বাংলাদেশের ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে নারীদের আপত্তিকর কনটেন্ট ব্যবহার করে রাজনৈতিক এবং সামাজিকভাবে হেনস্তার ঘটনা অহরহ ঘটছে। বিশেষ করে রাজনীতি এবং বিনোদন ক্ষেত্রে নারীরা অপতথ্যের সমন্বিত ক্যাম্পেইনের শিকার হচ্ছেন। হেনস্তার এসব ঘটনা সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগীদের জীবনে স্বল্প এবং দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বৃহস্পতিবার (৮ মে) নিজেদের ওয়েবসাইটে এ সম্পর্কিত একটি ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে রিউমর স্ক্যানার। প্রতিবেদনে একজন নারীকে জড়িয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত এবং অযাচিতভাবে যে ভুয়া তথ্য ও অপপ্রচার চালানো হয়েছে তার কেস স্টাডি তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, গেল কয়েক মাসে সমন্বয়ক ট্যাগ দিয়ে আপত্তিকর ছবি-ভিডিওর মাধ্যমে নারীদের হেনস্তার ঘটনা নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতি সম্প্রতি এমন একটি ঘটনার বিষয়ে অনুসন্ধানে করতে গিয়ে কিছুটা ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ঘটনাটি পর্যবেক্ষণ করেছে রিউমর স্ক্যানার।
গত ২২ এপ্রিল রিউমর স্ক্যানারের নজরে আসে একটি ভিডিও। ক্যাপশনে সমন্বয়ক রুবাইয়া ইয়াসমিন নাম দিয়ে সেদিন দুপুরের পর থেকে ব্যাপকভাবে ভিডিওটি ছড়াতে থাকে। ভিডিওতে এক নারীকে ধূমপান ও মদ্যপান করতে দেখা যাচ্ছিল। একইদিন ভিডিওটির আরেকটি পার্টও ভাইরাল হয়। উক্ত ভিডিওতে এই নারীকে একই পোশাকে দেখা যায়। পরবর্তীতে একই নারীর আরেকটি ভিডিও-ও ছড়ানো হয় সামাজিক মাধ্যমে, যেখানে তাকে গাড়িতে বসা অবস্থায় দেখা যায়।
এ ছাড়া একই নারীর এই ভিডিও ক্লিপগুলো এবং ভিডিও ক্লিপ থেকে নেওয়া স্ক্রিনশট নিয়ে তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সাথে দেখা করেছেন দাবিতে আরেকটি ছবিও প্রচার হতে দেখা যায়। আবার, তিনি বক্তব্য দিচ্ছেন এমন দাবিতে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ডিবিসির লোগো সম্বলিত এক নারীর বক্তব্যের ভিডিও-ও সামাজিক মাধ্যমে প্রচার হতে দেখা যায়।
অর্থাৎ, ২২ এপ্রিল একদিনেই এক নারীকে কেন্দ্র করে তাকে সমন্বয়ক পরিচয় দিয়ে অন্তত পাঁচটি কনটেন্ট ভাইরাল করা হয়। এসব কনটেন্টের অন্তত একটি (গাড়ির ভিডিও) বেশ আপত্তিকর।
রিউমর স্ক্যানার বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানে নেমে জানতে পারে, ধূমপান ও মদ্যপানের দাবিকৃত ভিডিও দুইটিতে যে নারীকে দেখা যায়, তার নাম এমএক্স যুথী (ফেসবুক পেজের নাম অনুযায়ী)। তাকে নিয়ে এই আলোচনার মধ্যেই তার ফেসবুক পেজে এক ভিডিও বার্তায় জানানো হয়, তিনি কোনো সমন্বয়ক নন এবং নিজেকে শিক্ষার্থী হিসেবেও দাবি করেন না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পাঁচ-ছয় বছর আগেই তিনি পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি জানান, মাহি নামের এক বান্ধবী মজার ছলে ভিডিওগুলো ধারণ করে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করেন। যদিও পরবর্তীতে ভিডিওগুলো মুছে ফেলা হয়, তবে ততক্ষণে তা ডাউনলোড করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
আবার এই নারীকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক দাবি করা হলেও দলটিতে এই নামে উক্ত পদে কেউ নেই।
এদিকে, নাহিদ ইসলামের পাশে যাকে ‘কথিত রুবাইয়া ইয়াসমিন’ হিসেবে দাবি করা হচ্ছে, তিনি মূলত ঢাকা মহানগর উত্তর বাংলাদেশ ছাত্রপক্ষের আহ্বায়ক ইসরাত জাহান ইশা। অন্যদিকে, গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার ভিডিওতে যিনি কথা বলছেন, তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেত্রী তাসনূভা জাবীন।
রিউমর স্ক্যানার বলছে, এই বিষয়টি জানার পূর্বে রীতিমতো কাল্পনিক একটি নাম এবং প্রায় পূর্ণাঙ্গ পরিচয় ব্যবহার করে যেভাবে বিষয়টিকে বিশ্বস্ততা দেওয়ার চেষ্টা করা হলো তা নজিরবিহীন।
অনুসন্ধান চলাকালেই কথিত এই ‘রুবাইয়া ইয়াসমিন’ দাবিকৃত নারীর আরো পরিচয় ‘যুক্ত’ করে কিছু পোস্ট নজরে আসে রিউমর স্ক্যানারের। পোস্টগুলোতে দাবি করা হয়, সমন্বয়ক রুবাইয়া ইয়াসমিনের ডাকনাম তৃণা। উপদেষ্টা মোস্তফা সরোয়ার ফারুকীর ফুফা শ্বশুরের মেয়ে। কুষ্টিয়া ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। বর্তমানে উপদেষ্টা দুলাভাইয়ের কল্যাণে একটি বেসরকারী কলেজে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। ইতিমধ্যেই দুইটি বিয়ে করেছেন এবং উভয় স্বামীকে ডিভোর্স দিয়েছেন।
