পারমাণবিক চুল্লি বা নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর শব্দটির সঙ্গে সাধারণত বিশাল কোনো স্থাপনা বা উচ্চ প্রযুক্তির গবেষণাগারের ছবি আমাদের চোখে ভেসে ওঠে। কিন্তু মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, নিজের বাড়ির পেছনের ছোট ঘরে বা শেডে কি এমন একটি চুল্লি তৈরি করা সম্ভব? তাত্ত্বিকভাবে উত্তরটি হলো—হ্যাঁ। তবে এটি অত্যন্ত জটিল ও বিপজ্জনক একটি প্রক্রিয়া।
নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া মূলত ফিশন ও ফিউশন—দুই ধরনের হয়ে থাকে। ফিশন প্রক্রিয়ায় একটি পরমাণুর কেন্দ্রকে ভেঙে দুটি হালকা অংশে রূপান্তর করা হয়। অন্যদিকে, ফিউশন প্রক্রিয়ায় দুটি হালকা কেন্দ্রকে একত্রিত করে একটি ভারী কেন্দ্র তৈরি করা হয়। শৌখিন প্রযুক্তিবিদরা এই দুই ধরনের বিক্রিয়া ছোট পরিসরে প্রদর্শনের চেষ্টা করতে পারেন।
ফিশন প্রক্রিয়া পরিচালনা করা তুলনামূলক সহজ, কারণ এর জন্য প্রয়োজনীয় তেজস্ক্রিয় পদার্থ দৈনন্দিন কিছু পণ্যে সামান্য পরিমাণে পাওয়া যায়। যেমন, আগুনের ধোঁয়া শনাক্তকারী যন্ত্রে প্রায় ০.২ মিলিগ্রাম আমেরিকিয়াম-২৪১ থাকে। আবার কিছু ক্যাম্পিং লণ্ঠনের আবরণে প্রায় ২৫০ মিলিগ্রাম থোরিয়াম-২৩২ পাওয়া যেতে পারে। এমনকি অন্ধকারে জ্বলে এমন কিছু যন্ত্রে ট্রিটিয়াম নামক তেজস্ক্রিয় উপাদান থাকে।
তাত্ত্বিকভাবে, কেউ যদি পর্যাপ্ত পরিমাণে এই উপাদানগুলো সংগ্রহ করতে পারে, তবে একটি 'ব্রিডার রিঅ্যাক্টর' তৈরির চেষ্টা করা সম্ভব। এই ধরনের রিঅ্যাক্টর মূলত নিউট্রন নিঃসরণের মাধ্যমে থোরিয়াম-২৩২-কে তুলনামূলক বেশি তেজস্ক্রিয় ইউরেনিয়াম-২৩৩-এ রূপান্তর করে।
১৯৯৪ সালে মিশিগানের ডেভিড হান নামের এক তরুণ স্কাউট সদস্য ঠিক এই কাজটি করার চেষ্টা করেছিলেন। তবে তিনি সফল হওয়ার আগেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরে চলে আসেন। তাঁর সেই ছোট পরিসরের যন্ত্রটি আদতে ব্যবহারযোগ্য বিদ্যুৎ শক্তি তৈরি করতে সক্ষম কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
নিউক্লিয়ার ফিশনকে একটি কার্যকর চুল্লিতে রূপান্তর করতে হলে নিউট্রনের গতি নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। এটি এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা, যেখানে চেইন রিঅ্যাকশন স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে কিন্তু নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে বিস্ফোরণ ঘটবে না। একটি ছোট ঘরের পরিবেশে এমন সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন। এছাড়া তেজস্ক্রিয়তা থেকে সুরক্ষা পাওয়ার জন্য শক্তিশালী ঢাল ও চুল্লি ঠান্ডা রাখার জন্য উন্নত শীতলীকরণ ব্যবস্থা প্রয়োজন, যা বাড়িতে তৈরি করা প্রায় অসম্ভব।
বর্তমানে প্রচলিত আধুনিক 'মাইক্রোরিঅ্যাক্টর'গুলোও কমপক্ষে একটি শিপিং কন্টেইনারের সমান বড় হয়। এগুলো থেকে প্রায় পাঁচ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হতে পারে, যা একটি সাধারণ বাগান বা বাড়ির শেডের জন্য অতিরিক্ত। অন্যদিকে, বাড়িতে ফিউশন রিঅ্যাক্টর তৈরি করা সম্ভব হলেও তা থেকে কার্যকর বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না। এতে বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রের সাহায্যে হাইড্রোজেন আয়নগুলোকে একত্রিত করে হিলিয়াম-৩ তৈরি করা হয়। এর ফলে একটি বেগুনি রঙের প্লাজমা তৈরি হয় ঠিকই, কিন্তু বিক্রিয়াটি চালাতে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ হয়, তা উৎপাদিত বিদ্যুতের চেয়ে অনেক বেশি। তাই ঘরে বসে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরির চিন্তাটি বর্তমানে কেবল তাত্ত্বিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ।


