ইরানের বিরুদ্ধে গত শুক্রবার ইসরায়েলের বিমান হামলা শুরুর পর তেহরান ইসরায়েলের ওপর প্রতিশোধমূলক হামলা চালায় এবং কিছু ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে।
ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান আক্রমণে ইরানে ৬৩৯ জন নিহত এবং এক হাজার ৩২০ হয়েছে, যার মধ্যে নারী ও শিশু রয়েছে।
এই হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইরান প্রায় ৪০০টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং শত শত ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। যার ফলে ইসরায়েলে কমপক্ষে ২৪ জন নিহত এবং কয়েক শ আহত হয়েছেন। হামলার ভয়ে দেশজুড়ে ইসরায়েলিদের বোমা আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন।
ইরানের কিছু ক্ষেপণান্ত্র মধ্য ইসরায়েলের আবাসিক এলাকায় আঘাত হেনেছে। যার ফলে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। রাজধানী তেল-আবিবে অবস্থিত ইসরায়েলের সুরক্ষিত সামরিক সদর দপ্তর কিরিয়াতেও আঘাত হেনেছে। যদিও সেখানে ক্ষয়ক্ষতি কম হয়েছে।
মঙ্গলবার ইরান বলেছে, তারা একটি সামরিক গোয়েন্দাকেন্দ্র এবং মোসাদ গুপ্তচর সংস্থার একটি অপারেশন পরিকল্পনাকেন্দ্রে হামলা করেছে, যা ইসরায়েলের উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে দিয়েছে।
সাম্প্রতিক ইতিহাসে ইসরায়েল এই সিস্টেমগুলোর মাধ্যমে বেশিরভাগ হামলা সফলভাবে প্রতিহত করেছে। তার স্বাক্ষর আয়রণ ডোম। তাহলে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কীভাবে ইসরায়েলের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অতিক্রম করছে?
ইসরায়েলের আয়রন ডোম কী?
আল জাজিরার প্রতিরক্ষা সম্পাদক অ্যালেক্স গ্যাটোপোলোস বলেন, যদিও আয়রন ডোম ইসরায়েলের বিমান প্রতিরক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত, এটি একটি বৃহত্তর ব্যবস্থার একটি অংশ মাত্র, যার মধ্যে রয়েছে ‘এই বহুস্তরীয়, সমন্বিত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সর্বনিম্ন স্তর।’
আয়রন ডোম ছোড়া রকেট বা ক্ষেপণাস্ত্র সনাক্ত করে, তার পথ নির্ধারণ করে এবং তা আটকে দেয়। ইসরায়েল জানায়, আয়রন ডোম ৯০ শতাংশ কার্যকর। ২০০৬ সালে হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধের সময় রকেট আক্রমণ মোকাবেলা করার জন্য এটি তৈরি করার পর এটি ২০১১ সালে কার্যকর হয়।
গ্যাটোপোলোস ব্যাখ্যা করে, যে আয়রণ ডোমটি নিম্ন-স্তরের রকেটগুলোকে বাধা দেওয়ার জন্য ডিজাইন করা। এগুলো বড় বড় ক্ষেপণাস্ত্র সনাক্ত করতে সক্ষম হবে না।
ইসরায়েলের ‘বারাক-৮’ ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাও রয়েছে, যা মাঝারিপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করে। তাছাড়া, টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স সিস্টেম, যা স্বল্প-মাঝারি এবং মাঝারিপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করে; এবং ডেভিড’স স্লিং, যা মাঝারি থেকে দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগু প্রতিহত করে।
ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা কী?
ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অ্যারো-২ এবং অ্যারো-৩ ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রকে বাধা দেয়। যেমন, বর্তমান সংঘাতে ছোড়া ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র।
অ্যারো প্রকল্পের প্রধান ঠিকাদার হলো রাষ্ট্রায়ত্ত ইসরায়েল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ, এবং বোয়িং ইন্টারসেপ্টর তৈরির সঙ্গে জড়িত। অ্যারো-২ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ভেতরে এবং বাইরে সামান্য বেশি উচ্চতায় আসা ক্ষেপণাস্ত্র বাধা দেওয়ার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে।
বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহারের পাশাপাশি ইসরায়েল আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও রয়েছে। যার মধ্যে ইসরায়েলের দিকে অগ্রসর হওয়া ড্রোন ধ্বংস করার জন্য যুদ্ধ হেলিকপ্টার বা যুদ্ধবিমানের মতো বিমান ব্যবহার করা হয়।
বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে?
ইসরায়েলি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তিনটি উপাদান দিয়ে তৈরি: একটি রাডার সিস্টেম, একটি কমান্ড এবং নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র এবং ইন্টারসেপ্টর মিসাইল-সহ একটি লঞ্চার।
রাডারে শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্রে নজর রাখা হয়, যা নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রকে সতর্ক করে এবং কোন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে হবে তা নির্ধারণ করে।
কিংস কলেজ লন্ডনের পোস্টডক্টরাল গবেষক মেরিনা মিরন আল জাজিরাকে বলেন, লঞ্চারটি সাধারণত শত্রুপক্ষের একটি ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য দুটি ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র পাঠায়।
সমস্ত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সীমিত সংখ্যক ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সজ্জিত এবং ইসরায়েলের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের সঠিক সংখ্যা জনসাধারণের কাছে অজানা।
ইরান কি ইসরায়েলি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে ফেলেছে?
গত শনিবার সংবাদসংস্থা রয়টার্সকে এক ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তা বলেন, তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ‘৮০ বা ৯০ শতাংশ সাফল্যের হার’ রয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কোনো ব্যবস্থারই নিখুঁত হার নেই। এর অর্থ হলো কিছু ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র সুরক্ষা দুর্গ ভেদ করে এসেছিল।
ইরান কীভাবে এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে পেরেছে?
যদিও আমরা ঠিক জানি না, কিভাবে কিছু ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অতিক্রম করে গেছে। তবুও ইরানি ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র বাধা এড়াতে সক্ষম হওয়ার কয়েকটি সম্ভাব্য উপায় রয়েছে।
ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র নিষ্ক্রিয় করা
ইরানের ইসরায়েলি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়ার একটি সম্ভাব্য উপায় হলো ইসরায়েলের ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া।
হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র
ইরানের হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিকাশ এবং পরিপক্কতার সরাসরি প্রতিক্রিয়া দেয়। কারণ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এড়াতে একটি উপায় হলো দ্রুত গতির ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা, যা বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সংকেত পাঠাতে কম সময় দেয়।
হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র রাডার দ্বারা সনাক্ত করা হলেও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পক্ষে বাধা দেওয়া কঠিন।
কিছু হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রে একটি হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকেল (এইচজিভি)ও থাকে, যা একটি ওয়ারহেড যা ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে সংযুক্ত। এটি শব্দের গতির চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি গতিতে চলতে এবং গ্লাইড করতে পারে। ইরানের ফাত্তাহ-২ এইচজিভি ব্যবহার করে। দ্রুত গতিতে চলার সময় এইচজিভিগুলো জিগজ্যাগ করে এবং নিয়মিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মতো ভবিষ্যদ্বাণীমূলক পথে অগ্রসর হয় না।
ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র
ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে এবং বাধা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ইরানের অস্ত্রাগারে হোভেজেহ ক্ষেপণাস্ত্রের মতো ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে এবং তারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। যদিও এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে ধীর, তবুও এগুলো বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অতিক্রম করে নিচু এবং স্থিরভাবে পাইলটবিহীন বিমানের মতো উড়ে যায়।
বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার অন্য কোনো উপায় আছে?
বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরীক্ষা করার আরেকটি উপায় হলো ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্রের ছলনা দিয়ে তাদের সিস্টেমগুলো ওভারলোড করে পরীক্ষা করা।
কিছু ক্ষেপণাস্ত্র রাডার ফাঁকি দেওয়ার প্রযুক্তিতে তৈরি, যা বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য সনাক্ত করা অসম্ভব করে তোলে।
ইরান বা ইসরায়েলের কি ক্ষেপণাস্ত্র ফুরিয়ে যেতে পারে?
ইরান এবং ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাত এই মুহূর্তে আক্রমণাত্মক। গত সোমবার ইসরায়েল ইরানের আকাশসীমার ওপর আধিপত্যের দাবি করেছে। তবে, ইরান এবং ইসরায়েলের মধ্যে সবচেয়ে কম দূরত্ব হলো এক হাজার কিলোমিটার (৬২০ মাইল)। ইসরায়েলি বিমানেরগুলো জন্য যা অনেক দীর্ঘ পথ। প্রয়োজন জ্বালানীর। সেক্ষেত্রে আকাশে জ্বালানি ভরার ব্যবস্থা নিতে হতে পারে। সূত্র: আল জাজিরা
অমিয়/