স্বাধীনতার পর থেকেই দেশের অর্থনীতিতে বিশেষ করে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে দেশের ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো। বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানে বিদেশি সহায়তা কমলেও বাড়ছে ক্ষুদ্রঋণ বিতরণের পরিমাণ। অব্যাহতভাবে বাড়ছে এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণ বিতরণ কার্যক্রমও। ক্ষুদ্রঋণের সার্বিক কার্যক্রম, সমস্যা এবং সম্ভাবনা নিয়ে দৈনিক খবরের কাগজের সঙ্গে কথা বলেছেন মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হেলালউদ্দিন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মৃত্তিকা সাহা।
খবরের কাগজ: এনজিওগুলো মূলত দারিদ্র্যবিমোচনের জন্য তাদের কার্যক্রম শুরু করেছিল। এই দীর্ঘ পরিক্রমায় বর্তমানে এনজিওগুলোর কার্যক্রম ও অবস্থা কেমন?
হেলালউদ্দিন: আমরা যখন দারিদ্র্যবিমোচনের কথা বলি, তখন শুধু আয়ের দারিদ্র্য নিয়ে কথা বলি না। এখন এনজিওগুলো বহুমাত্রিক দারিদ্র্য মাথায় রেখে কাজ করে। এর মধ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থানের মতো বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত। এমনকি নারীর ক্ষমতায়ন এবং তাদের আপেক্ষিক সক্ষমতা বৃদ্ধিও এনজিও কার্যক্রমের একটি বিরাট অংশ। সুতরাং এখন এনজিওগুলো দারিদ্র্যবিমোচনের পাশাপাশি অন্যান্য সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেও কাজ করছে।
খবরের কাগজ: এনজিও কার্যক্রম কি তাহলে শুধু ক্ষুদ্রঋণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়?
হেলালউদ্দিন: একদমই নয়। ক্ষুদ্রঋণ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি মূলধনের অভাবে থাকা উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন কার্যক্রম শুরু করতে সাহায্য করে। কিন্তু এনজিও কার্যক্রম শুধু ক্ষুদ্রঋণ নয়, এর বাইরেও অনেক সামাজিক কার্যক্রম আছে। আগে অনেক এনজিও ছিল যারা প্রধানত বিদেশি দাতা নির্ভর ছিল এবং তহবিল পেলে সামাজিক কার্যক্রম করত। বর্তমানে যারা ক্ষুদ্রঋণ করছে, তাদের উদ্বৃত্তের একটা অংশ সামাজিক খাতে ব্যয় করতে হয়।
খবরের কাগজ: ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্বৃত্তের কত শতাংশ সামাজিক কার্যক্রমে ব্যয় করার নির্দেশনা আছে?
হেলালউদ্দিন: আমাদের আইনে নির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া আছে। গত বছরের উদ্বৃত্তের মধ্যে তাদের ১০ শতাংশ রিজার্ভ হিসেবে সংরক্ষণ করতে হয়। এরপর তারা সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ সামাজিক খাতে ব্যয় করতে পারে। বাকিটা তাদের পুনঃমূলধনি তহবিলে চলে যায় অথবা মূলধনি কাঠামো (যেমন: একটি বিল্ডিং, ট্রেনিং সেন্টার, বা হেড অফিস তৈরি) নির্মাণে খরচ করতে পারে। এই ব্যয় অবশ্যই গ্রাহকদের দারিদ্র্যবিমোচনসংশ্লিষ্ট প্রোগ্রামে খরচ করতে হবে বলে আইনে উল্লেখ আছে।
খবরের কাগজ: বর্তমানে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনাকারী নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কত?
হেলালউদ্দিন: আমি নিবন্ধিত এনজিও সংখ্যা বলতে পারব না, তবে যারা ক্ষুদ্রঋণ করে, তাদের মধ্যে সনদপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এখন প্রায় ৬০০ থেকে ৬৮৫টি। এই সংখ্যাটা আগে প্রায় ৯০০-এর উপরে ছিল। এ ছাড়াও ৩৫০টির মতো প্রতিষ্ঠানকে আমরা সাময়িক অনুমোদন দিয়েছি।
খবরের কাগজ: সাময়িক অনুমোদন বলতে কী বোঝায়? আর এই সংখ্যা কমিয়ে আনার কারণ কী?
