সূর্যের দেখা মিলতেই প্রাণ ফিরে পায় চুয়াডাঙ্গা জেলার ঐতিহ্যবাহী সরোজগঞ্জ বাজারের খেজুর গুড়ের হাট। দেশের বৃহত্তম খেজুর গুড়ের হাট হিসেবে সুপরিচিত এই বাজার বসে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার সরোজগঞ্জ হাইস্কুল মাঠে, প্রতি সপ্তাহের শুক্র ও সোমবার। শতাব্দী-প্রাচীন এই হাট শুধু একটি বাণিজ্যকেন্দ্র নয়; এটি গ্রামীণ অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক অনন্য মিলনমেলা।
ভোরের আলো ফুটতেই খেজুর গাছ থেকে সংগৃহীত টাটকা রস দিয়ে তৈরি গুড়ের ভাঁড় নিয়ে হাজির হন জেলার বিভিন্ন প্রান্তের কৃষক ও গাছিরা। মাঠজুড়ে সারি সারি মাটির ভাঁড়, খেজুর রসের মিষ্টি সুবাস আর পাইকারদের হাঁকডাকে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
দেশের নানা জেলা থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা সরোজগঞ্জের হাটে আসেন খেজুর গুড় কিনতে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিবছর এই হাটকে কেন্দ্র করে ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার বাণিজ্য হয়। প্রতি সপ্তাহে ২৫ থেকে ৩০ ট্রাক গুড় দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়।
গুড়ের স্বাদ ও মানের কারণে চুয়াডাঙ্গার খেজুর গুড় এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও রপ্তানি হচ্ছে। ফলে স্থানীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব দিন দিন বাড়ছে।
চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় বর্তমানে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার খেজুর গাছ রয়েছে। চলতি মৌসুমে এসব গাছ থেকে প্রায় ২ হাজার ৫০০ টন গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রতিবছর খেজুর গাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনকহারে কমে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, পরিকল্পিতভাবে নতুন গাছ রোপণ ও সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদার না হলে ভবিষ্যতে এ ঐতিহ্য হুমকির মুখে পড়তে পারে।
স্থানীয় চাষি বুলু আহমেদ বলেন, ‘রসের জন্য আমরা গাছে উঠে গাছ প্রস্তুত করি। ভোরে উঠে রস সংগ্রহ করে জাল দিয়ে গুড় তৈরি করি। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কাজটা অনেক কঠিন। কিন্তু আমরা কষ্ট অনুযায়ী মূল্য পাই না। অনলাইনে যারা ব্যবসা করে, তারা আমাদের কাছ থেকে কিনে দ্বিগুণ দামে বিক্রি করছে।’
পাবনার গুড় ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রায় ৪০ বছর ধরে আমি এই হাট থেকে গুড় কিনি। তবে আগের মতো মানসম্পন্ন গুড় এখন সবসময় পাওয়া যায় না। মান নিয়ন্ত্রণ না হলে ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে।’
এদিকে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বেশি লাভের আশায় গুড়ে চিনি মিশ্রণসহ নানা ধরনের ভেজাল দিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে সরোজগঞ্জ হাটের দীর্ঘ দিনের সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ঝিনাইদহ থেকে আসা ব্যবসায়ী মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি পরিচিত চাষিদের কাছ থেকে চিনিমুক্ত গুড় কিনি। এই গুড়ের চাহিদা বেশি এবং ভালো দামেও বিক্রি করা যায়।’
চুয়াডাঙ্গা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা রাশেদুজ্জামান বলেন, ‘সরোজগঞ্জের খেজুর গুড়ের হাট দেশের সর্ববৃহৎ গুড়ের হাট হিসেবে পরিচিত। এখানে কৃষকরা সহজেই তাদের পণ্য বিক্রি করতে পারেন। কোনো সমস্যা হলে তাৎক্ষণিক সমাধান দেওয়া হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘মধ্যস্বত্বভোগীরা কৃষকদের লাভের একটি বড় অংশ নিয়ে নিচ্ছে, এমন অভিযোগ রয়েছে। আমরা নিয়মিত বাজার মনিটরিং করছি। কৃষকদের অনলাইন ও ডিজিটাল মার্কেটিং প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে তারা সরাসরি ভোক্তাদের কাছে পণ্য বিক্রি করতে পারেন।’
সরোজগঞ্জের খেজুর গুড়ের হাট শুধু একটি বাজার নয় এটি দেশের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। খেজুর গাছ সংরক্ষণ, মান নিয়ন্ত্রণ জোরদার, ভেজাল প্রতিরোধ এবং কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারি সহায়তার পাশাপাশি স্থানীয়দের সচেতনতা ও আধুনিক অনলাইন বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।