ফয়সাল হোসেন তার পরিবারকে বলেছিলেন যে তিনি দুবাইয়ে কাজ খুঁজে পেয়েছেন। তার বাড়ি মাদারীপুর। কিন্তু সত্যিটা ছিল, ২২ বছর বয়সী এই যুবক তখন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) হয়ে লড়াই করছিলেন। টিটিপি শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠার জন্য পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছে। ২০২৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী খাইবার পাখতুনখোয়ার কারাক জেলায় একটি অভিযানে ফয়সাল হোসেনকে হত্যা করে। তার ভাই আরমান গণমাধ্যমে প্রচারিত মৃতদেহের ছবি দেখে তাকে শনাক্ত করেন।
টিটিপির হয়ে লড়াই করার সময় নিহত অন্তত চার বাংলাদেশির মধ্যে একজন হলেন ফয়সাল হোসেন, যাকে পাকিস্তান রাষ্ট্র ফিতনা আল-খাওয়ারিজ বলে অভিহিত করে।
বাংলাদেশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট জানিয়েছে, আরও দুই ডজনেরও বেশি বাংলাদেশি বর্তমানে পাকিস্তানে রয়েছেন। তারা টিটিপি এবং অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনের হয়ে লড়াই করছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রবণতাটি প্রথম ২০২৩ সালে লক্ষ করা যায় এবং ওই ঘটনা বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষকে উদ্বিগ্ন করে তোলে।
আরেক বাংলাদেশি ২২ বছর বয়সী জুবায়ের আহমেদ। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৫ সালের এপ্রিলে নিহত হয়েছেন তিনি। প্রতিবেদক বলেন, ‘এপ্রিলের শেষে আমি একটি অজানা নম্বর থেকে ফোন পেয়েছিলাম। তার মা আলেয়া আক্তার আমাদের জানান, আমার ছেলে আর নেই।’
বলা হয়ে থাকে যে কয়েক ডজন বাংলাদেশি তরুণ তেহরিক-ই-তালেবানের মতো চরমপন্থি পাকিস্তানি সংগঠনের হয়ে লড়াই করছে। তাদের নিয়োগ বাংলাদেশের জন্য একটি বিপজ্জনক নতুন রপ্তানি। পাশাপাশি দক্ষিণ এশীয় জঙ্গিবাদের একটি বিভ্রান্তিকর পরিবর্তনের লক্ষণ।
রতন ঢালীর ভাগ্য
তৃতীয় ব্যক্তি ২৯ বছর বয়সী রতন ঢালীর ভাগ্য এখনো স্পষ্ট নয়। নভেম্বরের গোড়ার দিকে সিটিটিসি তার পরিবারকে জানায়, ২৬ সেপ্টেম্বরের অভিযানে তিনি নিহত হয়েছেন। কিন্তু ১ ডিসেম্বর বাংলাদেশি সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও প্রকাশিত হয়, যেখানে ঢালী নামে একজনকে জীবিত দাবি করা হয়েছে।
সিটিটিসির পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট (এসপি) রওশন সাদিয়া আফরোজ বলেন, ‘কর্মকর্তারা ভিডিওটি তদন্ত করে দেখছেন। এটি ভুয়া বলে মনে করেছেন সংশ্লিষ্টরা।’
পাকিস্তানে টিটিপির একজন মুখপাত্র ইমরান হায়দার, যিনি প্রথমে বলেছিলেন যে ঢালী মারা গেছেন। তিনি এখন তার বক্তব্য প্রত্যাহার করে বলেছেন, ঢালী নিখোঁজ থাকায় তাকে মৃত ধরে নেওয়া হয়েছিল।
ঢালীর পরিবারের জন্য এই অনিশ্চয়তা একধরনের যন্ত্রণা। তার বাবা আনোয়ার ঢালী কয়েক দিন আগে বলেন, ‘পুলিশ আমাকে জানিয়েছে যে আমার ছেলে পাকিস্তানে নিহত হয়েছে। এখন একমাত্র আল্লাহ্ই জানেন আমার ছেলে বেঁচে আছে কি না।’
রতন ঢালী তার পরিবারের সঙ্গে শেষ কথা বলেছিলেন ২০২৪ সালের ১১ এপ্রিল। ঠিক ঈদের দিন। তিনি তার মাকে ভিডিও কল করেছিলেন। ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেছিলেন এবং তাকে বলেছিলেন, তিনি দিল্লিতে আছেন এবং খুব শিগগির দুবাই ভ্রমণ করবেন। রতনের মা সেলিনা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘এটি ছিল আমাদের শেষ কথোপকথন। আমি আর কখনো আমার ছেলের সঙ্গে কথা বলিনি।’
