বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া বিভিন্ন প্রাণী পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্রের কলসাল বায়োসায়েন্সেস নামের একটি বায়োটেকনোলজি প্রতিষ্ঠান। সম্প্রতি তারা কৃত্রিম পরিবেশে থ্রিডি প্রিন্টেড ডিমের খোসা ব্যবহার করে জীবন্ত মুরগির বাচ্চা ফোটাতে সক্ষম হয়েছে। এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতি বিজ্ঞানীদের মধ্যে যেমন কৌতূহল তৈরি করেছে, তেমনি তীব্র বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে।
কলসাল বায়োসায়েন্সেস জানিয়েছে, তাদের তৈরি থ্রিডি প্রিন্টেড ডিমের খোসা থেকে এ পর্যন্ত ২৬টি মুরগির বাচ্চা জন্ম নিয়েছে। এগুলোর বয়স কয়েক দিন থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত। ডিমের স্বাভাবিক খোসার গঠন নকল করে এই বিশেষ থ্রিডি ল্যাটিস বা জালের মতো কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি এর আগে বিলুপ্ত ম্যামথের বৈশিষ্ট্যযুক্ত ইঁদুর এবং ডায়ার উলফের মতো নেকড়ের বাচ্চা তৈরির দাবি করেছিল।
কলসালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বেন ল্যাম জানান, এই কৃত্রিম ডিমের খোসা প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভবিষ্যতে নিউজিল্যান্ডের বিলুপ্ত বিশাল আকৃতির ‘মোয়া’ পাখি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে। মোয়া পাখির ডিম সাধারণ মুরগির ডিমের চেয়ে প্রায় ৮০ গুণ বড় ছিল। বর্তমান সময়ের কোনো পাখির পক্ষে এত বড় ডিম পাড়া অসম্ভব। তাই এই কৃত্রিম প্রযুক্তি বড় আকারের পাখি জন্মাতে সাহায্য করবে। বেন ল্যাম বলেন, প্রকৃতি যেভাবে ডিম তৈরি করেছে, আমরা তাকে আরও উন্নত এবং বড় পরিসরে ব্যবহারের উপযোগী করতে চেয়েছিলাম।
তবে স্বাধীন গবেষক ও বিজ্ঞানীরা এই প্রযুক্তিকে চমৎকার বললেও একে পুরোপুরি কৃত্রিম ডিম বলতে রাজি নন। তাদের মতে, বিলুপ্ত প্রাণী পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা অসম্ভব। বাফেলো ইউনিভার্সিটির বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী ভিনসেন্ট লিঞ্চ বলেন, এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে হয়তো জিনগতভাবে পরিবর্তিত একটি পাখি তৈরি করা সম্ভব, তবে সেটি কখনো আসল মোয়া পাখি হবে না।
গবেষকরা মূলত নিষিক্ত ডিমের ভেতরের অংশ এই কৃত্রিম খোসায় স্থানান্তরিত করে ইনকিউবেটরে রেখেছিলেন। ডিমের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য বাইরে থেকে ক্যালসিয়াম সরবরাহ করা হয় এবং সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হয়। কলসালের বিজ্ঞানীরা জানান, এই খোসায় এমন একটি ঝিল্লি রয়েছে, যা অক্সিজেনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, ডিমের ভেতরে বাচ্চার পুষ্টি ও বর্জ্য নিষ্কাশনের জন্য যেসব অস্থায়ী অঙ্গ থাকে, তা এখানে অনুপস্থিত। তাই ভিনসেন্ট লিঞ্চের মতে, এটি কৃত্রিম ডিম নয় বরং কেবল একটি কৃত্রিম ডিমের খোসা।
শেফিল্ড ইউনিভার্সিটির পাখি প্রজনন বিজ্ঞানী নিকোলা হেমিংস বলেন, কৃত্রিম পাত্রে বাচ্চা ফোটানো একেবারে নতুন কিছু নয়। এর আগেও প্লাস্টিকের ফিল্ম ব্যবহার করে স্বচ্ছ ডিমের খোসা তৈরি করা হয়েছিল। তবে মোয়া পাখি ফিরিয়ে আনার জন্য কলসালকে আরও অনেক পথ পার হতে হবে। প্রাচীন হাড় থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করে তা বর্তমান পাখির জিনোমের সঙ্গে মেলাতে হবে।
এ ছাড়া বিলুপ্ত প্রাণী ফিরিয়ে আনলেও বর্তমান পরিবেশে তাদের টিকিয়ে রাখা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছেন নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির গ্রসম্যান স্কুল অব মেডিসিনের নীতিবিদ আর্থার ক্যাপলান। তিনি বলেন, এই প্রাণীগুলো কোন পরিবেশে বাস করবে তা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিজ্ঞানী হেমিংসের মতে, বিলুপ্ত প্রাণী ফেরানোর চেয়ে বর্তমানে বিপন্ন প্রাণীদের রক্ষায় এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা বেশি যৌক্তিক হবে। সূত্র: দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট


