গান গাওয়া, ছবি আঁকা কিংবা জাদুঘর ও গ্যালারি পরিদর্শনের মতো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড মানুষের বার্ধক্যের গতি কমিয়ে দিতে পারে। শিল্প ও সংস্কৃতির প্রতি সক্রিয় আগ্রহ যে সুস্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, সাম্প্রতিক এক গবেষণায় তার নতুন প্রমাণ মিলেছে। গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, শিল্পকলায় অংশগ্রহণ ও প্রদর্শনী দেখার মতো বিষয়গুলো মানুষকে জৈবিকভাবে তরুণ রাখতে সাহায্য করে।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের (ইউসিএল) সোশ্যাল বায়োবিহেভিয়ারাল রিসার্চ গ্রুপের প্রধান অধ্যাপক ডেইজি ফ্যানকোর্ট এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি জানান, এই ফলাফলগুলো জৈবিক স্তরে শিল্পের স্বাস্থ্যগত প্রভাব প্রদর্শন করে। ব্যায়াম যেভাবে সুস্বাস্থ্যের জন্য স্বীকৃত, শিল্প ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকেও একইভাবে গ্রহণ করার সময় এসেছে। এই গবেষণায় মানুষের ‘এপিজেনেটিক ক্লক’ বা জৈবিক ঘড়ি ব্যবহার করে বার্ধক্যের গতি পরিমাপ করা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত শিল্পচর্চায় অংশ নেন, তাদের বার্ধক্যের গতি অন্যদের তুলনায় অনেক ধীর। সপ্তাহে অন্তত একবার যারা সৃজনশীল কাজে সময় দেন, তাদের বার্ধক্য প্রক্রিয়া প্রায় ৪ শতাংশ ধীর হয়ে যায়। অন্যদিকে, মাসে অন্তত একবার যারা এমন কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন, তাদের ক্ষেত্রে এই হার ৩ শতাংশ।
আরেকটি পরীক্ষায় দেখা গেছে, যারা সপ্তাহে অন্তত একবার শিল্পচর্চা করেন, তারা জৈবিকভাবে সেসব মানুষের তুলনায় গড়ে এক বছরের ছোট থাকেন, যারা খুব কম শিল্পচর্চা করেন। তুলনামূলকভাবে, সপ্তাহে একবার ব্যায়াম করা ব্যক্তিরা মাত্র ছয় মাসের ছোট থাকেন।
গবেষকদের মতে, বার্ধক্যের গতি হ্রাসের ক্ষেত্রে শিল্পের এই প্রভাব এতটাই নাটকীয় যে একে একজন ধূমপায়ী ও ধূমপান ত্যাগ করা ব্যক্তির মধ্যকার পার্থক্যের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। গবেষণার সহ-লেখক ড. ফেইফেই বু বলেন, ‘আমাদের গবেষণা প্রথম প্রমাণ দিল যে, শিল্প ও সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণ ধীর জৈবিক বার্ধক্যের সঙ্গে যুক্ত। শিল্পকলা মানসিক চাপ কমায়, শরীরের প্রদাহ হ্রাস করে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়, যা শরীরচর্চার মাধ্যমেও সম্ভব হয়।’
‘ইনোভেশন ইন এজিং’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণার ফল ৩ হাজার ৫৫৬ জন প্রাপ্তবয়স্কের রক্ত পরীক্ষা এবং জরিপের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের গত এক বছরে গান, নাচ, চিত্রাঙ্কন, ফটোগ্রাফি বা কারুশিল্পে অংশগ্রহণ এবং বিভিন্ন প্রদর্শনী, জাদুঘর ও গ্রন্থাগার পরিদর্শনের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। বিশেষ করে ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে শিল্পের এই ইতিবাচক প্রভাব সবচেয়ে বেশি লক্ষ করা গেছে।
আর্টস কাউন্সিল ইংল্যান্ডের পরিচালক হলি স্মিথ-চার্লস এই ফলাফলকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি মনে করেন, সৃজনশীল কর্মকাণ্ড যে কেবল আনন্দের জন্য নয় বরং দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনের জন্য অপরিহার্য, তা এখন বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রমাণিত। লন্ডন সাউথব্যাংক সেন্টারের শৈল্পিক পরিচালক মার্ক বল বলেন, ১৯৫১ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের পর মানুষের মানসিক ক্ষত নিরাময় ও আশাবাদ জাগাতে শিল্পের ভূমিকা অনস্বীকার্য ছিল। সেই ধারণা আজও একইভাবে প্রাসঙ্গিক।
এই গবেষণা প্রমাণ করে যে, শরীরকে সচল রাখার পাশাপাশি মনকে সৃজনশীল রাখা সুস্থ বার্ধক্যের অন্যতম চাবিকাঠি। জীবনকে অর্থবহ ও দীর্ঘস্থায়ী করতে তাই শিল্প ও সংস্কৃতির চর্চা এখন শুধু শখের বিষয় নয়, বরং সুস্বাস্থ্যের প্রয়োজনীয় অংশ। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান


