কয়েক মাস আগে বাংলাদেশের জনগণ একটি নতুন সরকার গঠনের জন্য ভোট দিয়েছে। তবে সাবেক অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া বিভিন্ন বিতর্কিত সিদ্ধান্তের প্রভাব এখনো দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে স্পষ্ট। কোনো ধরনের সংসদীয় ভোট বা গণ-অনুমোদন ছাড়াই সেই অন্তর্বর্তী সরকার কাউন্সিল ও কমিটির মাধ্যমে একের পর এক অধ্যাদেশ জারি করে দেশ চালিয়েছিল। কোনো জবাবদিহি না থাকায় কমিটির সেই সিদ্ধান্তগুলো মূলত ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া ফরমান বা ডিক্রিতে পরিণত হয়েছিল। আর এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রধান ভূমিকা রেখেছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা ও ব্যক্তিবর্গ।
সেই সময়ে গঠিত অনেক কাউন্সিলের মূল লক্ষ্য ছিল দেশের অর্থনীতি সংস্কার করা। এই প্রক্রিয়ায় তারা দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী, শিল্পপতি এবং ব্যাংকগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানায়। কোনো ধরনের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সেসব হুটহাট ও বিশৃঙ্খল সিদ্ধান্তের নেতিবাচক প্রভাব এখন বর্তমান নির্বাচিত সরকারকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
২০২৫ সালে রয়টার্সকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে ড. মুহাম্মদ ইউনূস দাবি করেছিলেন, শেখ হাসিনা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভুয়া তথ্য দিয়েছিলেন। তার এই বক্তব্যই মূলত পরবর্তী সময়ে উপদেষ্টা ও অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হবে, তা নির্ধারণ করে দেয়। তারা ধরে নেন আগের সবকিছুই যদি ভুয়া হয়, তবে তাদের সেগুলো নতুন করে সাজাতে হবে।
এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে অন্তর্বর্তী সরকার দেশের কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযোগের জাল বুনতে শুরু করে। অথচ এই শিল্প গ্রুপগুলো দেশের ইস্পাত, বস্ত্র উৎপাদন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ভোজ্য তেলের মতো অতি প্রয়োজনীয় খাতের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল। আকস্মিকভাবে এই ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলো তীব্র তোপের মুখে পড়ে।
বেক্সিমকো গ্রুপের সালমান এফ রহমান, গাজী গ্রুপের গোলাম দস্তগীর গাজী এবং ওরিয়ন গ্রুপের মো. ওবায়দুল করিমসহ অনেক ব্যবসায়ী নেতাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ, অর্থ পাচার এবং এমনকি মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো গুরুতর অভিযোগে মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়।
এই কাজে মূল ভূমিকা পালন করে দেশের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তারা তৎকালীন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আহসান মনসুরের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে। মনসুর ও দুদক মিলে সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই এই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের সম্পদ ও সম্পত্তি জব্দ করে। একই সঙ্গে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকে তাদের পদত্যাগে বাধ্য করে সেখানে নিজেদের পছন্দের লোক বসানো হয়। গভর্নর হিসেবে মনসুরের বিদায়ের পর কয়েক মাস কেটে গেলেও এখনো অনেক ব্যবসায়ীর ব্যাংক হিসাব চালু করা হয়নি এবং তাদের ওপর থেকে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞাও প্রত্যাহার করা হয়নি। ফলে দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং পরিবেশ পুরোপুরি বদলে গেছে এবং বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশের শিল্প সম্প্রসারণ থমকে দাঁড়ায়। অনেক ব্যবসায়ী তীব্র ঋণ ও নগদ টাকার সংকটে পড়েন। এর ফলে কিছু কারখানা কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হয় এবং বেশ কিছু কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এটি দেশের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মক্ষমতা ব্যাপকভাবে হ্রাস করে। এর ওপর দেশের মূল্যস্ফীতি মজুরি বৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে গেছে এবং মার্কিন-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির আকাশচুম্বী মূল্যের সঙ্গে দেশ লড়াই করছে।
আহসান মনসুর ও অন্তর্বর্তী সরকার যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন অনেকেই তাদের অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। সমালোচকরা বলেছিলেন, তাদের এই পদ্ধতিগুলো প্রচলিত ব্যাংকিং নিয়মের পরিপন্থি। কিন্তু তখন সেসব উদ্বেগ আমলে নেওয়া হয়নি। এখন সাবেক গভর্নরের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিএসআর তহবিল ব্যবহারের ক্ষেত্রে গুরুতর কেলেঙ্কারির অভিযোগ সামনে এসেছে।
বর্তমান নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার এখন এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের সামনে এখন দুটি পথ খোলা। হয় তারা অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া নীতি অনুসরণ করবে, যার বিরুদ্ধে সাবেক সদস্যরাই এখন মুখ খুলছেন এবং এটিকে একটি গোপন সাত সদস্যের ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ দ্বারা পরিচালিত বলে আখ্যা দিচ্ছেন। অথবা তারা নিজেদের মতো করে একটি স্বাধীন পথ বেছে নিয়ে বাংলাদেশের জন্য একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবে।
নতুন সরকারকে এখন বেশ কয়েকটি প্রধান ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এস আলম গ্রুপের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, নতুন সরকার অন্তর্বর্তী সরকারের সেই অপ্রমাণিত অভিযোগটিই ধরে রেখেছে, যেখানে দাবি করা হয়েছিল এই পরিবারটি অবৈধভাবে তাদের বাংলাদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছে। যদিও এই দাবির পক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই। প্রকৃত পক্ষে, আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের আইনি প্রক্রিয়া থেকে বাঁচতেই অন্তর্বর্তী সরকার এই কৌশলটি বেছে নিয়েছিল। এস আলম পরিবার যদি সিঙ্গাপুরের নাগরিক না হয়ে বাংলাদেশি নাগরিক প্রমাণিত হয়, তবে অন্তর্বর্তী সরকার কারিগরি দিক দেখিয়ে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল এড়াতে পারত। ট্রাইব্যুনালে গেলে তাদের প্রমাণ করতে হতো যে তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এস আলম পরিবারকে লক্ষ্যবস্তু করেনি বা তাদের ব্যবসার ক্ষতি করেনি।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এনসিপি নামের একটি রাজনৈতিক দল এই অভিযোগটি টিকিয়ে রাখতে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার। এই দলটি অন্তর্বর্তী সরকারের অংশীদার ছিল। সম্প্রতি দলটির একজন সদস্য সংসদে এই গ্রুপটি সম্পর্কে এতটাই অযৌক্তিক এবং ভিত্তিহীন দাবি করেছিলেন, পরবর্তী সময় তার জন্য একটি আনুষ্ঠানিক সংশোধনী জারি করতে হয়েছিল।
বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার এই সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা প্রয়োজন। দেশের শিল্প খাত যাতে ঘুরে দাঁড়াতে পারে, সে জন্য অনুকূল পরিবেশ এবং নিয়ম তৈরি করা জরুরি। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং নিয়ম ও কনভেনশনগুলো যথাযথভাবে মেনে চলা দরকার। এটি আশাব্যঞ্জক যে, বর্তমান সরকার প্রধান প্রধান শিল্প খাতগুলোতে পুনরায় নিয়মকানুন প্রতিষ্ঠার জন্য একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ নিচ্ছে। দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের ক্ষেত্রে যেখানে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যাবে, সেখানে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে এর পাশাপাশি নতুন সরকারের উচিত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার পথ খোঁজা, প্রয়োজনে পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখা। সূত্র: ইইউ রিপোর্টার