দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার ৮০ বছর পূর্তি উপলক্ষে চীন আগামীকাল বুধবার রাজধানী বেইজিংয়ে বিশাল সামরিক কুচকাওয়াজের আয়োজন করছে। ১৯৪৫ সালের আজকের এ দিনে ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘ যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।
দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এই কুচকাওয়াজে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বিশ্বনেতাদের স্বাগত জানাবেন, যাদের মধ্যে রয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন। এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে চীন তার সামরিক শক্তি ও ভবিষ্যতের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরবে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়ার তথ্য অনুযায়ী, অনুষ্ঠানটি আগামীকাল বুধবার সকাল ৯টায় (০১:০০ জিএমটি) শুরু হবে।
শেষবার চীন বিজয় দিবসের সামরিক কুচকাওয়াজ আয়োজন করেছিল ১০ বছর আগে। সেটিই ছিল প্রথমবারের মতো যুদ্ধের সমাপ্তি উপলক্ষে আয়োজিত বিশাল সামরিক কুচকাওয়াজ।
কুচকাওয়াজে প্রদর্শিত হবে চীনের সামরিক শক্তি। এতে থাকবে অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম, যেমন ড্রোন, হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও যুদ্ধবিমান।
চীনা সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, শত শত পিএলএ (পিপলস লিবারেশন আর্মি) বিমান প্রদর্শিত হবে কুচকাওয়াজে।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, ৮০ জন বাদক অংশ নেবেন, যা জাপানি সাম্রাজ্যের পতনের ৮০ বছর পূর্তির দিককে প্রতীকীভাবে তুলে ধরে। এক হাজারেরও বেশি সঙ্গীতশিল্পী থাকবেন ১৪ সারিতে। প্রতিটি সারি চীনের প্রতিরোধযুদ্ধের একটি বছরকে প্রতিফলিত করবে। কারণ ১৯৩১ সালে জাপান চীনের মানচুরিয়া আক্রমণ থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত মোট ১৪ বছর জাপানিজ আক্রমণ ও দখলদারের শিকার ছিল, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজয় ও আত্মসমর্পনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়।
রাজধানী বেইজিংয়ের তিয়েন আনমেন স্কোয়ারে দর্শকদের বসার চেয়ারগুলো সাজানো থাকবে সবুজ, লাল ও সোনালি রঙে, যা যথাক্রমে দেশটির উর্বর ভূমি, জনগণের আত্মত্যাগ এবং শান্তিকে প্রতীকীভাবে উপস্থাপন করবে।
“বিজয় দিবস” কুচকাওয়াজে অংশ নেবে ৪৫টি সেনা কন্টিনজেন্ট এবং এটি প্রায় ৭০ মিনিট স্থায়ী হবে। প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংও এ উপলক্ষে ভাষণ দেবেন।
আগস্ট থেকেই বেইজিংয়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে, কুচকাওয়াজের মহড়া শুরুর পর থেকে।
কারা থাকছেন?
চীনের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী হং লেই জানিয়েছেন, কুচকাওয়াজে যোগ দেবেন ২৬ দেশের নেতা।
পুতিন ইতোমধ্যেই চীনে রয়েছেন। তিনি রবিবার ও সোমবার তিয়ানজিনে অনুষ্ঠিত সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন।
এসসিও সম্মেলন বা সংশ্লিষ্ট বৈঠকে অংশ নিতে এসে যেসব নেতা কুচকাওয়াজেও থাকবেন, তারা হলেন-মায়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইং, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, মঙ্গোলিয়ার প্রেসিডেন্ট উখনা খুরেলসুখ, উজবেকিস্তানের প্রেসিডেন্ট শভকাত মিরজিয়োয়েভ এবং বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো।
তাদের সঙ্গে যোগ দিচ্ছেন আরও অনেকে।
উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় পত্রিকা রোদং সিনমুন জানিয়েছে, কিম জং উন মঙ্গলবার সকালে আর্মার্ড ট্রেনে চড়ে চীন-উত্তর কোরিয়া সীমান্ত অতিক্রম করে বেইজিং পৌঁছেছেন।
চীনের সামরিক কুচকাওয়াজে উত্তর কোরিয়ার কোনো নেতার যোগ দেওয়ার ঘটনা ৬৬ বছর পর ঘটছে। সর্বশেষ কিম ইল সুং যিনি কিম জং উনের দাদা এবং উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা- ১৯৫৯ সালে এ ধরনের কুচকাওয়াজে যোগ দিয়েছিলেন।
আরও পড়ুন: চীনে পৌঁছেছেন কিম জং-উন
ইউরোপ থেকে মাত্র দুই নেতা অংশ নিচ্ছেন—স্লোভাকিয়ার প্রধানমন্ত্রী রবার্ট ফিকো এবং সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার ভুচিচ।
যদিও স্লোভাকিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর সদস্য, ফিকো রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পক্ষে এবং তিনি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে পুতিনের সঙ্গে আলোচনার জন্য মস্কো সফর করেছিলেন। ভুচিচও রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করেছেন এবং সম্প্রতি মস্কো সফর করেছেন।
কেন চীন বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজ আয়োজন করে?
