পারমাণবিক শক্তিচালিত সুপার টর্পেডো ‘পসাইডনের’ সফল পরীক্ষা চালিয়েছে রাশিয়া। ২০১৮ সালে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ‘অজেয়’ অস্ত্রের তালিকায় পসাইডন ও বুরেভেস্তনিকের নাম ঘোষণা করেছিলেন। প্রায় সাত বছর পর, আবারও এই অস্ত্র নিয়ে নতুন করে আলোচনায় আসলেন তিনি।
বুধবার (২৯ অক্টোবর) ইউক্রেন যুদ্ধে আহত রুশ সৈন্যদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে ছিলেন পুতিন জানান, রাশিয়া সফলভাবে ‘পসাইডন’ নামের একটি পারমাণবিক শক্তিচালিত সুপার টর্পেডোর পরীক্ষা চালিয়েছে।
পুতিন বলেন, ‘এটির মতো অস্ত্র বিশ্বের আর কোথাও নেই।’
প্রাচীন গ্রিক পুরাণের সমুদ্রদেবতা পসাইডনের নামে নামকরণ করা এই টর্পেডো সম্পর্কে খুব বেশি বিস্তারিত তথ্য জানা যায়নি। তবে এটি মূলত একটি পারমাণবিক ক্ষমতাসম্পন্ন টর্পেডো এবং ড্রোনের সমন্বয়ে তৈরী এক ধরণের আর্মাগেডন অস্ত্র।
সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অস্ত্র বিশাল তেজস্ক্রিয় সমুদ্রঢেউ তৈরি করে উপকূলীয় অঞ্চলকে ধ্বংস করতে সক্ষম।
রাশিয়া-বিশেষজ্ঞ মার্ক গ্যালিওটি জানান, এসব মূলত পৃথিবী ধ্বংসকারী ‘আর্মাগেডন অস্ত্র’। হিব্রু শব্দ ‘আর্মাগেডন’-এর অর্থ ‘পৃথিবীর শেষ সময়ে একটি ভয়ংকর যুদ্ধ’। অর্থাৎ ‘আর্মাগেডন অস্ত্র’ বলতে সেই অস্ত্রগুলোকে বোঝায়, যা ব্যবহার করলে পুরো পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
রুশ পার্লামেন্টের এক জ্যেষ্ঠ সদস্য দাবি করেছেন, ‘পুরো একটি রাষ্ট্রকে অচল করে দিতে সক্ষম এই অস্ত্র।’
২০১৮ সালে প্রথমবার এই অস্ত্রের কথা প্রকাশ্যে আসে। সে সময় রুশ গণমাধ্যমের দাবি ছিল, পসাইডন প্রতি ঘণ্টায় ২০০ কিলোমিটার গতিতে চলতে পারে এবং এটি এমনভাবে রুট পরিবর্তন করতে পারে যে তাকে আটকানো ‘অসম্ভব’।
এর আগে গত ২১ অক্টোবর ‘বুরেভেস্তনিক’ নামের নতুন এক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালায় রাশিয়া। সেসময় দাবি করা হয়, এটি বিশ্বের যেকোনো প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করতে সক্ষম। রাশিয়ার বর্ণনা অনুযায়ী, ৯এম-৭৩০ বুরেভেস্তনিক (ন্যাটো নাম এসএসসি-এক্স-৯ স্কাইফল) হলো এমন একটি ক্ষেপণাস্ত্র, যাকে বর্তমান কিংবা ভবিষ্যতের কোনো প্রতিরক্ষাব্যবস্থাই আটকাতে পারবে না। পুতিনের ভাষায়, ‘এটি এক অনন্য অস্ত্র, যা আর কোনো দেশের কাছে নেই।’
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রকৃতপক্ষে এসব অস্ত্রের সামরিক মূল্য নিয়ে প্রশ্ন আছে।
গ্যালিওটি জানান, পসাইডন ও বুরেভেস্তনিক দুটি এই ধরনের অস্ত্র। সেই সঙ্গে এগুলো ‘সেকেন্ড-স্ট্রাইক’ অস্ত্র, যা শুধু প্রতিশোধমূলক ব্যবহারের জন্য তৈরি।
তবে এই অস্ত্রগুলো আদৌ কার্যকর কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। ২০১৯ সালে একটি রকেট ইঞ্জিন বিস্ফোরণে পাঁচজন রুশ পারমাণবিক প্রকৌশলী নিহত হয়েছিলেন। ধারণা করা হয়, এই রকেট ইঞ্জিন বুরেভেস্তনিকের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।
লন্ডনভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (আইআইএসএস) তথ্যমতে, এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের পারমাণবিক প্রোপালশন ইউনিটের কর্মক্ষমতা নিয়ে নানান ধরনের ‘প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ’ রয়েছে। আইআইএসএসের তথ্যমতে, এই জায়গায় রাশিয়ার এখনো ‘অনেক ঘাটতি’।
এদিকে আরেকদল বিশ্লেষক বলছেন, এই পরিস্থিতিতে পুতিন হয়তো ট্রাম্পের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যই নতুন অস্ত্র পরীক্ষার ঘোষণা দিয়েছেন। রাশিয়া-বিশেষজ্ঞ মার্ক গ্যালিওটি বলেন, ‘মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কখনো ইউক্রেনের প্রতি সহানুভূতিশীল, আবার কখনো রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ছেন। এরকম প্রেক্ষাপটে পুতিনের কাছে এই অস্ত্রগুলো দেখানো হলো শক্তির প্রদর্শন।’
অন্যদিকে, এ বছর রাশিয়ার একের পর এক অত্যাধ্যুনিক মারণাস্ত্র পরীক্ষা করার পর প্রকাশ্যে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রায় ৩৩ বছর পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেনাবাহিনীকে আবার পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘যেহেতু অন্যরাও (রাশিয়াকে ইঙ্গিত করে) পরীক্ষা চালাচ্ছে, তাই আমাদেরও করা উচিত।’
যদিও ট্রাম্প কী ধরনের অস্ত্র পরীক্ষার কথা বলেছেন, সে বিষয়েও নির্দিষ্টকরে বিস্তারিত জানাননি। তাছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের পরীক্ষা শুরু করতে অন্তত কয়েক মাস সময় লাগবে।
সুলতানা দিনা/