অথচ, এই নামের বা পরিচয়ের কোনো নারীর অস্তিত্বই মেলেনি বলে জানিয়েছে রিউমর স্ক্যানার।
রিউমর স্ক্যানারের পর্যবেক্ষণে একই নারীর আরেকটি পরিচয়ও অনলাইনে প্রচার হতে দেখা যায়৷ কিছু ফেসবুক পোস্টে উক্ত নারীর ভিডিওর সাথে Mst. Ruma Akhtar নামে এক নারীর ফেসবুক প্রোফাইলের স্ক্রিনশট জুড়ে দিয়ে দাবি করা হয়, আলোচিত ভিডিওগুলোর নারী ইনি। তার পরিচয় জিয়া সাইবার ফোর্সসের নওগাঁ জেলা শাখার সদস্য।
এই দাবিটির সূত্রপাত বঙ্গ বার্তা নামের একটি ফেসবুক প্রোফাইল। যদিও পরবর্তীতে উক্ত প্রোফাইল থেকে ভিডিওটি সরিয়ে ফেলা হয়। মোছা: রুমা আখতারের ফেসবুক প্রোফাইল পর্যবেক্ষণ করে জানা যায়, তিনি নিজেকে নওগাঁ জেলা শ্রমিক দলের সদস্য এবং একই জেলার জিয়া সাইবার ফোর্সের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য বলে পরিচয় দিচ্ছেন। এই নারীর চেহারার সাথে আলোচিত ভিডিওগুলোর নারীর চেহারার মিল পাওয়া যায়নি।
অর্থাৎ, রিউমর স্ক্যানারের পর্যবেক্ষণে এমএক্স যুথীকে দুইটি ভিন্ন দলের কর্মী বা সমর্থক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।
তবে বিষয়টি নিয়ে আরো পর্যবেক্ষণ এবং পরবর্তীতে প্রাপ্ত তথ্যাদি বিশ্লেষণের পর যা দেখা গেছে তা দেশের রাজনীতির জন্য রীতিমতো চিন্তার কারণ হয়ে উঠতে পারে বলে জানিয়েছে রিউমর স্ক্যানার।
রিউমর স্ক্যানার টিম পরবর্তীতে ফেসবুকে কি-ওয়ার্ড সার্চ করে দেখতে পায়, এই মুহূর্তে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় দেশের প্রায় সকল দল ও তার অঙ্গ-সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠনের কর্মী ও সমর্থকরা ২২ এপ্রিল দিনভর এই নারীকে নিয়ে একই দাবি পোস্ট করেছেন। এটা খুব স্বাভাবিক বিষয় যে, বিপরীত রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনগুলোর সমর্থকরা এই দাবিটি প্রচার করবেন। হয়েছেও তাই। আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ এর নেতা, কর্মী ও সমর্থকদের প্রোফাইল এবং পেজে এ সংক্রান্ত অসংখ্য পোস্ট নজরে এসেছে রিউমর স্ক্যানারের। তবে অপতথ্যের এই স্রোতে সমানতালে গা ভাসিয়েছে অন্যান্য দলগুলোও। এদের মধ্যে বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে জামায়াতে ইসলামী এবং গণঅধিকার পরিষদের যুব উইং যুব অধিকার পরিষদও।
এসব অপতথ্য প্রচারকারীদের সিংহভাগের পোস্টই এখনও সচল রয়েছে। অর্থাৎ বিষয়টি যে ভুয়া বা উক্ত নারী যে কোনো সমন্বয়ক নয় তা প্রকাশ্যে আসার পরও এ সংক্রান্ত ভুয়া দাবির পোস্টগুলো এখনও ফেসবুকে রয়েছে। রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়া নতুন একটি দলের বিরুদ্ধে প্রায় সকল দলের এমন সমন্বিত অপতথ্যের প্রচার বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরলই বলতে হয়।
ঘটনা অবশ্য এখানেই শেষ নয়। কোনো একটি ঘটনা বা কোনো একজন ব্যক্তির বিষয়ে বেশ আলোচনা বা সমালোচনা হলেই দেখা যায় যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম ও ছবি ব্যবহার করে রাতারাতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতেও বিভিন্ন পেজ বা অ্যাকাউন্ট গজিয়ে ওঠে। কিছু ক্ষেত্রে পুরোনো অ্যাকাউন্ট বা পেজের নাম ও ছবি বদলে দিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় জুড়ে দেওয়া হয়। কথিত রুবাইয়া ইয়াসমিনের ক্ষেত্রেও এমন ঘটেছে।
২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট MH Sakib নামে খোলা হয় একটি ফেসবুক পেজ। ২২ এপ্রিল যুথীকে নিয়ে আলোচিত ঘটনাটির পরদিন এই পেজের নাম বদলে রাখা হয় রুবাইয়া ইয়াসমিন। পেজটির কনটাক্ট সেকশনে একটি ফোন নাম্বার দেওয়া রয়েছে। ট্রু কলারে যাচাই করে নাম্বারধারীর নাম ‘সাকিব’ বলে জানা যাচ্ছে। নাম্বারটির হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্টে এক তরুণের ছবি রয়েছে। একই নামে ২২ এপ্রিল আরেকটি পেজ খোলা হয়েছে ফেসবুকে। পেজগুলোয় নিয়মিত ফলোয়ার বাড়ছে, প্রথমটিতে পোস্টও হচ্ছে নিয়মিত।
উক্ত কেসস্টাডিকে ডিসইনফরমেশন ছড়ানোর কোয়ালিশন হিসেবে দেখছেন গণমাধ্যম বিশ্লেষকরা।
/সিফাত