নাটকীয় গল্পটি চলতি মাসের মাঝামাঝি এক সকালের। ১৪ জন রাজনৈতিক বন্দীকে নিয়ে একটি বাস বেলারুশের সবুজ গ্রামাঞ্চলের মধ্য দিয়ে অজানা গন্তব্যে ছুটে যাচ্ছিল।
সাবেক সোভিয়েত দেশটিতে এখনও ভিন্নমতাবলম্বীদের উপর রাষ্ট্রপতি আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো দমন অভিযান চলমান। সেই আটক অভিযান শুরুর পাঁচ বছর পর, এদিন এই ১৪ বন্দী আশঙ্কা করেছিলেন, আজ হয়ত তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে।
এই দলটির মধ্যে ছিলেন বিশিষ্ট ভিন্নমতাবলম্বী সিয়ারহেই সিখানৌস্কি, যার স্ত্রী স্বিয়াতলানা সিখানৌস্কায়া ২০২০ সালে তার স্বামীর গ্রেপ্তারের পর বেলারুশিয়ান বিরোধী আন্দোলনের প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন।
বাসটি গন্তব্যের কাছে পৌঁছালে বেলারুশিয়ান নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা (এখনও সোভিয়েতে কেজিবি নামে পরিচিত) যখন তাদের মুখে বাঁধা থেকে কালো কাপড় সরিয়ে ফেলে। এই দলের দুই বছর ধরে কারাবন্দী বেলারুশিয়ান সাংবাদিক ইহার কার্নেই বলেন, ‘আমরা তখনও সামনের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। আমারা ভেবেছিলাম এখন হয়ত আমাদের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হবে।’
কিন্তু, বাসটি বেলারুশের লিথুয়ানিয়া সীমান্তের খুব কাছে একটি মাঠে এসে থামল। হঠাৎ ভ্যানের দরজা খুলে যায় এবং তাদেরকে আশ্চর্যজনক এক অভিবাদন জানানো হয়- অভিনন্দন! রাষ্ট্রপতি আমাকে আপনাদের বাড়িতে পৌঁছে দিতে পাঠিয়েছেন।
হতবাক বন্দীদের সঙ্গে কথা বলা ব্যক্তিটি ছিলেন জন কোল, যিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত কিথ কেলগের উপ-প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া, তিনি ট্রাম্পের একজন আইনজীবীও। কিন্তু কী ঘটছে তার বাস্তবতা বুঝতে বিভ্রান্ত কারাবন্দীদের অনেকটা সময় লেগে যায়।
এদিকে, রাজধানী মিনস্কে বেলারুশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিরল বৈঠকের পর মধ্যাহ্নভোজে বেলারুশের প্রেসিডেন্ট লুকাশেঙ্কোর অতিরিক্ত ভদকা পান করার ঘটনা বিরোধী এই নেতাদের মুক্তিতে সহায়তা করেছে বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জন কোল।
রবিবার (২০ জুলাই) পলিটিকো-তে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে কোল জানান, গত মাসে মিনস্কে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের এই আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কোর সঙ্গে ভদকা পানের মাধ্যমে সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। আর এই ‘অসাধারণ কূটনৈতিক পন্থা’ অবলম্বনের ফলেই ১৪ জন বিরোধী নেতার মুক্তি সম্ভব হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
গত মঙ্গলবার রাশিয়া টুডে (আরটি) জানায়, জন কোলের এই অপ্রচলিত কূটনীতির ফলেই বেলারুশ সরকার বিরোধী নেতাদের মুক্তি দেয়। মুক্তি পাওয়া নেতাদের মধ্যে ছিলেন সের্গেই তিখানোভস্কির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিরোধী নেতা। মুক্তি পাওয়ার পরপরই তিনি অবশ্য লিথুয়ানিয়ায় চলে গেছেন।
এদিকে,এই বিষয়ে বেলারুশের কর্মকর্তারা জানান, ট্রাম্পের ব্যক্তিগত অনুরোধে এবং পরিবারের কথা ভেবে মানবিক বিবেচনায় ওই বন্দীদের ক্ষমা করেছেন প্রেসিডেন্ট লুকাশেঙ্কো। আলোচনায় শুধু মুক্তি নয়, যুক্তরাষ্ট্র-বেলারুশ সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
আলোচিত মধ্যাহ্নভোজ সম্পর্কে জানা গেছে, এটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল বন্ধ কক্ষে। তবে বেলারুশের রাষ্ট্রীয় মিডিয়ায় প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায় প্রেসিডেন্ট লুকাশেঙ্কো মার্কিন প্রতিনিধিদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন, কেলগকে জড়িয়ে ধরছেন এবং অন্যদের কাঁধে হাত রাখছেন।
পলিটিকো জানায়, ট্রাম্প প্রশাসনের বিশেষ দূতেরা অনেক সময়ই বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্র দপ্তরের ঐতিহ্যবাহী প্রটোকল এড়িয়ে অপ্রচলিতভাবে সরাসরি কূটনীতি চালিয়ে থাকেন। তবে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র বেলারুশের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ ওই বৈঠক এমন এক সময়ে হয়েছে, যখন ট্রাম্প প্রশাসন মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের চেষ্টা করছে এবং ইউক্রেন যুদ্ধের শান্তিপূর্ণ সমাধান চাইছে।
বৈঠক প্রসঙ্গে বেলারুশের প্রেসিডেন্ট লুকাশেঙ্কো বলেন, ‘এটি কোনো ছাড় দেওয়ার ইঙ্গিত নয়। আমরা কারও কাছে মাথা নত করিনি। এটা ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধার আলোচনা।’
পলিটিকো ম্যাগাজিনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কোল জানান, দরজাটি খুলে দিয়ে তাদের বোঝানো হয়, 'তুমি স্বাধীন', এটি ছিল দুর্দান্ত একটি মুহূর্ত!
সুলতানা দিনা/