ময়মনসিংহের তারাকান্দা বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন ফজলুল হক চৌধুরী মহিলা কলেজের ভবনসহ জমি বিক্রি করে দিয়েছেন কলেজের অধ্যক্ষ মো. হোছেন আলী চৌধুরী। এ ঘটনায় কলেজের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অবিভাবকদের মধ্যে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১০ সালের ১২ অক্টোবর তারাকান্দা বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন আট শতাংশ জায়গা জায়েদা খাতুন তার ছেলে অভিযুক্ত অধ্যক্ষ হোছেন আলী চৌধুরীকে দলিল করে দেন। এর তিন মাস পর ২০১১ সালের ১০ জানুয়ারি একই জায়গা স্বামীর নামে ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ফজলুল হক চৌধুরী মহিলা কলেজকে লিখে দেন তিনি। দলিলে সাক্ষী ছিলেন হোছেন আলী চৌধুরী ও তার ভাই শওকত আলী চৌধুরী। ২০২২ সালের ৬ জুন কলেজটি এমপিওভুক্ত হওয়ার আগে সেখানে জেলা পরিষদের অর্থায়নে নির্মাণ করা হয় তিনতলা ভবন। কিন্তু সেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী স্টাফসহ প্রায় ৩০০ জনের জায়গা সংকুলান না হওয়ায় ২০২৪ সালে অন্যত্র ৩৮ শতাংশ জায়গা ক্রয় করে কলেজের কার্যক্রম সরিয়ে নেওয়া হয়। পুরাতন ওই ভবনসহ কলেজের জায়গায় নারীদের একটি হোস্টেল করার পরিকল্পনা ছিল। এরইমধ্যে ২০২৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর অধ্যক্ষ হোছেন আলী এক কোটি ৩৩ লাখ ৫৪ হাজার টাকায় স্থানীয় আয়েশা আক্তারের কাছে জায়গাসহ কলেজের ভবনটি বিক্রি করে দেন।
কলেজ সূত্রে জানা গেছে, ঘটনাটি জানাজানি হলে অন্যন্য শিক্ষকরা অধ্যক্ষকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করেন এবং ঘটনাটির প্রতিবাদ করায় ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক হান্নান তালুকদারসহ দুইজন শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করেন অধ্যক্ষ। এতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অবিভাবকরা আরও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন স্থানীয় প্রশাসন ও সংসদ সদস্য।
কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক হান্নান তালুকদার বলেন, ঘটনাটি নিয়ে প্রতিবাদ করায় আমাকেসহ দুজন শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করেছেন অধ্যক্ষ হোছেন আলী চৌধুরী। আমরা এমন দুর্নীতিবাজ অধ্যক্ষ চাই না। তার শাস্তি হওয়া প্রয়োজন।
সমাজকর্ম বিভাগের প্রভাষক জান্নাতুল নাসরিন বলেন, আমরা বাধ্য হয়ে অধ্যক্ষকে অনাস্থা দিয়েছি। তার উপযুক্ত শাস্তি হলে অন্য দুর্নীতিবাজ যেকোনো প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষরা দুর্নীতি বা অনিয়ম করার সাহস পাবে না।
তারাকান্দা বণিক সমিতির সাবেক সভাপতি ও অভিভাবক সায়েদুল ইসলাম মণ্ডল বলেন, আমার গ্রামের এক বিধবা মহিলা ১৪ বছর তার কলেজ ও বাসায় কাজ করেছেন। সবশেষ কলেজে চাকরির জন্য চার লাখ টাকা সুদে এনে দিলেও ওই নারীর চাকরি হয়নি, সে টাকাও ফেরত পাননি। কলেজের জমি চুপিসারে বিক্রি করে দেওয়ার ঘটনা জানতে পেরে আশ্চর্য হয়েছি। এমতাবস্থায় ঐতিহ্য হারানোর শঙ্কায় নারী শিক্ষার এ বিদ্যাপীঠ। অধ্যক্ষ হোছেন আলীর উপযুক্ত শাস্তি হওয়া প্রয়োজন।
বক্তব্য জানতে চাইলে অভিযুক্ত অধ্যক্ষ মো. হোছেন আলী চৌধুরী বলেন, দলিলে কিছু ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে, আমি আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলে দেখছি, বিষয়টি কি করা যায়। তবে বিগত সময়ে কোনো নিয়োগ-বাণিজ্য কিংবা অনিয়মের আশ্রয় নেইনি।
আর জমির ক্রেতা আয়েশা আক্তারের দাবি, কলেজের ভবনসহ জমিটি কিনে নিয়েছেন তিনি। ইতোমধ্যে এ ঘটনায় উত্তেজনা দেখা দেওয়ায় মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) আন্দোলনরত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে আদালতে ১৪৪ ধারা জারির আবেদন করা হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, সমস্ত ঘটনা স্পষ্ট করার লক্ষে তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘটনাটির বিষয়ে অভিযোগ পেয়ে ডিজিসহ সচিবের কাছে তা লিখিতভাবে জানাতে পরামর্শ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন সদ্য অবসরপ্রাপ্ত ময়মনসিংহ বিভাগীয় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অঞ্চলের পরিচালক অধ্যাপক এ কে এম আলিফ উল্লাহ আহসান।
এ বিষয়ে ময়মনসিংহ-২ (তারাকান্দা- ফুলপুর) আসনের সংসদ সদস্য মুহাম্মদুল্লাহ বলেন, কলেজকে ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেওয়া হবে না। এ ঘটনায়
অধ্যক্ষের দায় থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কামরুজ্জামান মিন্টু/নাঈম