বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো গবেষণাগারে মানব মেরুদণ্ডের প্রাথমিক কাঠামো নোটোকর্ড তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। এটি মেরুদণ্ডী প্রাণীর শরীরের গঠন নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই সাফল্য মানব বিকাশের প্রাথমিক পর্যায় বোঝার ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
লন্ডনের ফ্রান্সিস ক্রিক ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা গবেষণাগারে মানব স্টেম সেলের মডেল তৈরি করেছেন, যেখানে প্রথমবারের মতো নোটোকর্ড অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নোটোকর্ড একটি দণ্ডাকার টিস্যু, যা ভ্রূণের প্রাথমিক অবস্থায় কোষগুলোকে মেরুদণ্ড ও স্নায়ুতন্ত্র (বক্ষ অঞ্চল) গঠনে সাহায্য করে। এই গবেষণা ১৮ ডিসেম্বর নেচার জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। এটি মানব শরীরের প্রাথমিক বিকাশের জটিল প্রক্রিয়া বোঝার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। নোটোকর্ড মেরুদণ্ডী প্রাণীর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। এটি শরীরের টিস্যুগুলোর সংগঠনে সাহায্য করে ও ভ্রূণের বিকাশের সময় দেহের গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জটিলতা থাকায় এটি আগে কোনো ল্যাবে মানব ট্রাঙ্ক মডেলে অন্তর্ভুক্ত করা যায়নি।
গবেষকরা একটি নির্ধারিত রাসায়নিক সংকেতের ধারা ব্যবহার করে এই কাঠামো তৈরি করেছেন, যা মানব ট্রাঙ্কের প্রাথমিক পর্যায়ের অনুকরণ করে। এটি নিউরাল ও হাড়ের স্টেম সেল অন্তর্ভুক্ত করেছে। এই কারণে বিকাশগত জীববিজ্ঞান গবেষণায় এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এই গবেষণাটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এই উদ্ভাবন জন্মগত মেরুদণ্ডের ত্রুটি ও ইন্টারভার্টিব্রাল ডিস্কের সমস্যাগুলো বোঝার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
গবেষণাগারে মানব মেরুদণ্ডের প্রাথমিক কাঠামো তৈরির পদ্ধতি উন্নত করতে বিজ্ঞানীরা প্রথমে মুরগির ভ্রূণের ওপর বিশদ গবেষণা চালিয়েছেন। এরপর ইঁদুর ও বানরের ভ্রূণের গবেষণায় পাওয়া তথ্যের সঙ্গে তুলনা করে, নোটোকর্ড গঠনে প্রয়োজনীয় মলিকুলার সংকেতের সময়কাল ও ধারাবাহিকতা নির্ধারণ করেছেন।
গবেষকরা এই তথ্যের ভিত্তিতে রাসায়নিক সংকেতের একটি নির্ভুল ধারা তৈরি করেন। মানব স্টেম সেলকে এই সংকেত ব্যবহার করে নোটোকর্ড গঠনে প্ররোচিত করা হয়।
গবেষণার অংশ হিসেবে স্টেম সেল একটি ক্ষুদ্র ‘ট্রাঙ্ক-সদৃশ’ গঠন তৈরি করেছে, যা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ১ থেকে ২ মিলিমিটার পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছে। এতে বিকাশমান স্নায়ুতন্ত্রের টিস্যু ও হাড়ের স্টেম সেল রয়েছে। এগুলো মানব ভ্রূণের বিকাশ প্রক্রিয়ার সঠিক অনুকরণে সজ্জিত আছে।
গবেষকরা মনে করছেন, নোটোকর্ড সঠিক সময়ে সঠিক স্থানে সঠিক ধরনের টিস্যু তৈরিতে কোষগুলোকে প্রভাবিত করছে।
এই গবেষণা জন্মগত মেরুদণ্ড ও স্নায়ুতন্ত্রের ত্রুটি বোঝার একটি নতুন পথ উন্মুক্ত করেছে। এটি মেরুদণ্ডের কশেরুকার মধ্যে থাকা ইন্টারভার্টিব্রাল সম্পর্কিত সমস্যাগুলো বোঝার ক্ষেত্রেও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিতে পারে। এই ডিস্কগুলো নোটোকর্ড থেকে গঠিত হয়। এগুলো বয়সের সঙ্গে ক্ষয়প্রাপ্ত হলে পিঠে ব্যথার কারণ হতে পারে।
মানব বিকাশ ও চিকিৎসা গবেষণার ক্ষেত্রে এই উদ্ভাবনকে যুগান্তকারী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। গবেষণার নেতৃত্বদানকারী ডেভেলপমেন্টাল ডায়নামিক্স ল্যাবরেটরির প্রধান জেমস ব্রিসকো জানিয়েছেন, ‘নোটোকর্ড একটি ভ্রূণের জন্য জিপিএসের মতো কাজ করে। এটি শরীরের মূল অক্ষ স্থাপন এবং মেরুদণ্ড ও স্নায়ুতন্ত্র গঠনে সহায়তা করে। এতদিন গবেষণাগারে এই গুরুত্বপূর্ণ টিস্যু তৈরি করা কঠিন ছিল। এখন আমরা এটি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছি, যা মানব বিকাশ ও বিভিন্ন জটিলতা নিয়ে গবেষণার নতুন পথ খুলে দিচ্ছে।’
গবেষণার লেখক ও ডেভেলপমেন্টাল ডায়নামিক্স ল্যাবরেটরির পোস্টডক্টরাল ফেলো টিয়াগো রিটো বলেন, ‘নোটোকর্ড তৈরির সঠিক রাসায়নিক সংকেত খুঁজে পাওয়া অনেকটা সঠিক রেসিপি খোঁজার মতো। আগের প্রচেষ্টাগুলো সম্ভবত ব্যর্থ হয়েছে কারণ আমরা সংকেত যোগ করার সঠিক সময়কাল বুঝতে পারিনি।’
তিনি আরও বলেন ‘গবেষণাগারে তৈরি আমাদের নোটোকর্ড প্রকৃত ভ্রূণের মতোই কাজ করছে। এটি রাসায়নিক সংকেত পাঠিয়ে চারপাশের টিস্যুগুলোকে সংগঠিত করছে, ঠিক যেমনটি প্রাকৃতিক বিকাশে ঘটে।’ গবেষকরা মনে করছেন, এই মডেল বিকাশজনিত বিভিন্ন জন্মগত ত্রুটি ও জটিলতা নিয়ে গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করবে। এতদিন যেসব বিকাশজনিত সমস্যা সম্পর্কে বিজ্ঞান অন্ধকারে ছিল, সেগুলো বোঝার ক্ষেত্রে এটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করবে। মানব শরীরের প্রাথমিক গঠন ও বিভিন্ন রোগের উৎস নিয়ে আরও গভীর গবেষণার জন্য এই উদ্ভাবনকে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। সূত্র: সাইটেকডেইলি