হেলালউদ্দিন: সাময়িক অনুমোদনের মেয়াদ সাধারণত তিন বছর থাকে। এই সময়ের মধ্যে আমরা কিছু মানদণ্ড দেখি। যদি তাদের পারফরম্যান্স একটা নির্দিষ্ট স্তরে আসে, তবে আমরা তাদের স্থায়ী সনদ দিই। যদি না আসে, অনেকের সাময়িক অনুমোদন বাতিল করা হয়। সংখ্যা কমার প্রধান কারণ হলো, অনেকে এই সনদ সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারছে না, অথবা অনেকে ক্ষুদ্র ঋণ না করে সমবায় সমিতির দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে। নানা কারণে যারা পারছেন না, তাদের সনদ বাতিল করা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ৬০০ এর বেশি প্রতিষ্ঠান অনেক বেশি। সারা দেশে যেখানে ৫০-৬০টি ব্যাংক কাজ করতে পারে, সেখানে ৬০০-এর বেশি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান থাকাটা বেশি। এত বেশি প্রতিষ্ঠান থাকলে প্রতিযোগিতা কমে যায় এবং অনেকে হয়তো ভালো করতে না পেরে উল্টাপাল্টা কিছু করে, যা পুরো সেক্টরের সুনাম নষ্ট করে। এছাড়া দেশে এখন ৯ শতাধিক ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন রয়েছে। এর মধ্যে ৯৯ শতাংশ ক্ষুদ্রঋণসেবা দেয় মাত্র ১৮৬টি প্রতিষ্ঠান। বাকি ১ শতাংশ ক্ষুদ্রঋণের ক্ষেত্রে কীভাবে এতগুলো প্রতিষ্ঠান বেঁচে থাকবে। এটা তো সম্ভব নয়।
খবরের কাগজ: অনেক ক্ষেত্রে খাতটি সম্পর্কে বিরূপ ধারণা তৈরি হয়, এর পেছনে আপনাদের কী ধরনের পর্যবেক্ষণ আছে?
হেলালউদ্দিন: হ্যাঁ, বিরূপ ধারণা তৈরি হওয়ার পেছনে কিছু কারণ আছে। ৬০০টির মধ্যে যদি মাত্র ৫-১০টি প্রতিষ্ঠানও খারাপ কাজ করে, তবে সেটাই সবার ধারণা নষ্ট করে দিতে পারে। ঋণগ্রস্ত হয়ে কারও আত্মহত্যার খবর প্রকাশিত হলে (যদিও এগুলো কম এবং কখনো কখনো সমবায় সমিতি থেকে ঋণ নেওয়া) পুরো খাতের বদনাম হয়। এ ছাড়া ঋণচক্রের (একজনের থেকে ঋণ নিয়ে আরেকজনের ঋণ পরিশোধ করা) কারণেও অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং এটিও বদনামের সৃষ্টি করে।
খবরের কাগজ: এত বিশালসংখ্যক প্রতিষ্ঠান তদারকি করতে এমআরএর সক্ষমতা কেমন?
হেলালউদ্দিন: আমাদের আইন এবং বিধিমালা আছে, তাই চাইলেই তারা উল্টাপাল্টা কিছু করতে পারে না। কিন্তু তদারকির ক্ষেত্রে আমাদের সীমাবদ্ধতা আছে। সারা দেশে প্রায় ২৭ হাজার শাখা মনিটর করার জন্য আমাদের কর্মকর্তা আছেন মাত্র ২০০ জন, যা পর্যাপ্ত নয়। তবে আমরা কাঠামো শক্তিশালী করার জন্য কাজ করছি। এমআরএ আইন (২০০৬) সালের দিকে হয়েছে। একটি রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠান শক্তভাবে দাঁড়ানোর জন্য সময় লাগে এবং আমার মনে হয় আমরা অনেকটাই এগিয়ে এসেছি।
খবরের কাগজ: ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম কি গ্রামীণ অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে?
হেলালউদ্দিন: অবশ্যই গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে ক্ষুদ্রঋণ বিরাট একটা ভূমিকা রাখছে। তবে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ক্ষুদ্রঋণের প্রভাব কতটুকু, রেমিট্যান্সের প্রভাব কতটুকু, বা অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি কার্যক্রমের প্রভাব কতটুকু, তা আলাদা করে চিহ্নিত করা খুব কঠিন। গ্রামীণ অর্থনীতি সক্রিয় হওয়ার পেছনে একটি মিশ্র প্রভাব (আন্তঃক্রিয়া) কাজ করছে। একদিকে রেমিট্যান্স আসছে, অন্যদিকে ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে লোকজন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড করছে এবং এই উভয় প্রভাবের কারণে স্থানীয় বাজারে চাহিদা তৈরি হচ্ছে। এ সবকিছু সম্মিলিত প্রভাবে গ্রামের অর্থনীতি অনেক বেশি সক্রিয় হয়েছে এবং বাংলাদেশের গ্রামগুলো আগের তুলনায় অনেক বেশি পরিবর্তিত হয়েছে।
খবরের কাগজ: ক্ষুদ্রঋণের সুদের হার অনেক বেশি- গ্রাহকদের এমন অভিযোগ রয়েছে। সুদহার কমানোর বিষয়ে কোনো উদ্যোগ আছে কী?
