ফিলিস্তিনের গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীরে লাগাতার মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ২০০০ সালে কার্যকর হওয়া ইইউ ও ইসরায়েলের মধ্যকার সহযোগিতামূলক চুক্তিটি পর্যালোচনা ও বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছিল স্পেন, স্লোভেনিয়া এবং আয়ারল্যান্ড।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত মঙ্গলবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ইসরায়েলের সঙ্গে জোটের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনায় বসে। এ সময় সহযোগিতামূলক চুক্তিটি বাতিলে ভেটো দেয় জার্মানি ও ইতালি। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করার প্রচেষ্টা আটকে যায়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের কার্যকলাপ নিয়ে ইউরোপীয়দের মধ্যে এক ক্রমবর্ধমান অস্বস্তি দেখা যাচ্ছিল। এ ছাড়াও মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে ব্যবস্থা গ্রহণের জোরালো আহ্বান জানিয়ে আসছিল।
গত মঙ্গলবার লুক্সেমবার্গে স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে ম্যানুয়েল আলবারেজ বলেন, ‘আমি আশা করি প্রতিটি ইউরোপীয় দেশ মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক আইন রক্ষার বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত ও জাতিসংঘের বক্তব্যকে সমুন্নত রাখবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটার ব্যতিক্রম হলে তা হবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরাজয়।’
তবে ইসরায়েলের সঙ্গে এই বাণিজ্য চুক্তি সম্পর্ক নিয়ে ইইউতে বিভক্তিই দেখা গেল। বিশেষ করে জার্মানি, হাঙ্গেরি এবং চেক প্রজাতন্ত্রের মতো দেশগুলো কোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে অনিচ্ছুক, যার অর্থ হলো অদূর ভবিষ্যতে চুক্তিটি সম্পূর্ণ স্থগিত করার সম্ভাবনা কম।
এই বিষয়ে জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ভাডেফুল স্পেনের অনুরোধকে ‘অনুপযুক্ত’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, যেকোনো বিষয় ‘ইসরায়েলের সঙ্গে একটি সমালোচনামূলক ও গঠনমূলক সংলাপের’ মাধ্যমে আলোচনা করতে হবে।
ইইউ ও ইসরায়েল সহযোগিতামূলক চুক্তি
ইইউ-ইসরায়েল অংশীদারত্ব চুক্তি হলো ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইসরায়েলের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক চুক্তি, যা ১৯৯৫ সালে স্বাক্ষরিত হয়ে ২০০০ সালে কার্যকর হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে বাণিজ্য সহজীকরণ, শুল্ক হ্রাস এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা হয়। ফলে ইসরায়েল ইইউর একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদারে পরিণত হয়। পাশাপাশি এটি রাজনৈতিক সংলাপ, মানবাধিকার, গণতন্ত্র, শিক্ষা, গবেষণা ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতার একটি কাঠামো তৈরি করে। ইসরায়েল ইইউর বিভিন্ন গবেষণা ও উদ্ভাবন কর্মসূচিতেও অংশ নিতে পারে। তবে এই চুক্তির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর মানবাধিকার ধারা, যা অনুচ্ছেদ ২ নামে পরিচিত। এই ধারায় বলা আছে, এই সহযোগিতা ‘মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক নীতির প্রতি শ্রদ্ধার ভিত্তিতে’ হবে। এই ধারাটিই বর্তমান বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে, কারণ ইসরায়েলের পক্ষ থেকে চুক্তি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে তা সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে চুক্তিটি স্থগিত করতে পারবে ইইউ।
স্থগিতের পক্ষে অবস্থানের কারণ
গাজায় ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরায়েলের আচরণের বিরুদ্ধে সৃষ্ট ক্ষোভের কারণ অন্যতম। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুসারে, ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধে ৭১ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি থেকে ইসরায়েলিদের হামলা ও ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানের ফলে ফিলিস্তিনিদের গ্রাম ও জনপদগুলো ক্রমবর্ধমান আক্রমণের শিকার হচ্ছে। গত অক্টোবরে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে মার্কিন নেতৃত্বাধীন একটি ‘যুদ্ধবিরতি’ চুক্তি হওয়া সত্ত্বেও ইসরায়েলি বাহিনী গাজায় প্রায় প্রতিদিন হামলা ও আক্রমণ অব্যাহত রেখেছে।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের এক তদন্তে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধে গণহত্যার উদ্দেশ্য প্রমাণিত হয়, যা প্রায় দুই বছরের যুদ্ধের পর একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে, দক্ষিণ আফ্রিকা গাজায় গণহত্যার সমতুল্য আচরণের অভিযোগে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হেগের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) একটি মামলা দায়ের করে। সেই মামলাটি এখনো চলমান। এ ছাড়াও গত বছরের ডিসেম্বরে, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ডেনমার্ক ও ফ্রান্সসহ ১৪টি দেশ অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের ১৯টি বসতি স্থাপনের অনুমোদনের নিন্দা জানিয়েছিল। তারা বলেছিল, এই পদক্ষেপটি অবৈধ এবং এটি গাজার যুদ্ধবিরতি ও ‘সমগ্র অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও নিরাপত্তাকে’ বিপন্ন করেছে।
তাই ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে স্পেন, আয়ারল্যান্ড ও স্লোভেনিয়া চুক্তিটির পর্যালোচনা ও স্থগিতের দাবি জানিয়ে আসছিল। এ ছাড়াও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ ৬০টিরও বেশি মানবাধিকার সংস্থা ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েনকে চুক্তি স্থগিতের কথা বলে আসছিল। সূত্র: আল-জাজিরা