হাবলুর বয়স ১০ বছর। তবে তার মাথার ভেতর ২৫টা প্ল্যান আর ৮০ ধরনের সন্দেহ সারাক্ষণ ঘুরপাক খায়। সে ভাবে—স্কুলের হেডস্যার আসলে এলিয়েন, গ্রামের মোড়ের পাঁপড়ি বিক্রেতা জ্যোতিষী, আর সবচেয়ে বড় কথা—তার বাড়ির পেছনের কুয়োটা পাতালপুরীর গোপন গেট!
হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছ! হাবলু তিন মাস ধরে সেই কুয়োর দিকে সন্দেহভরা চোখে তাকিয়ে থাকে। কারণ? একদিন দুপুর বেলা, সে কুয়োর ধারে বসে খেজুর খাচ্ছিল। হঠাৎ কুয়োর ভেতর থেকে একটা ফিসফিসে আওয়াজ ভেসে এল— চিকেনপুরী নাকি ডিমপুরী?
হাবলু লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। তার হাত থেকে খেজুর পড়ে গেল কুয়োয়। আর তারপর আবার সেই আওয়াজ— ডিমপুরী শেষ! এখন কেবল পাতালপুরী!
সেই দিন থেকে হাবলুর মাথায় পেঁচিয়ে গেছে পাতালপুরীর ধাঁধা। পরের দিনই হাবলু তার দুই সেরা বন্ধুকে ডেকে পাঠায়—মুনিয়া আর টোকনকে। মুনিয়া হলো একদম গম্ভীর, চশমা পরা মেয়ে। সে নাকি তিনবার হেডস্যারকে চোখের ইশারায় ভীত করেছে। আর টোকন—সে নিজেকে গুগল বলে দাবি করে। মানে, সব জানে। যদিও সে দিনকে ‘উল্টা রাত’ আর গরুকে ‘আলগা গরিল্লা’ বলেই ডাকে।
তো এই তিনজন মিলে কুয়োর পাশে বসে একটা প্ল্যান তৈরি করে। প্ল্যানের নাম দেয়—‘অপারেশন পাতালপুরী’।
হাবলুর কাজ—গার্ডকে পাহারা দেওয়া।
মুনিয়ার কাজ—লিপিবদ্ধ করা।
টোকনের কাজ—পাতালপুরীর সোর্স খোঁজা।
তিন দিন পর্যবেক্ষণের পর একদম ভর দুপুরে তারা দেখে, কুয়োর নিচ থেকে ধোঁয়া উঠছে! আর ধোঁয়ার মধ্যে কেমন যেন ঘিয়ের গন্ধ!
টোকন তখন চিৎকার করে বলে, বন্ধুরা! এটা পাতালপুরীর ধোঁয়া না হলে আমার নাম টোকন গুগল না!
হাবলু ঘোষণা দেয়, কাল ভোরে কুয়োয় নামব!
মুনিয়া চোখ সরু করে বলে, সাবধান। কুয়োর নিচে যদি কুমির থাকে!
টোকন হেসে বলে, তাহলে পাতালপুরী তো কুমিরেই বানায়!
পরদিন ভোরে তারা একে একে রশি বেঁধে হাবলুকে নামিয়ে দেয় কুয়োয়। হাবলু এক হাতে টর্চ, আরেক হাতে ছাতু দিয়ে বানানো হেলমেট পরে কুয়োর নিচে নামে। নামতে নামতে সে হঠাৎ কেমন যেন হাওয়ায় ভাসে। চোখ খুলে দেখে সে পড়েছে এক বিশাল পাতালপুরীতে! চারপাশে ছোট ছোট দোকান, দোকানের নাম ‘পেঁয়াজপুরী প্যালেস’, ‘চিকেন চাট চেম্বার’, ‘ঝালঝোলে জমিদারপুরী’। আর মাঝখানে এক বিশাল রঙ্গিলা চেয়ার, তাতে বসে এক মোটা লোক, যার মাথায় টমেটো রঙের টুপি আর গলায় ঝোলানো—‘পণিপতি’ লেখা ব্যাজ!
পণিপতি বলল, তুমি কি পৃথিবী থেকে এসেছ?
হাবলু বলল, আমি হাবলু। তোমার পাতালপুরীর গন্ধে এসেছি!
পণিপতি গম্ভীরভাবে বলল, হুঁ... তুমি নির্বাচিত হয়েছ। তুমি পাতালপুরীর ‘তরকারি তত্ত্ব’ জানো না তো?
হাবলু মাথা নাড়ল। পণিপতি ব্যাখ্যা দিল, পৃথিবীর মানুষ এখন আর মনের সঙ্গে কথা বলে না। তারা শুধু মোবাইলে গল্প করে। কিন্তু যে শিশু সত্যি সত্যি খাওয়ার গন্ধ শুঁকে সঠিক পুরী চিনতে পারে, তার মন এখনো জীবিত। তাই তাকে আমরা বেছে নিই পাতালপুরীর রক্ষক হিসেবে!
তারপর হাবলুকে দেওয়া হয় একটি ‘ঝাল ঝাঁঝাল ঝুড়ি’, যাতে থাকে বিশেষ মসলা। বলা হয়— যখন কারও মন খারাপ হবে, একটু ঝুড়ি খুলে ছিটিয়ে দিলেই তারা হাসবে।
হাবলু ফিরে আসে সেই ঝুড়ি হাতে। কুয়ো থেকে উঠে দেখে, মুনিয়া আর টোকন এক এক করে ওকে জড়িয়ে ধরে। তারা কেউ বিশ্বাস করে না এই গল্প। কিন্তু তার পর দিন মুনিয়ার দাদি যখন হঠাৎ গম্ভীর হয়ে যান, হাবলু তার চারপাশে হালকা করে মসলা ছিটায়। দাদি হঠাৎ নাচতে শুরু করেন! টোকনের ভাই যখন জিদ করে পড়তে চায় না, হাবলু মসলা ছিটায়, সে গাইতে শুরু করে, আয় খুকু আয়!
সেই থেকে পাড়ার সবাই জানে—হাবলু আসলে পাতালপুরীর বাহক। আর কুয়োর পাশে ছোট একটা গাছ এখন বাড়ছে, যার পাতায় টক-ঝাল গন্ধ ছড়ায়। কেউ জানে না—ওটাই একদিন হবে ‘ঝালরং পাতাল গাছ’—যার পাতায় লাগলে মন হাসে।