মস্কো ঘোষিত স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধবিরতি বলবৎ থাকা সত্ত্বেও একে অপরের বিরুদ্ধে তা লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে রাশিয়া ও ইউক্রেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের নাৎসি জার্মানিকে পরাজিত করার স্মরণে আয়োজিত ভিক্টরি ডে উদযাপন উপলক্ষে এই যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়েছিল।
ক্রেমলিন জানিয়েছে, গতকাল শুক্রবার ভোরে তাদের বাহিনী ইউক্রেনের ২৬৪টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। মস্কো ও উরাল পর্বতমালার পার্ম অঞ্চলে হামলার চেষ্টার খবরও দিয়েছে রুশ কর্মকর্তারা।
৮ মে থেকে ১০ মে পর্যন্ত ঘোষিত এই যুদ্ধবিরতি মূলত বার্ষিক ভিক্টরি ডে উদযাপনকে কেন্দ্র করে, যার অংশ হিসেবে মস্কোয় সামরিক কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়। রাশিয়া আগেই সতর্ক করেছিল, উদযাপনে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে কিয়েভের বিরুদ্ধে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হবে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য উত্তেজনার আগে বিদেশি কূটনীতিকদের ইউক্রেনের রাজধানী ত্যাগ করার আহ্বানও জানানো হয়।
অন্যদিকে রাশিয়ার পরিবহন মন্ত্রণালয় শুক্রবার জানিয়েছে, ড্রোন হামলার কারণে দক্ষিণাঞ্চলের ১৩টি বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ইউক্রেনীয় ড্রোন ‘সাউদার্ন রাশিয়া এয়ার নেভিগেশন’ শাখার প্রশাসনিক ভবনে আঘাত হানার পর দক্ষিণ রাশিয়ার আকাশপথ নিয়ন্ত্রণকারী রোস্তভ-অন-ডন আঞ্চলিক কেন্দ্রের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।’
তবে এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি বলে জানানো হয়েছে। ভিক্টরি ডে উদযাপন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ মানুষের প্রাণহানির স্মরণে পালিত হয়। সে সময় সোভিয়েত বাহিনী নাৎসি সেনাদের বার্লিন পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য করে। ১৯৪৫ সালের মে মাসে অ্যাডলফ হিটলারের মৃত্যুর পর রেড আর্মির সোভিয়েত বিজয় পতাকা বার্লিনের রাইখস্টাগ ভবনের ওপর উত্তোলন করা হয়েছিল।
‘আমরা আমাদের জনগণের জীবন রক্ষা করব’
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, যুদ্ধবিরতির মধ্যেও রুশ বাহিনী রাতভর হামলা চালিয়ে গেছে। তিনি এই যুদ্ধবিরতিকে অকার্যকর বলে মন্তব্য করেন। জেলেনস্কির দাবি, শুক্রবার সকাল পর্যন্ত রাশিয়া সম্মুখসারির অবস্থানগুলোতে ১৪০টির বেশি হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি ১০টি বড় আক্রমণ ও ৮৫০টির বেশি ড্রোন হামলাও হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘গত ২৪ ঘণ্টায় যেমন করেছি, আজও ইউক্রেন একইভাবে জবাব দেবে। আমরা আমাদের অবস্থান ও জনগণের জীবন রক্ষা করব।’ ইউক্রেন আরও জানিয়েছে, তারা রাশিয়ার অভ্যন্তরে ইয়ারোস্লাভলে একটি তেল স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। কিয়েভ বলছে, ইউক্রেনীয় শহরগুলোতে হামলার প্রতিশোধ হিসেবেই এই আঘাত হানা হয়েছে।
জেলেনস্কি বলেন, ‘আমাদের শহর ও গ্রামগুলোতে রুশ হামলার জবাবে ইউক্রেনের দূরপাল্লার প্রতিরোধ অব্যাহত রয়েছে।’ কিয়েভ ৬ মে থেকে অনির্দিষ্টকালের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছিল, যা রাশিয়া উপেক্ষা করেছে বলে ইউক্রেনের দাবি। অন্যদিকে মস্কোও ইউক্রেনের প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। ফলে কোনো পক্ষই অপর পক্ষের শর্তে সম্মত হয়নি।
যুদ্ধবিরতির আগে দেওয়া এক বক্তব্যে জেলেনস্কি রাশিয়ার সমালোচনা করে বলেন, মস্কো কেবল ‘তাদের কুচকাওয়াজ নিরাপদে আয়োজনের জন্য সাময়িক বিরতি চায়, যেন বছরে এক ঘণ্টার জন্য নিরাপদে চত্বরে দাঁড়াতে পারে, তারপর আবার মানুষ হত্যা ও যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘রাশিয়ানরা ইতোমধ্যেই ৯ মের পর হামলার কথা বলছে। রুশ নেতৃত্বের এমন বক্তব্য অদ্ভুত এবং অবশ্যই অনুপযুক্ত।’
জেলেনস্কি বলেন, ‘৮১ বছর আগে যেমন হয়েছিল, তেমনি এখনো যুক্তরাষ্ট্র আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ন্যায়সঙ্গত ও দৃঢ় অবস্থান নিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করতে পারে।’ তার ভাষায়, ‘এখন গুরুত্বপূর্ণ হলো, মার্কিন জনগণ রাশিয়াকে ঠিক এইভাবেই দেখুক, একজন আগ্রাসী হিসেবে।’ সূত্র: রয়টার্স