এরপরও নানা অজুহাতে এখনো সংগ্রহশালা ও পাঠাগার চালু করতে পারেনি সিলেট সিটি করপোরেশন।
এ ব্যাপারে সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা নেহার রঞ্জন পুরকায়স্থ খবরের কাগজকে বলেন, ‘নানা জটিলতার কারণে সিলেট কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার কমপ্লেক্সে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক সংগ্রহশালা ও পাঠাগার চালু করা যায়নি। বিভিন্ন সময় এর অবকাঠামোগত কাজ করানো হয়েছে। তবে উদ্বোধনের আগে মূল নকশা অনুযায়ী সব কাজ সম্পন্ন করা হবে।’
নীলফামারী প্রতিনিধি জানান, নীলফামারী জাদুঘর এখন অবহেলার শিকার। এখানে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে মোগল আমলের ৬০ কেজি ওজনের একটি বিশাল তালা। তার পাশেই রাখা আদিম যুগের দাঁড়িপাল্লা। প্রাচীন নৌকা, রুপার হুক্কা, হাতির দাঁতের লাঠি, কেরোসিনচালিত ফ্যান–সব মিলিয়ে মনে হয় যেন ইতিহাসের স্তরে স্তরে সাজানো নীরব প্রদর্শনী।
নীলফামারী জাদুঘরে সবচেয়ে বিস্ময়কর আকর্ষণ ৬ হাজার বছরের প্রাচীন মর্মর পাথর। এই পাথর শুধু বয়সের দিক থেকে নয় বরং সভ্যতার প্রাচীনতম নিদর্শন হিসাবে দর্শনার্থীদের ভাবিয়ে তোলে। এখানে রয়েছে শত বছরের পুরোনো কষ্টিপাথরের মূর্তি, মাটির নিচ থেকে উদ্ধার হওয়া সান পাথরের ভাস্কর্য, তালপাতায় লেখা রামায়ণ, মহাভারত ও হারিয়ে যাওয়া বহু পুথি। ধর্মীয় সামাজিক ও সাহিত্যিক ইতিহাসের এসব দলিল শুধু ধর্মগ্রন্থ নয় বরং উপমহাদেশের জ্ঞান চর্চা ভাষা ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতার এক জীবন্ত প্রমাণ।
নীলফামারী জাদুঘর শুধু প্রাচীন যুগের ইতিহাসেই সীমাবদ্ধ নয়, এখানে সংরক্ষিত আছে আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসের ও গুরুত্বপূর্ণ দলিল। ১৯৫৭ সালের আওয়ামী লীগের ব্যানার, আরবি, ফারসি ও বাংলা ভাষায় লেখা ভূমির দানপত্র। রংপুরের মহারাজা জিএল রায়ের ব্যবহৃত চাদর ও জরির পোশাক, সে সময়কার জমিদারি প্রথা ও সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। প্রাচীন যুগের হারিকেন, ৬০ কেজি ওজনের পানির বোতল মানুষের জীবনযাত্রা ও সংগ্রামের ইতিহাস আমাদের সামনে উন্মোচন করে।
জাদুঘরটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে রয়েছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও স্মৃতি চিহ্ন। মুক্তিযুদ্ধকালীন ব্যবহৃত বিভিন্ন দলিল, পুরোনো নথিপত্র স্থানীয় মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ছবি ও স্মৃতিচিহ্ন এখানে সংরক্ষিত রয়েছে। নীলফামারী ও আশপাশের অঞ্চলের সংঘটিত মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা প্রবাহ, গণআন্দোলন ও প্রতিরোধ যুদ্ধের স্মৃতি। এসব নিদর্শনের মধ্যে দিয়ে জীবন্ত হয়ে উঠে মুক্তিযুদ্ধের সময় ব্যবহৃত কিছু দৈনন্দিন সামগ্রী।
সমৃদ্ধ এই জাদুঘরের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৫৮ সালে। ১৯৮৩ সালে এটি একটি রূপ পায়। তবে উদ্বোধনের পরও কাঙ্ক্ষিত পৃষ্ঠপোষকতা ও আধুনিক সংরক্ষণ এবং অবকাঠামো উন্নয়ন হয়নি।
জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত মুজিবুর রহমান ছিলেন একজন নিরসল সংগ্রাম ও ইতিহাসপ্রেমী। তার স্বপ্ন ছিল হারিয়ে যেতে বসা প্রাচীন নিদর্শনগুলো এক জায়গায় সংরক্ষণ করে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘ইচ্ছে থাকলেও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে জাদুঘরটিকে নিরাপদ করা সম্ভব হয়নি। তার মৃত্যুর পর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ আরো কঠিন হয়ে উঠেছে।
তবে অবহেলায় যদি এই সমৃদ্ধ ইতিহাস হারিয়ে যায়, তা হলে ক্ষতি শুধু জেলায় নয়, হারিয়ে যাবে আমাদের সামষ্টিক স্মৃতি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সাংস্কৃতিক পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই সময় থাকতেই প্রয়োজন দায়িত্বশীল উদ্যোগ। জাদুঘরের কেয়ারটেকার রতন কুমার জানান, বিপুলসংখ্যক ও মূল্যবান নিদর্শন একজন মানুষের পক্ষে রক্ষণাবেক্ষণ প্রায় অসম্ভব। অন্তত তিনজন স্থায়ী জনবল প্রয়োজন।
নীলফামারী জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়রুজ্জামান জানিয়েছেন, জাদুঘরটি জাতীয়করণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাচীন ও মুক্তিযুদ্ধসম্পর্কিত নিদর্শন সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।