পেন্টাগনের নতুন ‘জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশল’ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র এখন থেকে তার মিত্র দেশগুলোকে আগের চেয়ে ‘আরও সীমিত’ সহায়তা প্রদান করবে।
নিরাপত্তা অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে এক বড় পরিবর্তন এনে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ এখন চীন নয়, বরং নিজেদের মূল ভূখণ্ড এবং পশ্চিম গোলার্ধের নিরাপত্তাকেই প্রধান গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রতি চার বছর অন্তর প্রকাশিত এই কৌশলে আগের বার চীনকে শীর্ষ হুমকি হিসেবে দেখা হতো। তবে এবারের রিপোর্টে বলা হয়েছে, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক এখন থেকে ‘সংঘাত নয়, বরং শক্তির’ ভিত্তিতে পরিচালিত হবে।
এই নতুন কৌশলটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক দাবিগুলোকেই জোরালো করছে, যেখানে তিনি রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার হুমকি মোকাবিলায় মিত্র দেশগুলোকে আরও বেশি ‘ব্যয়ভার বহনের’ আহ্বান জানিয়েছেন।
কৌশলের মূল দিকসমূহ
ভিন্নধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি: গত বছর প্রকাশিত ‘জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল’-এ বলা হয়েছিল ইউরোপ সভ্যতাগত পতনের মুখে এবং রাশিয়াকে সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখা হয়নি। সেই সময়ে মস্কো এই দলিলটিকে তাদের নিজেদের চিন্তাভাবনার সঙ্গে ‘সামঞ্জস্যপূর্ণ’ বলে বর্ণনা করেছিল।
এর বিপরীতে, ২০১৮ সালে পেন্টাগন চীন ও রাশিয়াকে মার্কিন নিরাপত্তার জন্য ‘কেন্দ্রীয় চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।
মিত্রদের ওপর দায়ভার: নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিত্ররা এতদিন ওয়াশিংটনের ভর্তুকিতে নিজেদের রক্ষা করে ‘সন্তুষ্ট’ ছিল। তবে এটি কোনো ‘বিচ্ছিন্নতাবাদ’ নয়, বরং হুমকির গুরুত্ব বুঝে একটি কৌশলগত পদক্ষেপ।
ওয়াশিংটন আর বিশ্বের অন্য কোনো মানুষের বিপদকে আমেরিকানদের বিপদের সমান মনে করে নিজেদের স্বার্থ বিসর্জন দিতে চায় না।
আঞ্চলিক দায়িত্ব: এখন থেকে মিত্ররা, বিশেষ করে ইউরোপীয় দেশগুলোকে তাদের নিজেদের অঞ্চলের হুমকি মোকাবিলায় নেতৃত্ব দিতে হবে। রাশিয়াকে এখন ন্যাটোর পূর্ব দিকের সদস্যদের জন্য একটি ‘স্থায়ী কিন্তু নিয়ন্ত্রণযোগ্য হুমকি’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
তাইওয়ান ও উত্তর কোরিয়া: আশ্চর্যজনকভাবে, এবারের নথিতে তাইওয়ানের কোনো উল্লেখ নেই, যদিও গত বছর দেশটি সেখানে ১১ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি করেছিল। এছাড়া কৌশলটিতে উত্তর কোরিয়াকে নিবৃত্ত করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ‘আরও সীমিত’ ভূমিকার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, এই দায়িত্ব পালনে দক্ষিণ কোরিয়া ‘প্রাথমিক দায়িত্ব’ নেওয়ার সক্ষমতা রাখে।
এতে লক্ষ্য হিসেবে বলা হয়েছে, ‘‘চীনকে দমন করা নয়; কিংবা তাদের টুঁটি চেপে ধরা বা অপমানিত করাও নয়।’’
তবে নথিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হলো ‘‘চীনসহ কাউকেই যেন আমাদের বা আমাদের মিত্রদের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে দেওয়া না হয়।’’
‘বাস্তববাদী’ অবস্থান: পেন্টাগন জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদ্ধতি হবে আগের সরকারগুলোর ‘আদর্শবাদী’ চিন্তার বাইরে একটি ‘কঠোর বাস্তববাদী’ অবস্থান।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরেই যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তার, প্রশান্ত মহাসাগরে মাদকবাহী নৌকায় হামলা এবং গ্রিনল্যান্ড কেনার জন্য মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি করার মতো ঘটনা ঘটিয়েছে।
কৌশলপত্রে স্পষ্ট বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ করে পানামা খাল, গালফ অব আমেরিকা ( পূর্ব নাম গালফ অব মেক্সিকো) এবং গ্রিনল্যান্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে নিজেদের সামরিক ও বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করবে।
বিশ্বনেতাদের প্রতিক্রিয়া
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে ট্রাম্প দাবি করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটো থেকে ‘কখনো কিছুই পায়নি’ এবং তিনি ভুলভাবে দাবি করেন যে ন্যাটো পরিচালনার ১০০ শতাংশ খরচই যুক্তরাষ্ট্র দেয়।
এর প্রতিক্রিয়ায় কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেন, ‘পুরানো বিশ্বব্যবস্থা আর ফিরে আসবে না।’ তিনি দক্ষিণ কোরিয়া, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো মধ্যম শক্তির দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘মধ্যম শক্তির দেশগুলোকে অবশ্যই একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কারণ আমরা যদি আলোচনার টেবিলে না থাকি, তবে আমাদের অন্যের শিকারে পরিণত হতে হবে।’
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁও একটি ‘নিয়মবিহীন বিশ্বের’ দিকে ধাবিত হওয়ার বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। সূত্র: বিবিসি
মাহফুজ/