আজ শুক্রবার ভারত তাদের সর্বশেষ সোভিয়েত-যুগের মিগ-২১ যুদ্ধবিমান বহরকে অবসর দিয়েছে। এর মাধ্যমে এই কিংবদন্তি ও ওই সময়ের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতায় পরিপূর্ণ এ বিমানটির ছয় দশকেরও বেশি সময়ের পরিষেবার সমাপ্তি ঘটল। এই বিমানটি একসময় তার যুদ্ধের দক্ষতার জন্য প্রশংসিত হলেও ঘন ঘন দুর্ঘটনার কারণে পরে ‘‘উড়ন্ত কফিন’’ নামে পরিচিত হয়েছিল।
এই অবসরের ঘটনাটি ভারতীয় বিমান বাহিনীর জন্য তাদের বিমান বহর সম্প্রসারণ এবং আধুনিকীকরণের প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরছে। কারণ, তাদের প্রধান দুই প্রতিপক্ষ চীন ও পাকিস্তানের কাছ থেকে দুই প্রান্তে সম্ভাব্য হুমকির মোকাবিলা করতে হবে।
এই বিমান অবসরের ফলে ভারতীয় বিমান বাহিনীর হাতে এখন ২৯টি ফাইটার স্কোয়াড্রন রইল, যা একসময় সরকার কর্তৃক অনুমোদিত ৪২টির লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম। প্রতিটি স্কোয়াড্রনে ১৬-১৮টি যুদ্ধবিমান থাকে।
নয়াদিল্লি-ভিত্তিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক এন.সি. বিপীন্দ্র বলেন, ‘‘যদি ভারতের যুদ্ধবিমান বহরে এই পতন দ্রুত ঠেকানো না যায়, তবে আধুনিক দিনের যুদ্ধে উন্নত যুদ্ধবিমানধারী প্রতিবেশী শত্রুদের মোকাবিলা করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠবে।’’
আরও পড়ুন: যৌথভাবে সু-৫৭ যুদ্ধবিমান উৎপাদনে ভারতকে রাশিয়ার প্রস্তাব
আরও পড়ুন: ১১৪টি ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ রাফাল যুদ্ধবিমান কেনার প্রস্তাব ভারতের বিমান বাহিনীর
সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভারত তাদের কমে যাওয়া শক্তি বাড়ানোর জন্য স্বদেশি তেজাস হালকা-যুদ্ধবিমান-এর প্রবর্তনকে দ্রুত করার এবং সম্ভবত বিদেশে তৈরি যুদ্ধবিমান কেনার উপর নির্ভর করছে, যা মূলত দেশেই তৈরি করা হবে।
ভারত বর্তমানে ফরাসি-নির্মিত রাফাল, মিরাজ ২০০০, রাশিয়ার সুখোই-৩০, মিগ-২৯ এবং তেজাস-সহ অন্যান্য বিমান পরিচালনা করে।
১৯৬০-এর দশকে অন্তর্ভুক্ত হওয়া এই সুঁচালো-নাকযুক্ত মিগ-২১ ভারতীয় বিমান বাহিনীর মেরুদণ্ড তৈরি করেছিল এবং পাকিস্তান ও চীনের সাথে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। কিন্তু এই সুপারসনিক যুদ্ধবিমানটির ঘন ঘন দুর্ঘটনা নিরাপত্তার উদ্বেগ বাড়িয়ে তোলে। একাধিকবার আধুনিকায়ন করা সত্ত্বেও বিমানটির প্রযুক্তি পুরোনো এবং রক্ষণাবেক্ষণ করা কঠিন রয়ে গিয়েছিল।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভারত ১৯৬৬ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে বিভিন্ন মডেলের মোট ৮৭২টি মিগ বিমান সংগ্রহ করে, যা এটিকে বিশ্বের এই বিমানটির সবচেয়ে বড় ব্যবহারকারী করে তুলেছিল।
১৯৭১ থেকে ২০১২ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত, মোট ৪৮২টি মিগ দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়, যাতে ১৭১ জন পাইলট, ৩৯ জন বেসামরিক নাগরিক, ৮ জন কর্মরত কর্মী এবং ১ জন এয়ারক্রু নিহত হন। এর কারণ হিসেবে মানুষের ভুল ও প্রযুক্তিগত ত্রুটিকে দায়ী করা হয়েছিল। এরপর থেকে দুর্ঘটনার তথ্য আর হালনাগাদ করা হয়নি।
এই দুর্ঘটনাগুলোর কারণে যুদ্ধবিমানগুলো ‘‘উড়ন্ত কফিন’’ নামে এক ভয়াবহ ডাকনাম অর্জন করে এবং ২০০৬ সালে একজন তরুণ মিগ-২১ পাইলটের মৃত্যুর উপর ভিত্তি করে একটি ব্লকবাস্টার বলিউড সিনেমা ‘‘রং দে বাসন্তী’’ তৈরি হয়।
শুক্রবার উত্তর ভারতের চণ্ডীগড় বিমান ঘাঁটিতে বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার মার্শাল এপি সিং-এর নেতৃত্বে শেষ উড়ানের মাধ্যমে এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং-এর উপস্থিতিতে যুদ্ধবিমানটিকে একটি রঙিন বিদায় জানানো হয়। অবতরণের পর বিমানটিকে জল কামানের স্যালুট দেওয়া হয়।
বিমান বাহিনীর গ্রুপ ক্যাপ্টেন ইন্দ্রনীল নন্দী বলেন, ‘‘মিগ-২১ এমন একটি বিমান যা ভারতীয় যুদ্ধবিমানের একাধিক প্রজন্মকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। এটি উড়ানো আনন্দের ছিল। এটিই আমাকে আজকের ফাইটার পাইলট বানিয়েছে।’’
