হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বিমানবন্দরের অগ্নিঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আকস্মিক এই অগ্নিকাণ্ডে শিডিউল বিপর্যয় হলে চরম দুর্ভোগ ও বিড়ম্বনার শিকার হন দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গন্তব্যের যাত্রীরা। তবে দেশের প্রধান বিমানবন্দরে কীভাবে এমন ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটল, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে জনমনে। এমনকি এই ঘটনায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর তথা বাংলাদেশের এভিয়েশনের নিরাপত্তাব্যবস্থা আবারও বৈশ্বিক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিমানবন্দরের আমদানি কার্গো ভিলেজের স্কাই ক্যাপিটাল লাউন্জ ও কুরিয়ার সার্ভিস কার্যালয়ের মাঝের স্থান থেকে আগুনের সূত্রপাত। সেখানে থাকা লোকজন ধোঁয়া ও আগুন দেখে দ্রুত বের হয়ে যান। এরপর আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে পুরো কার্গো ভিলেজে। তবে কার্গো কমপ্লেক্সের কর্মীদের দাবি, ভেতরে থাকা কেমিক্যাল বা রাসায়নিক পদার্থ থেকেই আগুনের সূত্রপাত। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া একাধিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় জনমনে যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে, তা নিয়ে সরকার অবগত এবং এ বিষয়ে একটি বিবৃতিও দিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, নাশকতা বা অগ্নিসংযোগের কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ও দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বা উসকানির মাধ্যমে জনজীবন ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে বিঘ্নিত করার সুযোগ দেওয়া হবে না।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ আগুন লাগায় আমদানি করা শত শত টন পণ্যের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন আমদানিকারকরা। বিমা কোম্পানির কাছ থেকে এসব পণ্যের ক্ষতিপূরণ আদায় করাও বেশ সময়সাপেক্ষ বিষয় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। উপস্থিত ফায়ার সার্ভিস ও বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা খবরের কাগজকে বলেন, কার্গো ভিলেজে আগুন লাগলেও সেটি নেভানোর জন্য প্রয়োজনীয় নানা ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু গুদামের ভেতরে যেখানে আগুন লাগে সেখানে হয়তো কোনো কেমিক্যাল বা রাসায়নিক পদার্থ ছিল। সেই কারণে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং ভয়ানক রূপ নেয়। তথ্যমতে, বিমানবন্দরে ফায়ার সার্ভিসের একটি স্টেশন রয়েছে। সেটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাস্থল কার্গো ভিলেজ থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি বিমানবন্দরের অগ্নিঝুঁকি মোকাবিলার জন্য আধুনিক সব ধরনের ব্যবস্থা থাকা দরকার। কার্গো স্টেশনের আগুন শুধু পানির ওপর নির্ভর করে নেভানো সম্ভব নয়। কারণ কার্গো স্পেসে থাকে বিদেশ থেকে আসা নানা রকমের জিনিসপত্র। এর মধ্যে থাকে কেমিক্যালসহ নানা জাতীয় দাহ্য পদার্থ, যা শুধু পানি ছিটিয়ে নেভানো সম্ভব নয়।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ও বিমান পরিচালনা বোর্ডের সাবেক সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, অগ্নি নির্বাপণের সক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন আছে। ইমপোর্ট কার্গো রক্ষণাবেক্ষণ এলাকাটি কতটা ফায়ারপ্রুভ বা সেখানে রেজিস্ট্যান্সের কী ব্যবস্থা আছে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ইমপোর্ট কার্গো সেকশনে নানা ধরনের প্রচুর দাহ্য পদার্থ থাকে। কেমিক্যালজাতীয় জিনিস থাকে। সেসব পানি দিয়ে নেভানো সম্ভব নয়। এর জন্য স্পেশাল কাইন্ড অফ ফোম থাকার দরকার হয়। এর চেয়েও আরও আধুনিক অনেক নির্বাপণের ব্যবস্থা আছে। সেই জায়গা থেকে বিমানবন্দরে কতটুকু সক্ষমতা আছে সে ব্যাপারে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রায় সাড়ে ৬ ঘণ্টার চেষ্টায় ১৩টি ফায়ার স্টেশনের ৩৭টি ইউনিট কাজ করে। এছাড়া সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনীসহ বিভিন্ন সংস্থা এ কার্যক্রমে অংশ নেয়। আন্তর্জাতিক একটা টার্মিনালে এ ধরনের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলায় এতটা সময় কেন লাগল তা নিয়ে রীতিমতো শঙ্কিত অনেকেই। সেখানে আদৌ প্রশিক্ষিত কোনো জনবল আছে কি না, সে বিষয়েও কর্তৃপক্ষের দায়বদ্ধতা রয়েছে। বারবার এমন ঘটনায় শঙ্কিত সাধারণ মানুষ। তাই সরকারকে দ্রুত এ ব্যাপারে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অবিলম্বে তদন্ত প্রতিবেদন জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে। নাশকতা বা অগ্নিসংযোগে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমানিত হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে আধুনিক যুগোপযোগী অগ্নি নির্বাপণব্যবস্থা নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। আশা করছি সরকার বিমানবন্দরে কার্গো ভিলেজের অগ্নি নির্বাপণের সক্ষমতা নিরূপণ করে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।