যুক্তরাষ্ট্রের কড়া নিষেধাজ্ঞা ও চাপের মধ্যেও ভারতকে “নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ” করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকে তিনি এ ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে দুই নেতা প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নতুনভাবে গড়ে তোলার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছান।
দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে মোদিকে উদ্দেশ্য করে পুতিন বলেন, “রাশিয়া ভারতের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় তেল, গ্যাস, কয়লা—সবকিছুর নির্ভরযোগ্য জোগানদাতা। আমরা ভারতের দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতির জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখতে প্রস্তুত।”
প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতা পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, নয়াদিল্লির ‘আত্মনির্ভরতা’ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দুই দেশ যৌথভাবে উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির গবেষণা, উন্নয়ন ও উৎপাদনে জোর দেবে।
রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর এটি পুতিনের প্রথম ভারত সফর। একই সময়ে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত শুল্কবিধি নিয়ে বড় ধরনের চাপের মুখে রয়েছে। রুশ জ্বালানি কেনার কারণে ভারতের বেশিরভাগ পণ্যের ওপর ওয়াশিংটন ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে।
মোদি পুতিনের “অটল প্রতিশ্রুতির” জন্য কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেন, “ভারত–রাশিয়ার অংশীদারত্বে জ্বালানি নিরাপত্তা ছিল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।” তিনি পারমাণবিক জ্বালানির প্রসঙ্গ উল্লেখ করলেও রুশ তেল আমদানির বিষয়ে নির্দিষ্ট মন্তব্য করেননি।
মোদি জানান, দুই দেশ ২০৩০ সাল পর্যন্ত অর্থনৈতিক সহযোগিতা কর্মসূচিতে একমত হয়েছে, যা বাণিজ্যকে “বহুমুখী, ভারসাম্যপূর্ণ ও টেকসই করবে”। এই বৈঠকে কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, নৌপরিবহন ও রাসায়নিক খাতসহ বিভিন্ন বিষয়ে চুক্তি বিনিময় হয়েছে।
রাশিয়া ইতোমধ্যেই ভারতের সবচেয়ে বড় অস্ত্র সরবরাহকারী। দুই দেশের বাণিজ্য ২০২৪ সালে সর্বোচ্চ ৬৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। মস্কো চাইছে ২০৩০ সালের মধ্যে এ বাণিজ্য ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে।
ব্যস্ত সময়সূচি
শুক্রবারের কর্মসূচি শুরু হয় রাষ্ট্রপতি ভবনে ভারতীয় রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদি মুর্মুর সঙ্গে বৈঠক ও গার্ড অব অনারের মাধ্যমে। এরপর পুতিন রাজঘাটে গিয়ে মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পরে দুই নেতা হায়দরাবাদ হাউস কমপ্লেক্সে বৈঠক করেন।
পুতিনের এবারের সফরে “জাঁকজমকের অভাব ছিল না”। বৃহস্পতিবার মোদি বিমানবন্দরে আলিঙ্গন দিয়ে রুশ প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানান এবং বাসভবনে ব্যক্তিগত নৈশভোজও আয়োজন করেন। পুনিয়ার ভাষায়, “অনেক আলিঙ্গন ও হাত মেলানোর দৃশ্য দেখা গেছে।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নয়াদিল্লি ও মস্কো এই বার্তা দিতেই আগ্রহী যে পশ্চিমা চাপ সত্ত্বেও পুতিনকে আন্তর্জাতিক পরিসরে বিচ্ছিন্ন নয় বলে তারা মনে করে।
উল্লেখ্য, ইউক্রেন যুদ্ধের সময় শিশুদের জোরপূর্বক স্থানান্তরের অভিযোগে ২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) পুতিনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। তবে ভারত আইসিসির সদস্য নয়, ফলে পুতিন গ্রেপ্তারের ভীতি ছাড়াই দেশটিতে সফর করতে পেরেছেন। শুক্রবার রাত ৯টায় রাশিয়ার উদ্দেশে তার রওনা হওয়ার কথা রয়েছে।
জটিল সমীকরণ
রাশিয়া ও ভারতের কৌশলগত অংশীদারত্বের বয়স ২৫ বছর। কিন্তু ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণের পর যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সঙ্গে সমান্তরাল সম্পর্ক বজায় রাখা ভারতের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের কারণে দুই দেশের বার্ষিক পারস্পরিক সফরের ঐতিহ্যও ব্যাহত হয়।
পশ্চিমা দেশগুলো রুশ তেল আমদানি কমানোর সঙ্গে সঙ্গে ভারত বরং ক্রয় বাড়ায়। এতে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে, যা আগস্টে দ্বিগুণ হয়ে ৫০ শতাংশে পৌঁছায়। তখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়াকে যুদ্ধবিরতিতে চাপ দিতে ভারতের ওপর চাপ বাড়ানোর কৌশল নেন।
ভারত এসব শুল্কের মধ্যেও রুশ তেল কেনা চালিয়ে যায়। কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে নভেম্বরে, যখন রোসনেফট ও লুকয়েলসহ রুশ তেল কোম্পানিগুলোর ওপর ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়। এ দুই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ভারত তার মোট তেল আমদানির প্রায় ৬০ শতাংশ সংগ্রহ করে। একই সঙ্গে অন্য দেশের কোম্পানিগুলোও এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাণিজ্য করলে নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারে বলে হুঁশিয়ারি দেয় ওয়াশিংটন।
নয়াদিল্লি বলছে, পশ্চিমারা নিজেদের স্বার্থে এখনও রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য করছে; তাই ভারতকে পৃথক করে শাস্তি দেওয়া অন্যায়। ভারতের উদ্দেশ্যে এক সাক্ষাৎকারে পুতিনও একই কথা বলেছেন।
তার ভাষায়, “যুক্তরাষ্ট্র নিজেও আমাদের কাছ থেকে পারমাণবিক জ্বালানি কিনছে। যদি তারা কিনতে পারে, তবে ভারতেরও একই অধিকার থাকা উচিত।”
অস্ত্র বিক্রি ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা
পুতিন আশা করছেন ভারত আরও রুশ অস্ত্র কিনবে। মস্কো দিল্লিকে অতিরিক্ত এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সু-৫৭ স্টেলথ যুদ্ধ বিমান বিক্রি করতে চায়। তবে এ নিয়ে কোনো চুক্তি হয়েছে কি না, তা পরিষ্কার নয়।
এ বৈঠকের কয়েকদিন আগেই পুতিন মস্কোয় যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলোচনা করেন, যেখানে ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান নিয়ে কথা হয়। উভয় পক্ষই অগ্রগতির কথা বললেও কোনো সমাধান হয়নি। বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা ইউক্রেনীয় প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করেন।
ভারত বরাবরই যুদ্ধ নিয়ে রাশিয়াকে দোষারোপ করা থেকে বিরত থেকেছে। নয়াদিল্লির অবস্থান হলো: আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধানই একমাত্র পথ। সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/