ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর সর্বমহলে রাষ্ট্র সংস্কারের যে দাবি উঠেছিল, গত শুক্রবার জুলাই সনদে স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে সরকার। প্রায় আট মাসের ধারাবাহিক বৈঠকের পর এই সনদের স্বাক্ষর হয়েছে। নির্বাচন কমিশনে ইসি নিবন্ধিত ৫৬টি দলের মধ্যে ২১টি এবং কয়েকটি অনিবন্ধিতসহ ৩০টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পর চূড়ান্ত সনদ প্রস্তুত করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। সনদের বাস্তবায়নে রাজনৈতিক ঐকমত্য থাকলেও গণভোটের সময় ও রূপ নিয়ে মতানৈক্য রয়েছে। ৮৪ দফার সংস্কার প্রস্তাবে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ আছে ৯টি সাংবিধানিক ইস্যুতে, যা ভবিষ্যতে গণভোটের মাধ্যমে নিষ্পত্তির প্রস্তাব করা হয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সাত দফা অঙ্গীকারনামা। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘যে ঐক্যে জুলাই সনদে স্বাক্ষর হলো, এই ঐক্যের সুরই দেশকে আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের দিকে নিয়ে যাবে।’
নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপি, যারা ছাত্র-জনতার আন্দোলনের শক্তি হিসেবে সামনে এসেছিল তারাসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল এই সনদে স্বাক্ষর করতে সম্মত হয়নি। এটি রূপান্তরিত বাংলাদেশের জন্য খুবই দুর্ভাগ্যজনক। তবে ভবিষ্যতে তাদেরও সম্পৃক্ত করতে সরকারের পক্ষ থেকে জোর প্রচেষ্টা থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। তবে এনসিপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কমিশনের সঙ্গে আলোচনা তারা চালিয়ে যাবে। আমরা প্রত্যাশা করছি, অন্তর্বর্তী সরকার ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী দেশ জাতীয় নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হবে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরকালে বলেন, এই সনদ স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে নতুন বাংলাদেশের সূচনা হয়েছে; যা আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও সমৃদ্ধির পথে জাতিকে এগিয়ে নেবে এবং গত ১৬ বছরের নৃশংসতার অবসান ঘটাবে। আজ আমাদের নতুন জন্মের দিন। এই স্বাক্ষরের মধ্য দিয়েই আমরা নতুন বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠা করছি।’
নানা বিষয়ে মতভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা জুলাই সনদ স্বাক্ষর করার পর তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। জুলাই জাতীয় সনদে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ ২৪টি রাজনৈতিক দল স্বাক্ষর করেছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের বিষয়টি বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা বলে অভিহিত করেছেন। জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ‘আজকের স্বাক্ষরের মাধ্যমে আমরা সনদে একমত হয়েছি। তবে এর আইনি ভিত্তি এখনো বাকি রয়েছে। সরকারের উচিত তা দ্রুত নিশ্চিত করা।’ নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান বলেছেন, ‘আমি বলব এটা ভালো হয়েছে।’ গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জুনায়েদ সাকি বলেন, বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক দিন।
জুলাই সনদে স্বাক্ষরের দিনই জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় ‘জুলাইযোদ্ধা’ ও পুলিশের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। একটি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে এ ধরনের বিশৃঙ্খলা কোনোভাবেই কাম্য নয়। একটি রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় উত্তরণ ঘটাতে হলে দলমত নির্বিশেষে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলো যে অঙ্গীকার করেছে, সেগুলো দ্রুততম সময়ে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আইনি ভিত্তি নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য সরকারকে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য তৈরিতে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সব রাজনৈতিক দলকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা ও সরকারের ইতিবাচক মনোভাব ভবিষ্যতের রূপান্তরিত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে- সেটাই প্রত্যাশা করছি।