ভেনেজুয়েলার উপকূলের কাছে একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার জব্দ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী—এমনটাই জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিকোলাস মাদুরো সরকারের ওপর ওয়াশিংটনের চাপ বাড়ানোর প্রচেষ্টায় এ ঘটনাকে বড় ধরনের উত্তেজনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, “আমরা ভেনেজুয়েলার উপকূলে একটি বিশাল তেলবাহী জাহাজ জব্দ করেছি—এটাই সম্ভবত সবচেয়ে বড় ট্যাঙ্কার যা কখনো আটক করা হয়েছে।”
স্থানীয় সময় বুধবার মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি একটি ভিডিও প্রকাশ করে জানান, জাহাজটি ভেনেজুয়েলা ও ইরান থেকে নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত তেল পরিবহনে ব্যবহৃত হতো।
কারাকাস দ্রুত এই পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়ে, এটিকে “আন্তর্জাতিক সমুদ্রদস্যুতা” বলে অভিহিত করে। এর আগে প্রেসিডেন্ট মাদুরো বলেছিলেন, ভেনেজুয়েলা কখনোই “তেলের উপনিবেশ” হবে না।
ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রে মাদক প্রবাহে ভূমিকা রাখছে এবং সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মাদুরোকে আরও কোণঠাসা করতে ওয়াশিংটন চাপ বাড়িয়েছে।
অন্যদিকে ভেনেজুয়েলা অভিযোগ করছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের সম্পদ দখল করতে চায়।
তেলের বাজারে এই জব্দ অভিযান সাময়িক সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করায় ব্রেন্টের দাম স্থানীয় সময় বুধবার সামান্য বেড়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পদক্ষেপ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি বাড়াতে পারে এবং ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি আরও ব্যাহত হতে পারে।
মার্কিন বিচার বিভাগের প্রধান বন্ডি জানান, এ অভিযানে এফবিআই, প্রতিরক্ষা দপ্তর, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি এবং কোস্টগার্ড একযোগে কাজ করেছে।
তিনি এক্স-এ লিখেছেন, “বহু বছর ধরে এই ট্যাঙ্কারটি নিষিদ্ধ ছিল, কারণ এটি একটি অবৈধ তেল পরিবহন চক্রে যুক্ত ছিল যা বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোকে অর্থ জোগাত।”
প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, একটি সামরিক হেলিকপ্টার বিশাল জাহাজটির ওপর ভাসছে এবং দড়ি বেয়ে সৈন্যরা ডেকে নেমে আসছে। সশস্ত্র ইউনিফর্মধারী দলকে জাহাজের বিভিন্ন জায়গায় টহল দিতে দেখা গেছে।
একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা সিবিএস নিউজকে বলেছেন, মার্কিন নৌবাহিনীর বিশাল বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ড থেকে হেলিকপ্টারগুলো অভিযানে ব্যবহার করা হয়, যা গত মাসে ক্যারিবীয় সাগরে পাঠানো হয়েছিল।
অভিযানে দুটি হেলিকপ্টার, ১০ জন কোস্টগার্ড সদস্য, ১০ জন মেরিন এবং বিশেষ বাহিনী অংশ নেয়।
প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ অভিযানের বিষয়ে অবগত ছিলেন এবং ট্রাম্প প্রশাসন এমন আরও পদক্ষেপ বিবেচনা করছে বলে সিবিএসকে একটি সূত্র জানিয়েছে।
ট্যাঙ্কারে থাকা তেলের কী হবে—জিজ্ঞেস করলে ট্রাম্প বলেন, “আমরা রাখবো, মনে হয়… নিশ্চয়ই তেলটা আমরা রাখছি।”
মেরিটাইম ঝুঁকি বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ভ্যানগার্ড টেক জানায়, জাহাজটির নাম স্কিপার এবং এটি দীর্ঘদিন ধরে নিজের অবস্থান ভুয়া সংকেত দিয়ে ‘স্পুফিং’ করছিল।
বিবিসি ভেরিফাই নিশ্চিত করেছে যে হোমল্যান্ড সিকিউরিটির প্রকাশিত ভিডিওর জাহাজটিই স্কিপার।
সিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্র স্কিপারকে নিষিদ্ধ করে—হিজবুল্লাহ এবং আইআরজিসি-কুদস ফোর্সের জন্য তেল চোরাচালানে জড়িত থাকার অভিযোগে।
ভেনেজুয়েলা সরকার জাহাজ জব্দের তীব্র নিন্দা জানিয়ে এক বিবৃতিতে একে “গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধ” বলে অভিহিত করেছে।
অভ্যন্তরীণ মন্ত্রী দিওসদাদো কাবেলো যুক্তরাষ্ট্রকে “খুনি, চোর, জলদস্যু” বলে আক্রমণ করেন।
তিনি পাইরেটস অব দ্য ক্যারিবিয়ান চলচ্চিত্রের উদাহরণ টেনে বলেন, “ওই সিনেমায় জ্যাক স্প্যারো নায়ক, কিন্তু এরা আসল সমুদ্রদস্যু।”
মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রের জনগণকে উদ্দেশ করে যুদ্ধবিরোধী বার্তা দিতে ১৯৮৮ সালের বিখ্যাত গান ডোন্ট ওরি, বি হ্যাপি গেয়ে শোনান। তিনি বলেন, “যুদ্ধ নয়, সুখে থাকুন… পাগলামি যুদ্ধ নয়, সুখে থাকুন।”
তখন মাদুরো অভিযানের খবর জানতেন কি না, তা স্পষ্ট নয়।
বিবিসি ভেরিফাই জানিয়েছে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবীয় সাগরে সামরিক উপস্থিতি আরও বাড়িয়েছে, যেখানে ভেনেজুয়েলার উত্তরের সমুদ্রসীমা অবস্থিত। এতে হাজারো সৈন্য এবং ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ডকে ভেনেজুয়েলার কাছাকাছি অবস্থান করানো হয়েছে।
এ অবস্থায় সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে জল্পনা বাড়ছে।
সেপ্টেম্বর থেকে যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ২২টি নৌকা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে—ওয়াশিংটনের দাবি, এগুলো মাদক পাচারে জড়িত ছিল। এ হামলায় অন্তত ৮০ জন নিহত হয়েছে। সূত্র: বিবিসি
মাহফুজ/