মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশের ক্রমবর্ধমান হুমকির কথা উল্লেখ করে রাশিয়া ঘোষণা করেছে, তারা আর মধ্যপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনে স্বেচ্ছায় আরোপিত নিষেধাজ্ঞা মেনে চলবে না।
গত সোমবার (৪ আগস্ট) এক বিবৃতিতে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে তারা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র ১৯৮৭ সালের Intermediate-Range Nuclear Forces (INF) Treaty থেকে সরে যাওয়ার পর রাশিয়া একতরফাভাবে এই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। ওই চুক্তিতে ভূমি থেকে নিক্ষেপযোগ্য ৫০০ থেকে ৫,৫০০ কিলোমিটার পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, “আমরা ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর প্রতি পাল্টা নিষেধাজ্ঞার আহ্বান জানিয়েছিলাম। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে অস্ত্র প্রতিযোগিতা ঠেকানো। কিন্তু কোনো ধরনের চুক্তি হয়নি।”
সোমবার মন্ত্রণালয় অভিযোগ করে, যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে INF-শ্রেণির ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা, উৎপাদন ও মোতায়েন করছে। ফলে রাশিয়ার স্ব-আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখার আর কোনো যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি নেই।
বিবৃতিতে বলা হয়, “রাশিয়ান ফেডারেশন আর স্ব-আরোপিত পূর্বের সীমাবদ্ধতাগুলো মানার বাধ্যবাধকতা অনুভব করছে না। পশ্চিমা দেশগুলোর অস্ত্র মোতায়েনের মাত্রার ওপর ভিত্তি করে আমরা উপযুক্ত জবাব দেব।”
রাশিয়ার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই রিয়াবকভ গত জুনেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, মস্কো এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে পারে। তিনি একে ‘যৌক্তিক পদক্ষেপ’ আখ্যা দিয়ে বলেন, পশ্চিমা দেশগুলোর ‘সংবেদনশীল ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি’র প্রেক্ষাপটে এটি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে।
পরে রুশ নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধান ও সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ বলেন, ন্যাটোর ‘রাশিয়া-বিরোধী নীতির’ সরাসরি ফলাফল হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম X-এ ইংরেজিতে লেখেন, “এটাই নতুন বাস্তবতা, যা আমাদের সব প্রতিপক্ষকে মাথায় রাখতে হবে। আরও পদক্ষেপ আসছে।”
মেদভেদেভ, যিনি ২০০৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ছিলেন, সম্প্রতি মার্কিন সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বাকযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। ট্রাম্প গত সপ্তাহেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, মেদভেদেভের পারমাণবিক হুমকির জবাবে তিনি দুটি পারমাণবিক সাবমেরিন মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছেন।
পরদিন মঙ্গলবার (৫ আগস্ট) ক্রেমলিন জানায়, একতরফা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর রাশিয়ার ‘প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অধিকার রয়েছে’।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ সাংবাদিকদের বলেন, “এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আশা করা উচিত নয়, কারণ বিষয়টি প্রতিরক্ষা খাত সংশ্লিষ্ট–যা অত্যন্ত সংবেদনশীল ও অপ্রকাশ্য।”
রাশিয়ার ভাষ্যমতে, তারা ইউরোপ ও এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভূমি থেকে নিক্ষেপযোগ্য মাঝারি ও স্বল্প-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন না করার যে স্বেচ্ছানির্ধারিত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একই ধরনের পদক্ষেপের প্রত্যাশায়। তবে ওয়াশিংটন ও তার মিত্ররা সেই আহ্বানে সাড়া না দিয়ে বরং নতুন করে এসব অস্ত্রের পরীক্ষা, উৎপাদন ও মোতায়েন শুরু করেছে।
রাশিয়ার অভিযোগ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র INF শ্রেণিভুক্ত ক্ষেপণাস্ত্র ও লঞ্চার ইউরোপ এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে মোতায়েন করছে। ২০২৪ সালে ফিলিপাইনে Typhon ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা মোতায়েন করা হয় এবং অস্ট্রেলিয়ায় যৌথ সামরিক মহড়ায় সেটির ব্যবহার হয়। এছাড়া Dark Eagle হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রথমবারের মতো বিদেশে মোতায়েন করা হয়েছে। HIMARS ও MLRS সিস্টেমগুলো বর্তমানে INF শ্রেণির অস্ত্র বহনে সক্ষম, এবং ভবিষ্যতে এর উন্নত সংস্করণ ১,০০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরত্বে আঘাত হানতে পারবে।
রাশিয়া বলছে, এই ধরনের পদক্ষেপ সরাসরি তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ এবং বৈশ্বিক অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে আরও উসকে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে রাশিয়া আর INF চুক্তির কোনো বাধ্যবাধকতা মানবে না এবং প্রয়োজন হলে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে তাদের আর কোনো নীতিগত বা কূটনৈতিক প্রতিবন্ধকতা থাকবে না। সূত্র: দ্য মস্কো টাইমস
মাহফুজ/