যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে নতুন করে যে পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে, সেটি ২০১৫ সালের জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশনের (জেসিপিওিএ) চেয়েও শক্ত ও কার্যকর হবে। তার ভাষায়, আগের চুক্তিটি ছিল ‘একপাক্ষিক’ এবং সেটি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ পুরোপুরি রক্ষা করতে পারেনি। তবে অনেক পর্যবেক্ষকেরই ধারণা, সেটি থেকে ট্রাম্প এর আগে বের হয়ে যাওয়াতেই বর্তমান সমস্যা তৈরি হয়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে তিনি ইরানের সঙ্গে চলমান অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়িয়েছেন, যাতে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফা আলোচনা শুরু করা যায়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম কঠোর শর্ত হচ্ছে, ইরানকে সম্পূর্ণভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে হবে। এখানেই মূল দ্বন্দ্ব। কারণ ইরান বলছে তারা কখনোই তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করবে না, যদিও সেটি তাদের মতে শুধুই বেসামরিক কাজে ব্যবহৃত হয়।
ইউরেনিয়াম আসলে কী
ইউরেনিয়াম একটি ভারী, তেজস্ক্রিয় ধাতু–যা পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির মূল উপাদান। এটি প্রকৃতিতে খুব অল্প পরিমাণে ছড়িয়ে থাকে। পাথর, মাটি, এমনকি সমুদ্রের পানিতেও পাওয়া যায়।
বিশ্বের বেশির ভাগ ইউরেনিয়াম উৎপাদন হয় কয়েকটি নির্দিষ্ট দেশে। এগুলো হলো, কাজাখস্তান, কানাডা, নামিবিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং উজবেকিস্তান।
খনি থেকে ইউরেনিয়াম সরাসরি ব্যবহারযোগ্য নয়। এটি কয়েকটি ধাপে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। প্রথমে আকরিক থেকে ‘ইয়েলোকেক’ নামের এক ধরনের গুঁড়া তৈরি করা হয়। এর পর সেটিকে রাসায়নিকভাবে পরিবর্তন করে গ্যাসে রূপান্তরযোগ্য যৌগ (ইউরেনিয়াম হেক্সাফ্লুরাইড) বানানো হয়, যা সমৃদ্ধকরণের জন্য প্রয়োজন।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কীভাবে হয়
প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামের মধ্যে মূলত দুটি গুরুত্বপূর্ণ আইসোটোপ থাকে। এ দুটি আইসোটোপ হলো ইউ-২৩৮ ও ইউ-২৩৫। এর মধ্যে ইউ-২৩৫ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি পারমাণবিক চেইন রিঅ্যাকশন তৈরি করতে পারে।
সমস্যা হলো, প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামে ইউ-২৩৫-এর পরিমাণ মাত্র ০ দশমিক ৭ শতাংশ। তাই এটিকে বাড়াতে হয়। এই প্রক্রিয়াকেই বলা হয় সমৃদ্ধকরণ।
এই প্রক্রিয়ায় ইউরেনিয়ামকে প্রথমে গ্যাসে রূপান্তর করা হয়। তার পর সেটিকে দ্রুত ঘূর্ণায়মান সেন্ট্রিফিউজ মেশিনে পাঠানো হয়। ভারী অংশ ইউ-২৩৮ বাইরের দিকে চলে যায়, আর হালকা অংশ ইউ-২৩৫ কেন্দ্রে থাকে। এইভাবে ধাপে ধাপে ইউ-২৩৫-এর ঘনত্ব বাড়ানো হয়।
একটি সেন্ট্রিফিউজ খুব সামান্য কাজ করতে পারে, তাই শত শত বা হাজার হাজার সেন্ট্রিফিউজ একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়। এগুলোকে ‘ক্যাসকেড’ বলা হয়।
সমৃদ্ধকরণের স্তরগুলো কেন গুরুত্বপূর্ণ
ইউরেনিয়াম কতটা সমৃদ্ধ, সেটিই নির্ধারণ করে এটি কী কাজে ব্যবহার করা যাবে।
আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার হিসাবে ৩ থেকে ৫ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য যথেষ্ট। ৫ থেকে ২০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দিয়ে উন্নত রিঅ্যাক্টর বা গবেষণার কাজ করা যায়। উচ্চ সমৃদ্ধ হয় ২০ শতাংশের ঘর পার হলে, এটি ঝুঁকিপূর্ণ ধাপও। অন্যদিকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য ইউরেনিয়ামকে ৯০ শতাংশেরও বেশি পরিশোধিত ও সমৃদ্ধ হতে হয়।
এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইউরেনিয়াম ২০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ হওয়ার পর থেকে অস্ত্রমানের জন্য প্রয়োজনীয় ৯০ শতাংশে পৌঁছানো তুলনামূলক দ্রুত হয়ে যায়। তাই আন্তর্জাতিক মহল ২০ শতাংশের স্তরটিকে ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবে গণ্য করে।
ইরানের বর্তমান অবস্থা
আইএইএর তথ্য অনুযায়ী, ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ কেজি ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে। বিশেষজ্ঞ টেড পোস্টলের মতে, এই পর্যায় থেকে ৯০ শতাংশে পৌঁছাতে খুব বেশি সময় লাগে না, বড়জোর কয়েক সপ্তাহ লাগতে পারে। তিনি একটি সহজ উদাহরণ দেন।
