বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা। জয়পুরহাট জেনারেল হাসপাতালের জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের সামনে রোগীদের জটলা। কেউ জয়পুরহাট শহরের বাসিন্দা, কেউ এসেছেন দূরবর্তী উপজেলা থেকে। আবার কারও বাড়ি পার্শ্ববর্তী নওগাঁর বিভিন্ন উপজেলায়। সবাই এসেছেন জলাতঙ্কের টিকার (র্যাবিস ভ্যাকসিন) খোঁজে। কিন্তু টিকাকেন্দ্রের কাঁচের দরজায় একটি কাগজে লেখা ‘সরকারি ভ্যাকসিনের সাপ্লাই বন্ধ’। কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্তরাও একই কথা বলছেন।
এতে সেবাপ্রার্থীরা পড়েছেন বেকাদায়। বাধ্য হয়ে তারা হাসপাতালের বাইরে যান। একাধিক ফার্মেসিতে গিয়ে র্যাবিস ভ্যাকসিনের খোঁজ করেন। কিন্তু তাদের কাছেও ভ্যাকসিনটি নেই। জানালেন, বেসরকারি ওষুধ কোম্পানিগুলোও পর্যাপ্ত জলাতঙ্কের টিকা দিচ্ছে না। কোনো ফার্মেসিতে পাওয়া গেলেও সংকটের অজুহাত দেখিয়ে তারা বাড়তি দাম চাচ্ছেন। ওই দামেই কেউ টিকাটি কিনে হাসপাতালে গিয়ে শরীরে পুশ করছেন। যাদের সামর্থ্য নেই তারা ফিরে যাচ্ছেন। কেউ আবার অন্য জেলায় খোঁজ করছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কুকুর, বিড়াল ও শেয়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর কামড়ে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন দুই শতাধিক সেবাপ্রার্থী জয়পুরহাট জেনারেল হাসপাতালে র্যাবিস ভ্যাকসিনের খোঁজে আসছেন। এমনকি পার্শ্ববর্তী নওগাঁর ধামইরহাট ও বদলগাছী উপজেলা থেকে এখানে রোগী আসতে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু গত দুই সপ্তাহ ধরে হাসপাতালটিতে ভ্যাকসিনটির সরবরাহ নেই। এমনকি বেসরকারি ওষুধ কোম্পানির উৎপাদিত ভ্যাকসিনও ফার্মেসিতে পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই। এতে সেবাপ্রার্থীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে জীবনরক্ষাকারী এসব টিকা সরবরাহের জন্য সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, জয়পুরহাট জেনারেল হাসপাতালে প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই শ রোগী জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন নিতে আসেন। প্রতি মাসে হাসপাতালটিতে গড়ে এক হাজার করে ভ্যাকসিন আসে। একটি ভ্যাকসিন চারজনকে দেওয়া যায়। তবে ভ্যাকসিনটি খোলার পর ছয় ঘণ্টার মধ্যেই ব্যবহার করতে হয়। যদিও গত দুই সপ্তাহ ধরে ভ্যাকসিন সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।
জয়পুরহাট জেনারেল হাসপাতালের জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন কল্পনা বেগম। বাড়ি জেলার আক্কেলপুরের জামালগঞ্জে। ১৬ কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়ে তিনি এখানে জলাতঙ্কের টিকার খোঁজে এসেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত টিকা পাননি। তিনি বলেন, ‘আমার নাতিকে কুকুরে কামড়েছে। হাসপাতালে এসে কোনো চিকিৎসা পেলাম না। অনেক দোকান (ফার্মেসি) ঘুরেও ভ্যাকসিন পাইনি। বড় বিপদে পড়ে গেলাম। এই হাসপাতাল থেকে তাহলে লাভ কী?’
টানা তিন দিন ধরে হাসপাতালে এসে টিকা না পেয়ে হতাশ আমিনা বেগম। তিনি এসেছেন নওগাঁ জেলার বদলগাছী উপজেলার সাগরপুর গ্রাম থেকে। নওগাঁ সদরের তুলনায় জয়পুরহাট তুলনামূলক কাছে হওয়ায় তিনি এখানে এসেছেন। চিকিৎসা না পেয়ে আতঙ্কে থাকার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আমার ছেলেকে কুকুরে কামড়েছে। তিন দিন থেকে এই হাসপাতালে ঘুরছি। কিন্তু টিকা পাওয়া যাচ্ছে না। জয়পুরহাট শহরে খুঁজেও পাইনি। বুঝতে পারছি না, এখন কী করব?’
একই জেলার ধাইমইরহাটের মঙ্গলবাড়ির জেসমিন আক্তার বলেন, ‘কুকুর কামড়ানোর পর হাসপাতালে এসে শুনি ভ্যাকসিন দেওয়া বন্ধ। কবে আসবে সেই তথ্যও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দিতে পারছে না। এখানকার ফার্মেসিতে খোঁজ করেও পাইনি। আমরা গরিব মানুষ তাহলে চিকিৎসা নেব কীভাবে? সরকারের কাছে অনুরোধ, দয়া করে দ্রুত ভ্যাকসিন সরবরাহের ব্যবস্থা করুন।’
সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশন জেলা শাখার সভাপতি অধিকারকর্মী নুর-ই-আলম বলেন, ‘বেশ কয়েক দিন ধরে শুনছি জয়পুরহাট জেনারেল হাসপাতালে জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন সরবরাহ বন্ধ। বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলাম। তবে এখনো ভ্যাকসিন না আসায় সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। সরকারি হাসপাতালের যে সেবা পাওয়ার কথা তা থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। অনেকেই ভ্যাকসিন না পেয়ে বেশি টাকা খরচ করে অন্য জেলায় যাচ্ছেন। সরকারের কাছে আহ্বান, দ্রুত ভ্যাকসিন সরবরাহ করা হোক।’
জয়পুরহাট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. সরদার রাশেদ মোবারক জুয়েল বলেন, ‘এই হাসপাতালে জয়পুরহাটসহ আশপাশের জেলা থেকেও রোগীরা জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন নিতে আসেন। বর্তমানে ভ্যাকসিনটির সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। আমরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চাহিদা পাঠিয়েছি।’ আশা করছি শিগগিরই সরবরাহ শুরু হবে। তখন রোগীদের চাহিদা মেটানো যাবে।
তিনি বলেন, ‘বাইরের ফার্মেসি থেকে ভ্যাকসিনটি কিনে আনলে আমরা সেটা রোগীদের শরীরে পুশ করে দিচ্ছি।’