হেলালউদ্দিন: আমরা একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করেছি। এই কমিটি হিসাব করে দেখবে যে তাদের তহবিল জোগানের খরচ, পরিচালনার খরচ এবং উদ্বৃত্ত কেমন। যদি দেখা যায় গড় উদ্বৃত্ত বেশি থাকছে, তবে আমরা সুদের হার কমানোর চেষ্টা করব। তবে এটি একটি সংবেদনশীল বিষয়। আমরা কোনো আবেগপ্রসূত সিদ্ধান্তে হঠাৎ করে হার বাড়িয়ে দিতে পারি না। কারণ তাতে অনেক প্রতিষ্ঠান চাপে পড়ে যেতে পারে, যা পুরো খাতের জন্য ভালো হবে না।
খবরের কাগজ: এই টেকনিক্যাল কমিটির সিদ্ধান্ত বা ফলাফল কতদিন নাগাদ আশা করা যায়?
হেলালউদ্দিন: সাধারণত এ ধরনের কমিটি হলে তথ্য-উপাত্ত যাচাইয়ের জন্য ছয় থেকে ৯ মাস সময় লেগে যায়। কারণ কমিটির সদস্যরা পূর্ণ সময়ের কর্মী নন। আশা করা যায়, আগামী ছয় মাসের মধ্যে কিছু একটা ফলাফল আসতে পারে।
খবরের কাগজ: তহবিল জোগানের ক্ষেত্রে এনজিও-এমএফআইগুলোর মূল উৎস কোনটি?
হেলালউদ্দিন: তহবিলের প্রধান উৎসগুলো হলো: গ্রাহকদের সঞ্চয়, ক্রমপুঞ্জীভূত উদ্বৃত্ত, ব্যাংক ঋণ ও পিকেএসএফ থেকে প্রাপ্ত তহবিল। এর মধ্যে গ্রাহকদের সঞ্চয়ের পরিমাণ প্রায় ৩৮ থেকে ৪০ শতাংশ। ক্রমপুঞ্জীভূত উদ্বৃত্ত প্রায় ৩৩ থেকে ৩৪ শতাংশ, ব্যাংক ঋণ প্রায় ১৪ শতাংশ এবং পিকেএসএফ থেকে প্রাপ্ত তহবিল প্রায় ৫ শতাংশ। বর্তমানে ক্ষুদ্র ঋণের তহবিল জোগানের ক্ষেত্রে বৈদেশিক সহায়তা খুব কম, এক শতাংশেরও কম।
খবরের কাগজ: বৈদেশিক সহায়তা কমার কারণ কী?
হেলালউদ্দিন: বৈদেশিক সহায়তা কেবল আমাদের দেশে কমেছে তা নয়। সারা বিশ্বেই এটি কমছে। এই প্রেক্ষাপটে স্থানীয় উদ্যোগগুলোর সম্প্রসারণ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অফুরন্ত সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে আর্থিক খাতে তাদের অন্তর্ভুক্তির সুযোগ সৃষ্টি করা জরুরি। বিশেষ করে ব্যাংকগুলোতে ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতারা প্রায়ই উপেক্ষিত হন বলে অভিযোগ আসে। ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো এই শ্রেণির গ্রাহকদের দিকে বেশি মনোযোগ দেয়।
খবরের কাগজ: ক্ষুদ্রঋণ বিতরণের পরিমাণ বাড়ছে কি?
হেলালউদ্দিন: গত পাঁচ বছরে নিবন্ধিত এমএফআই প্রতিষ্ঠানের ঋণ বিতরণের পরিমাণ বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এমএফআই প্রতিষ্ঠানগুলো যেখানে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৩০০ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছিল, সেখানে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ২ লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকা।
খবরের কাগজ: এমআরএ কি সব এনজিওকে নিয়ন্ত্রণ করে?
হেলালউদ্দিন: না। এমআরএ শুধু সেই এনজিওগুলোকেই নিয়ন্ত্রণ করে যারা ক্ষুদ্রঋণের সঙ্গে যুক্ত। যারা শুধু বৈদেশিক তহবিল নিয়ে সামাজিক কার্যক্রম করে, তাদের এনজিও অ্যাফেয়ার্স ব্যুরো দেখাশোনা করে। এই ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমরা এনজিও-এমএফআই (মাইক্রোফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠান) বলি।
খবরের কাগজ: এই এনজিও-এমএফআইগুলো কি বৈদেশিক সহায়তা পায়?
হেলালউদ্দিন: হ্যাঁ। অনেক এনজিও-এমএফআই আছে যাদের মাইক্রোফাইন্যান্স অপারেশনও আছে, আবার সামাজিক প্রোগ্রামও আছে। তবে এখন যেহেতু দাতা-নির্ভর তহবিল কম আসছে, তাই অনেকে সামাজিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার জন্য এমএফআই থেকে হওয়া উদ্বৃত্ত আয় ব্যবহার করার চিন্তা করছে। তারা ভাবছে, বাইরে থেকে তহবিল না পেলেও এখান থেকে আয় জেনারেট করে কার্যক্রম চালানো যাবে।