পদ্মা মেঘনায় কমেছে ইলিশের যোগান। টানাটানি করে সংসার চালান জেলেরা। আয়ের থেকে ব্যয় বেশি তাই দাদনের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না জেলেরা।
আবার দাদন না নিলেও মাছ বিক্রিতে মহাজনদের কমিশন দেওয়া বাধ্যতামূলক। তাই বাধ্য হয়ে একাধিক মহাজন থেকে দাদন (অগ্রীম ঋণ) নিয়ে নদীতে হয় তাদের।
কীভাবে দাদন ও কমিশনের এই বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসবেন তা বলতে পারছেন না জেলেরা। কথা হয় চাঁদপুর সদরের আনন্দ বাজার, দোকানঘর, সাখুয়া ও বহরিয়া এলাকার দাদনদার এবং জেলেদের সাথে।
দাদন নিয়ে নদীতে মাছ ধরতে যাওয়ার এই পদ্ধতি ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছে তা বলতে পারছে না কেউ। জেলেরা জানান, ২৫ থেকে ৩০ বছর পূর্বে দাদনের পরিমান ছিলো খুবই কম। ৫০০ টাকা দাদন নিয়ে শুরু করলেও এখন নিতে হয় লাখ টাকার বেশি।
সদরের সাখুয়া গ্রামের জেলে ওসমান ঢালী বলেন, তিনি ৩০ বছর আগে ৫০০ টাকা দাদন নিয়ে নৌকা তৈরি করেন। এখনও দাদন প্রক্রিয়ায় রয়েছেন তিনি। কেন বন্ধ করছেন না জানতে চাইলে বলেন, দাদন না নিলেও মাছ বিক্রি করতে মহাজনদের আড়তে ১০% কমিশন দিতে হয়।
দাদন ছাড়াও জেলেরা বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণে টাকা নিয়ে জাল নৌকা প্রস্তুত করেন। মাছ বিক্রি করেই তাদের এই ঋণ পরিশোধ করতে হয়।
দুটি মাছ ধরার নৌকা ও ১০ জন শ্রমিক নিয়ে পদ্মা-মেঘনা ও সাগরে মাছ ধরেন মো. হানু গাজী। দাদন নিয়েছেন ৪ মহাজন থেকে। মাছ ধরতে গেলে সেই এলাকার নেতাদের পতাকা ছাড়া মাছ ধরা যায় না। তাছাড়া সাগরের নিয়ন্ত্রণে থাকে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। তাই দাদন নিতেই হয়।
তিনি আরো বলেন, ইচ্ছে করলেও দাদন থেকে বেরিয়ে আসতে পারছি না। কারণ নদীতে ইলিশ কম। কারেন্টজাল দিয়ে নদীতে মাছ ধরলে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেপ্তার করে। জামিন নিতে টাকা খরচ করেন মহাজনরা। আবার টাকা বিনিয়োগ করতে হয় জাল কিনতে। যার ফলে দাদনের পরিমান প্রতিবছরই বাড়তেই থাকে।
লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়নের বহরিয়া ইলিশের আড়তে বসেন পাঁচ মহাজন। এর মধ্যে সোলেমান মাঝি দুই শতাধিক জেলেকে দাদন দিয়েছেন।
মহাজন বিল্লাল মাঝি বলেন, ৫০ হাজার থেকে ১লাখ টাকা দাদন নেয় জেলেরা। বিনিময়ে আমরা তাদের বিক্রি মাছ থেকে ৫% কমিশন নেই। তারা আমাদের কাছ থেকে দাদন নিয়ে, তাদের নৌকার জেলেদের দাদন দেন। ওইসব জেলে যাতে অন্য নৌকায় চলে না যায়।
কাজেই এই দাদন মহাজন হতে নৌকার মালিক, তার থেকে কাজ করা জেলে পর্যন্ত চলছে। যার কোন সমাধান নেই।
চাঁদপুর সদর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মির্জা ওমর ফারুক বলেন, চাঁদপুরের নৌ-সীমানায় প্রায় ৫০ হাজার নিবন্ধিত জেলে। এসব জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরীর জন্য মৎস্য বিভাগ বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে বেশ কয়েক বছর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। তাদেরকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে অন্য পেশায় যুক্ত হওয়ার জন্য। যাতে করে তারা ঋণ ও দাদনের ভেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। কিন্তু তাতেও কোন কাজ হয়নি। নিজেরা সচেতন না হলে সমাধান সম্ভব না।
এভাবে দাদন আর কমিশনের বেড়াজালে আটকে আছেন মাছ আহরণ করা জেলেরা। দীর্ঘদিন থেকে আয় করলেও স্বচ্ছলতা আসছে না পরিবারে। ঠিক কবে এই দাদন ও কমিশনের ভেড়াজাল থেকে মুক্তি মিলবে জেলেদের তা জানা নেই কারও।
ফয়েজ আহমেদ/ আমান