ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি কার্যকর হয়েছে। এর ফলে দুই দেশ একে অপরের সামরিক ঘাঁটি ও ভূখণ্ডে সৈন্য, যুদ্ধজাহাজ এবং যুদ্ধবিমান মোতায়েন করতে পারবে। দীর্ঘদিনের এই দুই মিত্রের মধ্যে এটি এখন পর্যন্ত হওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক সমঝোতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নতুন এই চুক্তির নাম ‘রেসিপ্রোকাল এক্সচেঞ্জ অব লজিস্টিক সাপোর্ট (রেলোস)’। প্রায় আট বছর ধরে আলোচনার পর গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসে এটি মস্কোতে স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ১৫ ডিসেম্বর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এটি অনুমোদন করেন এবং ১২ জানুয়ারি থেকে এটি কার্যকর হয়। তবে রুশ কর্মকর্তারা চলতি সপ্তাহে এর বিস্তারিত প্রকাশ করেছেন।
রেলোস চুক্তিতে যা আছে
সেনা ও সরঞ্জাম: উভয় দেশ একে অপরের মাটিতে সর্বোচ্চ ৩ হাজার সেনা, ৫টি যুদ্ধজাহাজ এবং ১০টি সামরিক বিমান মোতায়েন করতে পারবে।
অবকাঠামো ব্যবহার: শান্তিকালীন বা যুদ্ধকালীন উভয় সময়েই একে অপরের বন্দর, বিমানঘাঁটি ও সামরিক স্থাপনা ব্যবহার করা যাবে।
লজিস্টিক সেবা: এর আওতায় জ্বালানি নেওয়া, সরঞ্জাম মেরামত, খাবার ও পানি সরবরাহ এবং কারিগরি সহায়তা পাওয়া যাবে।
চুক্তিটি আপাতত ৫ বছরের জন্য কার্যকর থাকবে, যা পারস্পরিক সম্মতিতে বাড়ানো সম্ভব। দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে যৌথ প্রশিক্ষণ এবং মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ মোকাবিলায় একে অপরকে সাহায্য করবে।
রাশিয়ার জন্য এই চুক্তির সুবিধা
আল-জাজিরার বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়, শীতল যুদ্ধের সময় থেকেই রাশিয়া ভারতের প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ। ১৯৬০-এর দশক থেকে দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। ২০২২ সালে ইউক্রেন আক্রমণের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ভারত রাশিয়ার তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা হয়ে ওঠে। এতে পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপর অসন্তোষ প্রকাশ করে।
নতুন এই চুক্তির মাধ্যমে রাশিয়া ভারত মহাসাগরে প্রবেশের একটি বড় সুযোগ পেয়েছে। একইভাবে ভারতও রাশিয়ার আর্কটিক অঞ্চল ও দূরপ্রাচ্যের ভ্লাদিভস্তক থেকে মুরমানস্ক পর্যন্ত সামুদ্রিক রুট ব্যবহারের সুযোগ পাবে, যা বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার ঝুঁকি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ।
মস্কোর রুশ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কাউন্সিলের গবেষক আন্দ্রেই কোর্টুনভ বলেন, এই চুক্তি দুই দেশের বিদ্যমান সম্পর্ককে আরও গভীর করে। এটি দুই দেশকে একে অপরের সামরিক অবকাঠামো ব্যবহারের সুযোগ দেয় এবং সীমিত সামরিক উপস্থিতিরও সুযোগ দেয়।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে রাশিয়ার ভারত মহাসাগরে কোনো সামরিক ঘাঁটি নেই। এই চুক্তির মাধ্যমে রাশিয়া সেখানে কৌশলগত উপস্থিতি তৈরি করতে পারবে। দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অমিতাভ সিং বলেন, ‘রাশিয়ার জন্য এটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধজোট নয়, বরং নিষেধাজ্ঞার সময়ে সামরিক গতিশীলতা বজায় রাখার একটি ব্যবস্থা।’ তার মতে, এই চুক্তির মাধ্যমে রাশিয়া তার নৌবাহিনী ও বিমানকে দীর্ঘ সময় ভারত মহাসাগরে মোতায়েন রাখতে পারবে এবং গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুটে সক্রিয় থাকতে পারবে।