শুরু থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত যেতে কয়েক বছর লাগে, কিন্তু ৬০ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশে যেতে লাগে খুব অল্প সময়। কারণ তখন উপাদানটি ইতোমধ্যেই অনেকটাই সমৃদ্ধ। আর এ কারণেই পশ্চিমা দেশগুলো সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন ৬০ শতাংশের স্তর নিয়ে।
ইরান কি সহজেই পারমাণবিক অস্ত্র বানাতে পারবে
তাত্ত্বিকভাবে যদি ইরান চায়, তা হলে তাদের বর্তমান প্রযুক্তি দিয়ে দ্রুত অস্ত্রমান ইউরেনিয়াম তৈরি করা সম্ভব।
কারণ তাদের কাছে উন্নত সেন্ট্রিফিউজ আইআর-৬ আছে। দেশটির পারমাণবিক অনেক স্থাপনাই ভূগর্ভে অবস্থিত, যা ধ্বংস করা কঠিন।
এ ছাড়া ছোট জায়গায়ও সমৃদ্ধকরণ চালানো সম্ভব। তবে শুধু ইউরেনিয়াম থাকলেই বোমা তৈরি হয় না। এর জন্য ডিজাইন, বিস্ফোরণ ব্যবস্থা এবং ডেলিভারি সিস্টেম (ক্ষেপণাস্ত্রও) দরকার। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ইরানের এসব ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি রয়েছে।
আন্তর্জাতিক আইন কী বলে
আন্তর্জাতিক আইন ট্রিটি অন দ্য নন-প্রলিফারেশন অব নিউক্লিয়ার উইপনস অনুসারে, দেশগুলো শান্তিপূর্ণ কাজে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারে। কিন্তু পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারে না।
ইরান এই চুক্তির সদস্য। তাই তারা যুক্তি দেয় যে তাদের কর্মসূচি বৈধ। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা আশঙ্কা করে, এই ‘শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি’ থেকেই দ্রুত অস্ত্র তৈরি করা সম্ভব।
জেসিপিওএ কেন গুরুত্বপূর্ণ ছিল
২০১৫ সালে বারাক ওবামার সময়ে করা জেসিপিওএ চুক্তিতে ইরান সম্মত হয়েছিল। কারণ সমৃদ্ধকরণ ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশে সীমিত রাখতে তারা সম্মত হয়েছিল। সেন্ট্রিফিউজ সংখ্যা কমাতেও তারা একমত হয়েছিল।
এর বিনিময়ে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়। কিন্তু ২০১৮ সালে ট্রাম্প এই চুক্তি থেকে বের হয়ে গেলে পুরো কাঠামো ভেঙে পড়ে। এর পর ইরান ধাপে ধাপে সমৃদ্ধকরণ বাড়াতে শুরু করে এবং এখন ৬০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।
বর্তমান আলোচনা কেন জটিল
বর্তমান আলোচনায় মূল সমস্যা তিনটি। প্রথমত যুক্তরাষ্ট্র চাইছে সম্পূর্ণ সমৃদ্ধকরণ বন্ধ হোক। দ্বিতীয়ত ইরান চাইছে নিজেদের অধিকার বজায় রাখতে। আর তৃতীয়ত বিশ্বাসের সংকটের কারণে আগের চুক্তি ভেঙে গেছে।
ইরান আপাতত একটি প্রস্তাব দিয়েছে যে তারা ৬০ শতাংশ ইউরেনিয়ামকে কমিয়ে ২০ শতাংশ করতে পারে। এটি আংশিক সমাধান হতে পারে, কিন্তু পুরো সমস্যার সমাধান নয়।
বিশ্বে কার কাছে পারমাণবিক অস্ত্র আছে
২০২৬ সালের হিসাবে বিশ্বে প্রায় ১২ হাজারের বেশি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে।
সবচেয়ে বেশি আছে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। এ ছাড়া চীন, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, ভারত, পাকিস্তান, উত্তর কোরিয়া এবং ইসরায়েলের কাছেও পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে (ইসরায়েল তা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে না)।
সবচেয়ে ব্যতিক্রমী উদাহরণ হলো দক্ষিণ আফ্রিকা, তারা স্বেচ্ছায় তাদের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ করে দিয়েছে।
বর্তমানে পুরো পরিস্থিতির কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘সমৃদ্ধকরণ’। ইরান বলছে এটি তাদের অধিকার, আর যুক্তরাষ্ট্র বলছে এটি বড় ঝুঁকি।
এই দ্বন্দ্বের সমাধান না হলে নতুন কোনো চুক্তি টেকসই হবে না। আর পারমাণবিক ঝুঁকির যে দাবি যুক্তরাষ্ট্র তুলেছে, সেটিরও অবসান হবে না। এর আগে ইরান বরাবরই বলেছে, তারা শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যেই ইউরেনিয়াম পরিশোধন করছে। অস্ত্র তৈরির কোনো পরিকল্পনা নেই তাদের। নতুন বাস্তবতায় তাদের এ বিষয়ে অবস্থানগত পরিবর্তন এসেছে কি না, তা-ও স্পষ্ট নয়। তবে গোটা বিষয়টি থেকে উদ্ভূত যুদ্ধ, হামলা-পাল্টা হামলা ও হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়া পুরো বিশ্বেই প্রভাব ফেলেছে। এ রকম পরিস্থিতিতে বিষয়টির সুষ্ঠু সমাধানের আশায় রয়েছে গোটা বিশ্ব। সূত্র: আল জাজিরা