মিগ-২১ একসময় সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হওয়া যুদ্ধবিমান ছিল, তবে বর্তমানে কিউবা, ইয়েমেন, সিরিয়া, উত্তর কোরিয়া এবং কিছু আফ্রিকান দেশ সহ মাত্র কয়েকটি দেশ এর হালনাগাদকৃত সংস্করণ সীমিত সংখ্যায় উড়ছে।
তাদের কমে যাওয়া যুদ্ধবিমানের শক্তি বাড়াতে ও এই মিগ ২১ এর স্থান পূর্ণ করতে বিমান বাহিনী রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড (HAL)-এর কাছ থেকে ৮৭টি তেোস কেনার চুক্তি করেছে। গত বছর এই বিমানগুলোর সরবরাহ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ইঞ্জিন আমদানিতে ঘাটতির কারণে তা বিলম্বিত হয়েছে। ইঞ্জিনগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করতে হয়।
বৃহস্পতিবার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বিমান বাহিনীর জন্য অতিরিক্ত ৯৭টি তেজাস সংগ্রহের জন্য হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড-এর সাথে আরও একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এইগুলোর সরবরাহ ২০২৭ সালে শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিমান বাহিনী একটি প্রাথমিক পর্যায়ে রাফাল যুদ্ধবিমান সংগ্রহের একটি প্রস্তাবও বিবেচনা করছে, যা ফরাসি সংস্থা দাসল্ট এভিয়েশন একটি ভারতীয় সংস্থার সাথে অংশীদারিত্বে দেশেই তৈরি করবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও ভারতে এফ-৩৫ স্টিলথ ফাইটার সরবরাহ করতে আগ্রহী, কিন্তু নয়াদিল্লি স্থানীয়ভাবে তৈরি বিমান সংগ্রহের উপর জোর দেওয়ায় এই বিষয়ে এখনও আগ্রহ দেখায়নি।
কিংবদন্তি মিগ-২১: গতির প্রতীক, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা
মিগ-২১ (MiG-21) যুদ্ধবিমানটি বিমান চালনার ইতিহাসে একটি কিংবদন্তি স্থান দখল করে আছে। স্নায়ুযুদ্ধের প্রতীক এই বিমানটি ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রথম ম্যাক ২ (শব্দের দ্বিগুণ গতি) গতিতে ওড়ার সক্ষমতা সম্পন্ন ফাইটার জেট। এটিকে কিংবদন্তি করে তোলার মূল কারণগুলি হল এর সরল ডিজাইন, কম উৎপাদন খরচ, রক্ষণাবেক্ষণের সুবিধা এবং এর ব্যাপক যুদ্ধকালীন সাফল্য ও অভিযোজন ক্ষমতা।
গতি, ছোট আকার ও কৌশলী ক্ষমতা এটিকে ভিয়েতনাম যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংঘাতগুলিতে পশ্চিমা উন্নত বিমানের বিরুদ্ধেও একটি মারাত্মক প্রতিপক্ষ হিসেবে প্রমাণ করেছে।
সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং লাইসেন্সপ্রাপ্ত দেশগুলিতে সব মিলিয়ে ১১ হাজার থেকে ১৩ হাজারেরও বেশি মিগ-২১ বিমান তৈরি করা হয়েছিল, যা এটিকে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত সুপারসনিক যুদ্ধবিমান-এর মর্যাদা দিয়েছে। প্রথম উড়ানের সাত দশক পরেও এটি বিশ্বজুড়ে ৬০টিরও বেশি দেশের বিমান বাহিনীতে ব্যবহৃত হয়েছে।
বর্তমানেও বিশ্বের ২০টিরও বেশি দেশ সীমিত সংখ্যায় এর আধুনিক সংস্করণ ব্যবহার করছে, যদিও ভারত সম্প্রতি এর শেষ বহরকে অবসর দিয়েছে। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ব্যবহৃত এফ-৭ বিজি বিমানগুলোও মিগ ২১ এর চাইনিজ ভ্যারিয়েন্ট।
এই বিমান ভিয়েতনাম যুদ্ধ, আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ (যেমন ইয়ম কিপুর যুদ্ধ) এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধসহ বহু যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৭১ সালের যুদ্ধে, ভারতীয় মিগ-২১ একটি পাকিস্তানি এফ-১০৪ স্টারফাইটারকে ভূপাতিত করে প্রথম সুপারসনিক জেট-অন-জেট কিল অর্জন করে।
তবে আধুনিক যুদ্ধবিমানের সঙ্গে বিমানটির প্রযুক্তিগত পার্থক্য হয়ে গেছে বিস্তর এবং আধুনিক যুদ্ধের ময়দানে বিমানটি যে আর কার্যকর না তা ২০১৯ সালে প্রমাণিত হয়। বালাকোটে ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষে একটি ভারতীয় মিগ ২১ বাইসন পাকিস্তানি বিমান বাহিনী কর্তৃক ভূপাতিত করা হয়। আটক হন পাইলট উইং কমান্ডার অভিনন্দন বর্তমান।
যদিও এটির উচ্চ দুর্ঘটনার হার উড়ন্ত কফিন নামে একটি কুখ্যাতি এনেছিল, তবে এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম উচ্চ গতির ও আধুনিক বিমানের পাইলটদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে এবং বৈশ্বিক বিমান শক্তিতে এক অমোঘ ছাপ রেখে গেছে। সূত্র: এপি
মাহফুজ/