তিনি আরও বলেন, এটি রাশিয়াকে এশিয়ায় তার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারত্বের বার্তা দেওয়ার একটি মাধ্যম।
ভারতের প্রাপ্তি ও চীনের প্রভাব
ভারতের সাবেক রাশিয়াবিষয়ক রাষ্ট্রদূত অজয় মালহোত্রা বলেন, এই চুক্তি শুধু অস্ত্র কেনাবেচার সম্পর্ক নয়, বরং এটি অপারেশনাল সহযোগিতার একটি নতুন ধাপ। এটি দুই দেশের মধ্যে বাস্তব সামরিক সমন্বয় বা ইন্টারঅপারেবিলিটি বাড়াবে, যা আগে ছিল না। এই চুক্তির মাধ্যমে ভারত রাশিয়ার আর্কটিক ও দূরপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও কৌশলগত ঘাঁটিতে প্রবেশাধিকার পাবে। তিনি আরও বলেন, এটি ভারতের দীর্ঘদিনের নির্ভরযোগ্য সম্পর্কের ধারাবাহিকতা এবং স্থিতিশীলতার বার্তা দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চুক্তি ভারতকে পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত লজিস্টিক নেটওয়ার্কের বাইরে বিকল্প পথ দেয় এবং এটি আনুষ্ঠানিকভাবে সেই প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে।
অধ্যাপক অমিতাভ সিংয়ের মতে, ভারত এখন প্রশান্ত মহাসাগর থেকে আর্কটিক পর্যন্ত একটি বড় কৌশলগত পরিসরে প্রবেশাধিকার পাচ্ছে, যা চীনের উপস্থিতির ভারসাম্য রক্ষায় সহায়তা করতে পারে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক প্রবীণ ডোনথি বলেন, ‘এটি ভারতের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলকে আরও শক্তিশালী করবে এবং আর্কটিক অঞ্চলে ভারতের অবস্থান বাড়াবে।’
এই চুক্তির মাধ্যমে ভারত রাশিয়ার পূর্ব এবং আর্কটিক অঞ্চলের বন্দরগুলো ব্যবহারের সুযোগ পাবে। ভ্লাদিভস্তক থেকে মুরমানস্ক পর্যন্ত এই রুটটি ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে এই অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান আধিপত্য মোকাবিলায় এটি ভারতকে বাড়তি সুবিধা দেবে। সাবেক রাষ্ট্রদূত অজয় মালহোত্রা আল-জাজিরাকে জানান, এর ফলে ভারত পশ্চিমা নিয়ন্ত্রণাধীন লজিস্টিক নেটওয়ার্কের বাইরেও একটি বিকল্প শক্তি পাবে।
আমেরিকার প্রভাব
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ভারতের সঙ্গে রাশিয়ার এই ঘনিষ্ঠতা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ট্রাম্পের আমদানি শুল্কনীতি এবং রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা নিয়ে ভারতের ওপর চাপ থাকা সত্ত্বেও নয়াদিল্লি এই পথে হেঁটেছে।
আমেরিকার সঙ্গেও ভারতের ‘লেমোয়া’ নামক একটি লজিস্টিক চুক্তি রয়েছে। তবে রাশিয়ার সঙ্গে এই নতুন চুক্তিটি আরও বেশি গভীর, কারণ এতে সেনা মোতায়েনের সুযোগ রাখা হয়েছে।
আল-জাজিরার বিশ্লেষক আন্দ্রে কর্টুনভের মতে, এটি ওয়াশিংটনের প্রতি একটি বার্তা যে, ভারতকে যেন কেউ সস্তা বা ‘টেকেন ফর গ্রান্টেড’ মনে না করে। ভারত মূলত তার ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ বজায় রাখতে চায় এবং ওয়াশিংটন ও মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ককে কোনো ‘জিরো-সাম গেম’ হিসেবে দেখে না। সূত্র: আল-জাজিরা