গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখার জন্য ইসরায়েলে সর্বোচ্চ ২০০ সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মধ্যপ্রাচ্যে আগে থেকেই অবস্থানরত এই সেনারা একটি বহুজাতিক টাস্কফোর্সের অংশ হিসেবে কাজ করবেন।
হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা বলছেন, গাজায় যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণের জন্য ইসরায়েলে একটি বেসামরিক-সামরিক সমন্বয় কেন্দ্র গঠন করা হবে। এতে মিসর, কাতার, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সেনারা যোগ দিতে পারেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রবিবার (১২ অক্টোবর) মধ্যপ্রাচ্য সফরে যাচ্ছেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেন, কোনো মার্কিন সেনা গাজায় প্রবেশ করবে না। যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা হবে একটি যৌথ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র তৈরি করা, যা বহুজাতিক বাহিনীর কার্যক্রমকে একীভূত করবে।
খবরে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি সরকার ইতোমধ্যে হামাসের সঙ্গে গাজা যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ অনুমোদন করেছে, যার ফলে বন্দিবিনিময় ও অস্ত্রবিরতি শুরু হয়েছে।
সংবাদদাতারা জানান, টাস্কফোর্সের নেতৃত্বে থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। তারা যুদ্ধবিরতির অগ্রগতি তদারকি করবে এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রম সমন্বয় করবে। এক কর্মকর্তা জানান, মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি ও যুদ্ধবিরতির সম্ভাব্য লঙ্ঘন সম্পর্কে ইসরায়েল ও হামাসকে যথাক্রমে মিসর ও কাতারের মাধ্যমে অবহিত করা হবে।
সেন্টকমের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার এই টাস্কফোর্সের নেতৃত্ব দেবেন। তিনি চলতি সপ্তাহে মিসরে অনুষ্ঠিত পরোক্ষ শান্তি আলোচনায় অংশ নেন বলে জানা গেছে। সেই আলোচনার ফলেই গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ইসরায়েল ও হামাস তার গাজা শান্তি পরিকল্পনার প্রথম ধাপে সম্মতি দিয়েছে।
ট্রাম্পের ২০ দফা গাজা পরিকল্পনার একটি মূল বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্র ও আরব-মিত্রদের সঙ্গে মিলে একটি সাময়িক আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী গঠন, যা গাজায় মোতায়েন হবে। তবে এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হবে বন্দি ও বন্দি মুক্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েল আক্রমণে প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। এর জবাবে ইসরায়েলের ব্যাপক সামরিক অভিযান চালায় গাজায়। অভিযানে এ পর্যন্ত ৬৭ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে ২০ হাজারেরও বেশি শিশু রয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আজ (রবিবার) মধ্যপ্রাচ্য সফরে যাচ্ছেন। ধারণা করা হচ্ছে, গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে মধ্যস্থতার মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে ওই অঞ্চলে শান্তির প্রতিনিধি হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা চালাবেন।
খবরে বলা হয়েছে, চলতি বছর নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার ব্যাপারে বিভিন্ন সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যেই তার আকাঙ্ক্ষার কথা জানিয়েছিলেন। তবে নোবেল শান্তি পুরস্কার কমিটি গত শুক্রবার ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় ডানপন্থি নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে পুরস্কারটি দিয়েছে।
অবশ্য হোয়াইট হাউস বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি। নরওয়ের নোবেল কমিটির বিরুদ্ধে হোয়াইট হাউস অভিযোগ করেছে যে, ‘তারা শান্তির চেয়ে রাজনীতিকে অগ্রাধিকার’ দিয়েছে।
সংবাদদাতারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য সফরে ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বাগতিক দেশগুলোর কাছ থেকে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার ব্যাপারে প্রশংসা পেতে পারেন। গাজায় যুদ্ধ থামানো ও ওই অঞ্চল থেকে ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্ত করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকার জন্য তাকে কৃতিত্ব দেওয়া হতে পারে।
হোয়াইট হাউস গত শুক্রবার জানিয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প রবিবার রাতে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে যাত্রা করবেন। প্রথমে তিনি ইসরায়েলে যাবেন। সেখানে সোমবার তিনি ভাষণ দেবেন। এরপর গাজা চুক্তির আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে মিসরে যাবেন তিনি। যুদ্ধবিরতির আলোচনায় ভূমিকা রাখার কারণে ইসরায়েল ও হামাস ইতোমধ্যে ট্রাম্পের প্রশংসা করেছে।
গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্ভব করার ক্ষেত্রে ট্রাম্প বেশির ভাগ কৃতিত্ব দাবি করলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজায় দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা ইসরায়েলি যুদ্ধে বিরতি টানার ক্ষেত্রে আরও কিছু কারণ আছে। গাজায় ইসরায়েলের দুই বছর ধরে চালানো নৃশংসতাকে জাতিসংঘের তদন্তকারীরা জাতিগত নিধন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ওয়াশিংটন ডিসির আরব সেন্টারের ফিলিস্তিন-ইসরায়েলবিষয়ক কর্মসূচির প্রধান ইউসুফ মুনায়ের বলেছেন, ‘গাজার ৮০ শতাংশের বেশি ভবন ধ্বংস করার পরও জিম্মিদের মুক্ত করতে ব্যর্থ হওয়ায় ইসরায়েল এই অভিযান থেকে কমই ফল পাচ্ছে।’
মুনায়ের আল-জাজিরাকে বলেন, ‘এই পথে এগিয়ে চলার কারণে ইসরায়েল ক্রমাগত একঘরে হয়ে পড়ছে এবং তাদের মূল্য চোকাতে হচ্ছে। এ ছাড়া আমি মনে করি, সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কারণও প্রভাব ফেলেছে।’ সূত্র: বিবিসি, আল-জাজিরা।