২৯ বছর বয়সী রতন ঢালী দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাদেশের গোপালগঞ্জ জেলার বাসিন্দা। চলতি বছর পাকিস্তানে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
যেভাবে জঙ্গি নিয়োগ হয়
২০২৪ সালের মার্চ মাসে ফয়সাল হোসেন তার বাবাকে বলেন, তিনি দুবাই যেতে চান। কিন্তু তার পরিবার এতে রাজি হয়নি। কারণ তাদের কাছে ফয়সালকে দুবাই পাঠানোর টাকা ছিল না। কয়েক দিন পর অবশ্য ফয়সাল হোসেন তাদের জানান, তিনি সেখানে যাওয়ার একটি উপায় খুঁজে পেয়েছেন। ফয়সাল জানান, ‘একজন বড় ভাই আমাকে সেখানে নিয়ে যাবেন এবং সব খরচ বহন করবেন। আমার বেতন হবে ৩৫ হাজার টাকা। দুবাই পৌঁছানোর পর আমার বেতন থেকে তাকে অর্থ পরিশোধ করতে হবে।’
ফয়সাল হোসেন যখন দুবাইয়ের উদ্দেশে বাড়ি ছেড়ে যাচ্ছিলেন তখন তার বড় ভাই আরমান তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি ভিসা পেয়েছেন কি না। ফয়সাল উত্তর দিয়েছিলেন, ‘তার ভিসা ভারত থেকে হবে।’ আরমান বলেন, ‘আমি তখন এটা শুনে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম।’
আরমান বলেন, ‘ফয়সাল মাসে একবার বা দুবার আমাদের ফোন করে বলতেন, তিনি দুবাইয়ে কাজ করছেন। আমরা সর্বশেষ এই বছরের জুনে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। তার পর থেকে বারবার চেষ্টা করেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।’
২০২৪ সালের মার্চ মাসে ঢালী তার বাবাকে বলেছিলেন, তিনি দুবাই যাচ্ছেন। ঢালীর বাবা আনোয়ার জানান, তার ছেলে তাদের জানিয়েছিল যে তার (ঢালী) বসের দুবাইয়ে একটি ক্লিনিক আছে। তিনিও চান রতন সেখানে কাজ করুক। প্রায় ২০ দিন পর ঢালী তার মাকে ফোন করে জানান, তিনি ভারতে আছেন এবং দুবাই যাবেন।
এসপি আফরোজ বলেন, সত্যিটা হচ্ছে ২০২৪ সালের ২৭ মার্চ বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ফয়সাল এবং রতন ঢালী ভারতে প্রবেশ করেন। সেখান থেকে তারা অবৈধভাবে আফগানিস্তান হয়ে পাকিস্তানে যান। সেখানে গিয়ে তারা টিটিপিতে যোগ দেন।
রতন ঢালী ও ফয়সাল হোসেন ঢাকার খিলগাঁও এলাকায় অবস্থিত রফ রফ হিজামা সেন্টার নামে একটি ক্লিনিকে কাজ করতেন। প্রতিবেদক যখন ক্লিনিকটি খুঁজতে যান, তখন এটি আর ওই ভবনে ছিল না। একজন বাসিন্দা জানান, কয়েক মাস আগে এটি স্থানান্তর করা হয়েছিল।
জুবায়ের আহমেদ ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে তিনি প্রথমে ওমরাহ পালনের জন্য সৌদি আরবে যান। ওমরাহ সম্পন্ন করার পর তিনি আর দেশে ফিরে আসেননি। সিটিটিসি জানিয়েছে, জুবায়ের সৌদি আরব থেকে আইনিভাবে পাকিস্তানে প্রবেশ করেন।
জুবায়েরের মা আলেয়া আক্তার বলেন, ‘ওমরাহ পালনের পর জুবায়ের বলেছিল সে আপাতত দেশে ফিরবে না। সে আল্লাহর বাণী প্রচার করবে।’ চলতি বছরের এপ্রিলে পাকিস্তানে ২২ বছর বয়সী জুবায়ের আহমেদকে হত্যা করা হয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই তিন জঙ্গির নিয়োগের মধ্যে কিছু মিল আছে। তারা তিনজনই সাধারণ পরিবার থেকে এসেছে।
রতন ঢালী ঢাকার একটি স্কুলে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। তার বাবা অটোরিকশা চালান এবং তার মা একজন গৃহিণী। ফয়সাল হোসেন ঢাকার উত্তরার একটি স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেছেন। তার বাবা একজন অবসরপ্রাপ্ত বেসরকারি কর্মচারী। তার বড় ভাই ডেলিভারিম্যান হিসেবে কাজ করেন। জুবায়ের আহমেদ ইসলামিক স্টাডিজে স্নাতক ডিগ্রি নিয়েছেন। মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এসেছেন।
তবে নিহতদের পরিবারের অভিযোগ, তাদের ছেলেদের বিভ্রান্ত করে ফাঁদে ফেলা হয়েছে। তারা ন্যায়বিচার দাবি করছেন এবং বাংলাদেশ সরকারের কাছে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