পশ্চিমা বিশ্ব সাধারণত ১৯৩৯ সালে জার্মানির পোল্যান্ড আক্রমণ এবং ব্রিটেন ও ফ্রান্সের জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর মুহূর্ত হিসেবে ধরে।
কিন্তু এশিয়ায় কয়েক বছর আগেই জাপানি আগ্রাসন শুরু হয়েছিল।
১৯৩১ সালে মানচুরিয়া আক্রমণের পর জাপান ও চীনের সেনারা একাধিক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। তখন চীনের কুওমিনতাং (কেএমটি) ও কমিউনিস্ট পার্টি (সিসিপি) নিজেদের মধ্যে গৃহযুদ্ধে ব্যস্ত ছিল, আর জাপান তা কাজে লাগিয়ে ব্যাপক অগ্রগতি করে।
১৯৩৭ সালের জুলাইয়ে বেইজিংয়ের বাইরে চীন-জাপান সেনারা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। কয়েক দিনের মধ্যে এটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেয়। এরপর কেএমটি ও সিসিপি জাপানের বিরুদ্ধে যৌথভাবে লড়াইয়ের জন্য একজোট হয়।
জাপানি সেনারা নানজিংসহ পূর্বাঞ্চলের শহরগুলো দখল করে, হাজার হাজার বেসামরিক মানুষকে হত্যা করে, গ্রাম জ্বালিয়ে দেয় এবং নারীদের উপর ব্যাপক সহিংসতা চালায়। অনুমান করা হয়, যুদ্ধ চলাকালে ২ কোটি চীনা নিহত হয়েছিলেন, যাদের বেশিরভাগই ছিলেন বেসামরিক।
১৯৪১ সালে যুক্তরাষ্ট্র তেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে জাপান ক্ষুব্ধ হয়ে ডিসেম্বর মাসে হাওয়াইয়ের পার্ল হারবারে মার্কিন প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবহরে আকস্মিক হামলা চালায়। এতে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।
১৯৪০-এর দশকে জাপান আধুনিক ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার ও ভারতের কিছু অংশও দখল করে নেয়।
১৯৪৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করে। এরপর সোভিয়েত ইউনিয়নও জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।
অবশেষে ২ সেপ্টেম্বর জাপান আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে।
এরপর কেএমটি ও সিসিপি আবার গৃহযুদ্ধ শুরু করে, যা ১৯৪৯ সালে মাও সেতুংয়ের নেতৃত্বে কমিউনিস্টদের বিজয়ের মাধ্যমে শেষ হয়। চিয়াং কাই-শেক ও কেএমটির অবশিষ্ট বাহিনী তাইওয়ানে পালিয়ে গিয়ে আলাদা সরকার গঠন করে।
২০১৪ সালে চীন ৩ সেপ্টেম্বরকে বিজয় দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।
২০১৫ সালে সিসিপি প্রথমবার কেএমটি সৈন্যদের অবদান স্বীকার করে এবং তাদের যুদ্ধ-প্রবীণদের কুচকাওয়াজে আমন্ত্রণ জানায়। তখন তাইওয়ানে কেএমটি ক্ষমতায় ছিল, যারা ঐতিহাসিক বিরোধ থাকা সত্ত্বেও মূল ভূখণ্ড চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পক্ষে।
কিন্তু ২০১৬ সাল থেকে তাইওয়ান শাসন করছে ডেমোক্র্যাটিক প্রগ্রেসিভ পার্টি (ডিপিপি), যারা দ্বীপটির সার্বভৌমত্বের ব্যাপারে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। তাইওয়ানকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে একীভূত করতে চাওয়া চীন ডিপিপির সমালোচক।
এই প্রেক্ষাপটে বুধবারের কুচকাওয়াজে বিশেষভাবে তুলে ধরা হবে জাপানের বিরুদ্ধে বিজয়ে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা। সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/