কুয়েতে একটি বিদ্যুৎ ও পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টে ইরানের হামলায় একজন ভারতীয় কর্মী নিহত হয়েছেন এবং স্থাপনাটির একটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে । যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের মধ্যে আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ার সময় এ ঘটনা ঘটল।
সোমবার (৩০ মার্চ) কুয়েতের বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, ‘কুয়েত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরানের আগ্রাসনের অংশ হিসেবে একটি বিদ্যুৎ ও পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টের সার্ভিস ভবনে হামলা চালানো হয়েছে। এতে একজন ভারতীয় কর্মী নিহত হয়েছেন এবং ভবনটির উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে।’
ঘটনার পরপরই কারিগরি ও জরুরিসেবা দল ঘটনাস্থলে পাঠানো হয় এবং স্বাভাবিক কার্যক্রম চালু রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়। ইরানের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে কুয়েতের মন্ত্রণালয়ের বরাতে বলা হয়েছে, হামলায় প্ল্যান্টটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
আল-জাজিরার প্রতিবেদক মালিক ট্রেইনা কুয়েত সিটি থেকে জানান, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কুয়েত একাধিকবার হামলার শিকার হয়েছে। তিনি বলেন, ‘মাত্র গতকাল সন্ধ্যায় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কুয়েতের আকাশসীমায় ১৪টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ১২টি ড্রোন শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি একটি সামরিক শিবিরকে লক্ষ্য করে ছোড়া হয়, যেখানে ১০ জন সেনা আহত হয়েছেন। তাদের হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে এবং চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।’
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, কুয়েতের সামরিক শিবির, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টে ইরানের হামলা ‘ঘৃণ্য আগ্রাসন’। তারা আরও বলেছে, কাতার, কুয়েতের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষায় নেওয়া সব পদক্ষেপের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানায়। দুবাই থেকে আল-জাজিরার প্রতিবেদক জেইন বাসরাভি বলেন, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি) দেশগুলোতে বিদ্যুৎ ও পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টে হামলা নিয়ে ‘গভীর উদ্বেগ’ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘বিশ্বে মোট উৎপাদিত বিশুদ্ধ পানির প্রায় ৪০ শতাংশই এই অঞ্চলে উৎপাদিত হয় এবং এখানকার শহরগুলো তাদের পানীয় জলের জন্য এই প্ল্যান্টগুলোর ওপর নির্ভরশীল।’
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী হামলা শুরুর পর থেকেই আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ছে। ইরানের কর্তৃপক্ষের মতে, এই হামলায় ২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি, আরও কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা এবং অন্তত ২১৬ জন শিশু রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও ধ্বংস হয়েছে।
এর জবাবে ইরান ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি থাকা আঞ্চলিক দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে, যাতে হতাহতের পাশাপাশি অবকাঠামোগত ক্ষতি হচ্ছে।
এ ছাড়া ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি অবরোধ করে রেখেছে, যার মাধ্যমে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়। এতে জ্বালানির দাম বেড়ে গেছে এবং বৈশ্বিক অর্থবাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা ১০ দিনের জন্য (৬ এপ্রিল পর্যন্ত) স্থগিত রাখা হবে। ইরানও সতর্ক করে দিয়েছে, তাদের স্থাপনায় হামলা হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোতে পাল্টা হামলা চালানো হবে। এই যুদ্ধ দেখিয়ে দিচ্ছে, বিশ্বের সবচেয়ে পানিসঙ্কটপূর্ণ অঞ্চলগুলোর একটি মধ্যপ্রাচ্যে পানি অবকাঠামো কতটা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সূত্র: আল-জাজিরা