গাজা উপত্যকায় ঝড় বাইরন আঘাত হানার পর থেকে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ১২ জন মারা গেছেন। উপত্যকার বহু এলাকায় বহু বাড়ি, দেয়াল ও তাঁবু ধসে পড়েছে। ইসরায়েলের ধ্বংসযজ্ঞে আগে থেকেই বিপর্যস্ত ছিল গাজা। তাতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে বাইরন।
আল-জাজিরা জানিয়েছে, মৃতদের মধ্যে তিনজন শিশু রয়েছে। যারা হাইপোথার্মিয়ায় (শীতজনিত কারণে) মারা গেছে। আল-জাজিরার হানি মাহমুদ বলেন, ‘ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত ফিলিস্তিনিদের এই ভয়াবহ আবহাওয়ার জন্য প্রস্তুত হওয়ার মতো কিছুই ছিল না।’
ঝড়ের আঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্র, অস্থায়ী তাঁবু এবং আগে থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর। প্রবল বাতাস ও বৃষ্টির চাপ সহ্য করতে না পেরে সেসব ধসে পড়ছে। উত্তর গাজা উপত্যকায় বেইত লাহিয়ায় একটি বাড়ি ধসে পড়ে পাঁচজন মারা গেছেন এবং অনেকে আহত হয়েছেন। সেখানকার বাসিন্দা ও সিভিল ডিফেন্স সদস্যরা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষদের বাঁচানোর চেষ্টা করেন।
গাজা সিটিতে যে ছেঁড়া তাঁবুটিতে গাদির আল-আধাম তার স্বামী ও ছয় সন্তানকে নিয়ে ভাগ করে থাকেন, সেটি দিয়ে টুপটাপ পানি ঝরেছে গতকালও। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও তারা বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছে।
বিবিসিকে তিনি বলেন, ‘আমরা অপমানজনক এক জীবন কাটাচ্ছি। আমরা কারাভান চাই। আমাদের ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ চাই। উষ্ণতা পাওয়ার জন্য কংক্রিটের ঘর চাই। প্রতিদিন সন্তানদের জন্য বসে কাঁদি।’
যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে হওয়া যুদ্ধবিরতির দুই মাস পার হয়ে গেলেও গাজা এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনার প্রথম ধাপেই আটকে আছে। অঞ্চলটি দুই পক্ষের মধ্যে বিভক্ত বর্তমানে। মানুষ এখনো বাস্তুচ্যুত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে, চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ধ্বংসস্তূপ।
ভারী বৃষ্টিতে এরই মধ্যে শরণার্থী শিবিরগুলো প্লাবিত হয়েছে এবং শক্তিশালী এক শীতকালীন ঝড়ের কারণে বেশ কয়েকটি ভবন ধসে পড়েছে। জাতিসংঘ বলছে, ৮ লাখের বেশি গাজার বাসিন্দা বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছেন।
শান্তিচুক্তির পরবর্তী ধাপে নতুন বাড়ি এবং নতুন প্রশাসনের পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হওয়ার কথা। সেগুলো এখনো আটকে আছে। ইসরায়েলের শেষ নিখোঁজ জিম্মি রান গিভিলির সন্ধান চলছে বর্তমানে। তার লাশ ফেরত দেওয়ার মধ্য দিয়ে সব নিহত জিম্মির লাশ ফেরত পাবে ইসরায়েল।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জোর দিয়ে বলেছেন, হামাসকে অবশ্যই সব জিম্মিকে ফিরিয়ে দিতে হবে। তার পরই শুধু দুই পক্ষ পরবর্তী কঠিন ধাপগুলোতে অগ্রসর হতে পারবে।
তবে গাজার ধ্বংসস্তূপে বহু অনুসন্ধান সত্ত্বেও রানের কোনো খোঁজ মেলেনি। ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার সময় তাকে আটক করা হয়েছিল। তিনি ইসরায়েলের একজন পুলিশ কর্মকর্তা। তার পরিবারের অভিযোগ, হামাস ভবিষ্যৎ আলোচনায় চাপ বজায় রাখতে ইচ্ছা করেই রানের লাশ ফেরত দিচ্ছে না।
তবে হামাসের এক কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেছেন, অভিযোগটি সত্য নয় এবং ইসরায়েলই চুক্তি বাস্তবায়ন এড়াতে চাইছে। ইসরায়েল এখনো গাজার একটি অংশে রয়ে গেছে। হামাস চায় সেখান থেকেও তারা পিছু হটুক। তবে ইসরায়েলের অনেকেই মনে করেন, জীবিত অথবা মৃত একজন জিম্মিও যদি বাকি থাকে, তাহলে গাজা থেকে আরও পেছনে বাহিনী সরানোর মতো ধাপগুলো বাস্তবায়ন করা নেতানিয়াহুর জন্য রাজনৈতিকভাবে কঠিন হবে।
পরবর্তী ধাপে যেতে হলে দুই পক্ষকেই কঠিন ছাড় দিতে হবে। হামাসের জন্য এর মানে হলো, অস্ত্র ও ক্ষমতা ত্যাগ করা। অন্যদিকে ইসরায়েলের জন্য এর মানে হলো, গাজার সব আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর অপারেশন্স ডিরেক্টরেটের সাবেক প্রধান অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ইসরায়েল জিভ-এর মতে, দুই পক্ষের নেতারাই দ্বিধায় আছে। তিনি বলেন, ‘ইসরায়েল ও হামাস, দুই পক্ষেরই স্বার্থ হলো খুব দ্রুত দ্বিতীয় ধাপে না যাওয়া। হামাস নিয়ন্ত্রণ হারাতে চায় না, আর ইসরায়েল রাজনৈতিক কারণে গাজায় থাকতে পছন্দ করছে। কারণ তাদের সমর্থকদের কাছে প্রত্যাহারের ব্যাখ্যা দেওয়া কঠিন।’ তিনি মনে করেন, শুধু ট্রাম্পই দুই পক্ষকে এগোতে বাধ্য করতে পারেন। আর সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। সূত্র: বিবিসি ও আল-জাজিরা