পূর্ব আফগানিস্তানের দুর্গম কুনার অঞ্চলে গত রবিবার আঘাত হানা ৬ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ৪১১ ছাড়িয়ে যাওয়ার পর উদ্ধারকারীরা দুর্গত এলাকায় পৌঁছানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। এ ঘটনায় আরও ৩ হাজার ১২৪ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন তালেবান সরকারের মুখপাত্র জবিউল্লাহ মুজাহিদ।
তবে মৃতের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে উদ্ধারকর্মীরা কারণ ভূমিকম্পে চাপা পড়া অনেক এলাকায় পৌঁছানো সম্ভব হয় নি।
মঙ্গলবার এক্স-এ দেওয়া পোস্টে মুজাহিদ জানান, ভূমিকম্পের তীব্রতায় অন্তত ৫ হাজার ৪১২টি বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছে।
কুনারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রধান ইহসানউল্লাহ ইহসান জানান, উদ্ধারকাজ এখন পাহাড়ি অঞ্চলের আরও গভীর এলাকায় সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “ঠিক কত মরদেহ ধ্বংসস্তূপের নিচে রয়ে গেছে তা সঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না। আমাদের লক্ষ্য যত দ্রুত সম্ভব উদ্ধারকাজ শেষ করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে ত্রাণ বিতরণ শুরু করা।”
ইহসান আরও জানান, আহতদের মধ্যে অনেককে নানগরহার প্রদেশের হাসপাতাল ও রাজধানী কাবুলে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে, উদ্ধার কার্যক্রম চলমান অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, আজ মঙ্গলবার উত্তর-পূর্ব আফগানিস্তানে আবারও ৫.২ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। এর কেন্দ্রস্থল ছিল ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ১০ কিলোমিটার গভীরে।
রবিবার মধ্যরাতের কিছু আগে যে ভূমিকম্প আঘাত হানে সেটি ছিল ৬.০ মাত্রার, কেন্দ্রস্থল ছিল মাত্র ৮ কিলোমিটার গভীরে। এটিই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভূমিকম্পপ্রবণ এ দেশে সবচেয়ে প্রাণঘাতী ভূমিকম্পগুলোর একটি।
পাহাড়ি দুর্গম অঞ্চল হওয়ায় উদ্ধারকাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। পাকিস্তান সীমান্তবর্তী অনেক গ্রামীণ এলাকায় কাদামাটির ঘরবাড়ি ধসে পড়লেও স্বেচ্ছাসেবীরা পৌঁছাতে পারছেন না।
ইহসান জানান, সরু পাহাড়ি সড়কগুলো যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে, কোথাও ধসে গেছে আবার কোথাও ভূমিধসে ঢেকে গেছে।
কেউ নেই টেনে বের করার
স্থানীয় গ্রামবাসীরাও উদ্ধারকাজে যোগ দিয়েছেন।
২৬ বছর বয়সী ওবায়দুল্লাহ স্টোমান কুনারের নুগরাল জেলার ওয়াদির গ্রামে বন্ধুর খোঁজে গি বার্তা সংস্থা এএফপি’কে বলেন, “শুধু ধ্বংসস্তূপ পড়ে আছে। আমি খুঁজছি, কিন্তু তাকে পাইনি। এ অবস্থা দেখা আমার জন্য অত্যন্ত কষ্টকর।”
আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১৪ বছর বয়সী আখলাক ভূমিকম্পে তার পাঁচজন পরিবার সদস্যকে হারিয়েছে।
সে বলে, “আমাদের পুরো ঘর ভেঙে পড়েছিল। আমার ভাই ও বাবারা সবাই চাপা পড়েছিলেন। শুধু আমি জীবিত বের হতে পেরেছি। পরে বাবার আওয়াজ শুনে তাকে উদ্ধার করি। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও মানুষ বেঁচে আছে, কিন্তু তাদের টেনে বের করার মতো কেউ নেই।”
উদ্ধার করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়কারী ইন্দ্রিকা রাটওয়াটে কাবুলে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সড়ক যোগাযোগ ভেঙে পড়ায় উদ্ধারকারীদের হেলিকপ্টারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, “ভূমিকম্পের প্রথম ২৪ ঘণ্টায় প্রচুর ভূমিধস ও পাথরধস হয়েছে। এতে প্রবেশাধিকার প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।”
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, সড়ক ধ্বংস হওয়া এবং দুর্গত গ্রামগুলোর অবস্থান দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় হওয়ায় ত্রাণ পৌঁছানো মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সংস্থাটি আরও জানায়, ভূমিকম্পের আগেই আফগানিস্তানের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল, ফলে স্থানীয় সক্ষমতা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে এবং এখন বাইরের সহায়তার ওপর শতভাগ নির্ভরশীল।
আন্তর্জাতিক রেডক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির আফগানিস্তান শাখার ভারপ্রাপ্ত উপপ্রধান হোমা নাদার আল-জাজিরাকে বলেন, সড়ক ধ্বংসের কারণে উদ্ধার অভিযান চালানো “প্রায় অসম্ভব” হয়ে গেছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, “সবচেয়ে দুর্গম গ্রামগুলোতে পৌঁছানো না যাওয়ায় নিহতের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বাড়তে পারে।”
আন্তর্জাতিক সহায়তা
যুক্তরাজ্য ১০ লাখ পাউন্ড (প্রায় ১.৩৫ মিলিয়ন ডলার) বরাদ্দ দিয়েছে জাতিসংঘ ও রেডক্রসের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা ও জরুরি ত্রাণসামগ্রী সরবরাহে সহায়তা করতে।
ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি বলেন, “এই জরুরি তহবিল আমাদের অংশীদারদের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা ও জরুরি সরঞ্জাম পৌঁছাতে সাহায্য করবে।”
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর জানান, ভারত ইতিমধ্যে কাবুলে এক হাজার পরিবারকে থাকার তাঁবু পাঠিয়েছে এবং কুনারে ১৫ টন খাদ্যসামগ্রী পৌঁছানোর কাজ চলছে। আরও ত্রাণ সামগ্রী আজ মঙ্গলবারই পাঠানোর কথা রয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নও ১৩০ টন জরুরি ত্রাণসামগ্রী পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে এবং সহায়তার জন্য ১০ লাখ ইউরো (প্রায় ১.১৬ মিলিয়ন ডলার) বরাদ্দ করেছে।
ভূতাত্ত্বিক অবস্থানের কারণে ভারতীয় ও ইউরেশীয় প্লেটের মিলনস্থলে অবস্থিত আফগানিস্তানে ভয়াবহ ভূমিকম্প বারবার আঘাত হানে।
গত বছরের অক্টোবরে পশ্চিম প্রদেশ হেরাতে আঘাত হানা সবচেয়ে প্রাণঘাতী ভূমিকম্পে ২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছিল। সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/