পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত সহকারী চন্দ্রনাথ রথ খুনের ঘটনায় তদন্তে নতুন তথ্য পেয়েছে পুলিশ। তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান, খুনে ব্যবহৃত গাড়িটি ঝাড়খণ্ড থেকে আনা হয়েছিল। ওই গাড়ি থেকেই অনলাইনে টাকা পাঠানো এবং বালি টোলপ্লাজায় ফাস্ট্যাগের মাধ্যমে টোল পরিশোধ করা হয়।
এই ডিজিটাল লেনদেনের সূত্র ধরেই এখন অভিযুক্তদের খোঁজ চালাচ্ছে পুলিশ। যদিও এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি।
ঘটনার তদন্তে রাজ্য পুলিশের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠন করা হয়েছে। এই দলে রয়েছে এসটিএফ এবং সিআইডির কর্মকর্তারাও। তদন্তকারীদের একটি দল ইতোমধ্যেই অভিযুক্তদের সন্ধানে উত্তরপ্রদেশে গেছে। পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ থেকেও মিলছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।
তদন্তকারীদের আশা, সব তথ্য একত্র করে খুব দ্রুতই খুনিদের নাগাল পাওয়া যাবে।
টোলপ্লাজার সিসিটিভি খতিয়ে দেখছে পুলিশ
পুলিশ ইতোমধ্যেই বালি টোলপ্লাজার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে। সেই ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এছাড়া ইউপিআই-এর মাধ্যমে টোলের টাকা দেওয়ায় ডিজিটাল লেনদেনের তথ্যও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কয়েকজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে, তবে গ্রেপ্তারের মতো যথেষ্ট প্রমাণ এখনও হাতে আসেনি।
যেভাবে খুন হয় চন্দ্রনাথ
গত ৬ মে রাতে উত্তর ২৪ পরগানার মধ্যমগ্রামে চন্দ্রনাথ রথকে গুলি করে খুন করা হয়। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, চন্দ্রনাথের গাড়ির সামনে আচমকাই অন্য একটি প্রাইভেটকার এসে দাঁড়ায়। ফলে তার গাড়ি থেমে যায়। সেই সময় দুদিক থেকে বাইকে চেপে আসেন দুষ্কৃতীরা। এরপর চন্দ্রনাথ এবং তার গাড়ির চালককে লক্ষ্য করে পরপর গুলি চালানো হয়। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় চন্দ্রনাথের। গুরুতর জখম অবস্থায় তার গাড়ির চালক এখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
ঘটনার পর ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) অভিযোগের আঙুল তোলে তৃণমূল কংগ্রেসের দিকে। বিজেপির অভিযোগে নিশানা করা হয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কেও। যদিও তৃণমূল এই অভিযোগ অস্বীকার করে ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে এবং আদালতের নজরদারিতে সিবিআই তদন্তের দাবি তুলেছে।
আগেই কষা হয়েছিল খুনের ছক
তদন্তকারীদের অনুমান, অন্তত এক থেকে দেড় মাস আগে থেকেই চন্দ্রনাথকে খুনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। সেই সময়ের মধ্যে তার কারও সঙ্গে বিবাদ বা শত্রুতা হয়েছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঘটনার দিনই পুলিশ হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত গাড়িটি জব্দ করে। তদন্তে জানা যায়, গাড়িতে লাগানো নম্বরপ্লেটটি ছিল ভুয়া। পরে দুষ্কৃতীদের ব্যবহৃত দুটি মোটরসাইকেলও জব্দ করা হয় এবং সেগুলোর নম্বরপ্লেটও জাল বলে জানা যায়। তদন্তকারীদের মতে, পুলিশকে বিভ্রান্ত করতেই এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
বাইক-রহস্যে নতুন মোড়
চন্দ্রনাথ রথ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নতুন করে সামনে এসেছে ‘বাইক-রহস্য’। ঘটনায় ব্যবহৃত গাড়িটি দুষ্কৃতীরা ঘটনাস্থলেই ফেলে পালিয়ে যায়। পরে বৃহস্পতিবার দুষ্কৃতীদের ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। তবে আরও একটি মোটরসাইকেলের খোঁজ এখনও চলছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গাড়িটি ব্যবহার করে চন্দ্রনাথের গাড়ির পথ আটকে দেওয়া হয়। এরপর মোটরসাইকেলে চেপে আসা দুষ্কৃতীরা হামলা চালায়।
শুভেন্দু অধিকারী জানান, মোটরসাইকেলটি ঘটনাস্থল থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরের একটি এলাকা থেকে জব্দ করা হয়েছে। এটির রেজিস্ট্রেশন হয়েছিল আসানসোলের বার্নপুরের বাসিন্দা বিভাস ভট্টাচার্যের নামে। নথিতে একটি কারখানার কোয়ার্টারের ঠিকানা দেওয়া রয়েছে। ২০১২ সালে বাইকটির রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছিল।
তবে তদন্তে গিয়ে পুলিশ জানতে পারে, বর্তমানে ওই ঠিকানায় বিভাস ভট্টাচার্য নামে কেউ থাকেন না। ২০১৪ সাল থেকে সেখানে বসবাস করছেন ধরমবীর কুমার নামে এক কারখানাকর্মী। তিনি জানান, বিভাস নামে কাউকে তিনি চেনেন না এবং ওই ঠিকানায় তার নামে কোনো মোটরসাইকেলও কেনা হয়নি।
পুলিশ সূত্রে খবর, বিভাস ভট্টাচার্যের একটি ছবি তদন্তকারীদের হাতে এসেছে। সেই ছবি নিয়ে এলাকাবাসীর কাছে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করা হলেও এখনও পর্যন্ত কেউ তাকে শনাক্ত করতে পারেননি।
পুলিশের বক্তব্য
ঘটনার রাতেই রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধিনাথ গুপ্তা বলেন, ‘আমরা তদন্ত শুরু করেছি। অপরাধে ব্যবহৃত একটি গাড়ি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। নম্বরপ্লেট বিকৃত করার বিষয়টি তদন্তে উঠে এসেছে। যে নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি আসলে শিলিগুড়ির একটি গাড়ির। ঘটনাস্থল থেকে কয়েকটি কার্তুজ ও লাইভ রাউন্ডও জব্দ করা হয়েছে। আমরা প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।’
তৃণমূলের প্রতিক্রিয়া
তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আদর্শ আচরণবিধি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও গত কয়েকদিনে বিজেপি-সমর্থিত দুষ্কৃতীদের হাতে একাধিক তৃণমূল কর্মী খুন হয়েছেন। আমরা এই ঘটনারও তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি এবং আদালতের নজরদারিতে সিবিআই তদন্তের দাবি করছি।’ সূত্র: আনন্দবাজার, হিন্দুস্তান টাইমস
অমিয়/