রতনের বাবা বলেন, ‘আমার একটাই দাবি। যারা আমার ছেলেকে এই পথে নিয়ে গেছে তাদের শাস্তি চাই। ফয়সালের ভাই আরমানও একই দাবি করেন। তার ভাষ্য, ‘আমি বাংলাদেশ সরকারকে এই চক্রের উৎসে তদন্ত করে দায়ীদের শাস্তির আওতায় আনার অনুরোধ করছি, যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ এই ধরনের প্রতারণার ফাঁদে না পড়ে এবং তাদের সন্তানকে হারাতে না হয়।’
দক্ষিণ এশীয় ভূরাজনীতিতে বিশেষজ্ঞ এবং অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী গবেষক মুবাশ্বার হাসান বলছেন, জঙ্গি নিয়োগকারীরা প্রায়ই গ্রামীণ তরুণদের নিশানা করে, যারা বিদেশে চাকরি খুঁজছেন অথবা আর্থিকভাবে সংকটে আছেন। ‘নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের লোকেরা সবচেয়ে বেশি কষ্টের মধ্যে থাকেন। এ কারণে তাদের সহজেই অর্থের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্ররোচিত করা যায়।
তবে পাকিস্তানে টিটিপির মুখপাত্র ইমরান হায়দার দাবি করেছেন, যুবকরা জানত যে তারা কী করতে যাচ্ছেন। কাউকে জোর করে বা প্রতারণা করে এখানে আনা হয়নি। ইমরান হায়দার নিজেকে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক প্রকৌশলী বলে দাবি করেন। সিটিটিসির মতে, তিনি ২০২৩ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ ছেড়েছিলেন।
এসপি আফরোজের মতে, টিটিপির বাইরেও বাংলাদেশিরা পাকিস্তানের একাধিক জঙ্গি সংগঠনে যোগ দিচ্ছেন। এখন পর্যন্ত আমরা তাদের মধ্যে তিনটি সংগঠনকে চিহ্নিত করেছি, সেগুলো হচ্ছে টিটিপি (তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান), টিএলপি (তেহরিক-ই-লাব্বাইক পাকিস্তান) এবং আইএমপি (ইত্তেহাদ-উল-মুজাহিদিন পাকিস্তান)।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বেশির ভাগই টিটিপিতে যোগ দিয়েছে। ২০০৭ সালে বাইতুল্লাহ মেহসুদ এই জঙ্গি সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এর বর্তমান নেতা হলেন নূর ওয়ালি মেহসুদ, যিনি প্রকাশ্যে আফগান তালেবানের প্রতি আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
কতসংখ্যক বাংলাদেশি পাকিস্তানে যাচ্ছেন, তা অনুমান করা এখনো কঠিন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই প্রবণতা বেড়েছে। টিটিপির হায়দার বলেন, ‘আমি আপনাকে বলতে বাধ্য নই, কতজন বাংলাদেশি টিটিপির হয়ে লড়াই করছেন।’
বাংলাদেশের পুলিশ বলছে, তারা পাকিস্তানে থাকা কয়েক ডজন লোককে শনাক্ত করেছে। এসপি আফরোজ বলেন, ‘আমরা ২৫ থেকে ৩০ জনকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছি, যারা বর্তমানে পাকিস্তানে অবস্থান করছে এবং যুদ্ধ করছে।’
বিশেষজ্ঞ এবং নিরাপত্তা কর্মকর্তারা আরও বলেন, এই নিয়োগের বেশির ভাগই অনলাইনে হয় এবং প্রায়ই ধর্মীয় অনুশাসনের ভুল ব্যাখ্যার মাধ্যমে তাদের দলে ভেড়ানো হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জঙ্গি সংগঠনগুলোতে বাংলাদেশি তরুণদের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তারা এখন অনলাইনে এই কাজগুলো করছে। এতে ঝুঁকি অনেকটা কম।’
বাংলাদেশ পুলিশ বলছে, তারা এই ধরনের কার্যকলাপ দমন করছে এবং কড়া নজর রাখছে। এসপি আফরোজ বলেন, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমরা কমপক্ষে ১০০ জনকে চিহ্নিত করেছি, যারা জঙ্গিবাদে জড়িত হওয়ার জন্য পাকিস্তানে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিল। আমরা তাদের থামিয়ে দিয়েছি।’ তথ্যসূত্র: ডন