বাংলাদেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আকাশে গত শুক্রবার এক ‘রহস্যময়’ আলো দেখা গেছে। বিশেষ করে পর্যটন শহর কক্সবাজার এবং গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে এই অদ্ভুত আলোকরশ্মি প্রত্যক্ষ করেছেন মানুষ। এরপর থেকেই জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে যে, এই আলো কিসের? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই এটিকে ভিনগ্রহের যান (ইউএফও) বা উল্কাপাত হিসেবে বর্ণনা করেন। তবে এমন ঘটনা নতুন নয়। এর আগেও বিশ্বের নানা প্রান্তে বিভিন্ন সময় এমন অদ্ভুত আলো দেখা গেছে। যেগুলোর রহস্য এখনো অমীমাংসিত। আবার কিছু ঘটনায় নিজেদের মতো ব্যাখ্যা দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তেমনই কিছু ঘটনা ঘটেছে যুক্তরাজ্যের আকাশে।
২০০৬ সালের কথা। ডারহামের রাস্তায় গাড়ি চালানোর সময় ফিল ও তার বন্ধু আকাশে চারটি রহস্যময় আলো সারিবদ্ধভাবে দেখতে পান। গাড়ি থামিয়ে তারা লক্ষ করেন, অনেক উঁচুতে থাকা সেই আলোগুলো কোনো শব্দ ছাড়াই মাথার ওপর দিয়ে চলাচল করছে। ১০ মিনিটের মধ্যে আলোগুলো কখনো বর্গাকার, কখনো আবার হীরক আকৃতি ধারণ করছিল। স্থানীয় একটি রেডিও শো ‘নাইট আউলস’-এ ফোন করেও ফিল এ ব্যাপারে কোনো সদুত্তর পাননি। বরং উপস্থাপক তাকে বিদ্রূপ করেছিলেন। তবে দ্য টেলিগ্রাফের সায়েন্স এডিটর সারা ন্যাপটন ও করেসপন্ডেন্ট জো পিঙ্কস্টোন এখন সেই রহস্যের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
ফিলের অভিজ্ঞতাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের রেকর্ড অনুযায়ী, ২০০৬ সালের ২৯ জুলাই এক পুলিশ অফিসার উত্তর দিকে চলে যাওয়া সারিবদ্ধ ছয়টি হলুদ-কমলা আলো দেখতে পান। এর ঠিক ৪০ মিনিট পর আরেকজন প্রত্যক্ষদর্শী ৯টি কমলা আলোর গোলক দেখতে পান। এমনকি ২০০৭ সালের আগস্টে ডারহামের সিহাম এলাকায় ২০টিরও বেশি রহস্যময় আলোর খবর পাওয়া যায়। উত্তর-পূর্ব ইংল্যান্ডে গত ৫০ বছর ধরে এমন অসংখ্য ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। ১৯৭৭ সালে আরএএফ বুলমারের একজন কর্মকর্তা সমুদ্রের ওপর বিশাল উজ্জ্বল বস্তু দেখেছিলেন। ১৯৮১ সালে হার্টলপুলে প্রতিদিন একই সময়ে রহস্যময় সাদা আলো দেখা যেত। একইভাবে ১৯৯৮ সালে সেঘিল এলাকায় ১২টি সাদা আলো ট্রেনের জানালার মতো সারিবদ্ধভাবে চলতে দেখা গিয়েছিল।
বিজ্ঞানীরা এসব রহস্যের পেছনে বেশ কিছু পার্থিব কারণ খুঁজে পেয়েছেন। মাঝে মাঝে সুন্দারল্যান্ড ফুটবল ক্লাবের ‘স্টেডিয়াম অব লাইট’-এর ঘাস বাঁচিয়ে রাখার জন্য ব্যবহৃত উচ্চ-তীব্রতার গ্রো-লাইট মেঘে প্রতিফলিত হয়ে আকাশে কমলা আভা তৈরি করে। আবার বায়ুমণ্ডলে উল্কাপিণ্ডের বিস্ফোরণ বা মহাকাশের বর্জ্য পুড়ে যাওয়ার ফলেও উজ্জ্বল আলোর গোলক দেখা যেতে পারে, যা ১৯৮০ সালে নিউক্যাসল আবহাওয়া কেন্দ্র নিশ্চিত করেছিল। এ ছাড়া ডারহামের নিকটবর্তী ক্যাটারিক গ্যারিসন এলাকায় সামরিক প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত প্যারাশুট ফ্লেয়ারগুলোকেও অনেকে ভিনগ্রহী যান বলে ভুল করেন।
তবে ফিলের দেখা আলোর গঠনের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হলো ‘স্কাই লণ্ঠন’ বা ফানুস। ২০০৬ সালের আগস্টে যখন ডারহামের আকাশ নিয়ে শোরগোল পড়ে যায়, তখন পল ম্যাককিনি এবং এমা হেনফ্রে নামক এক দম্পতি স্বীকার করেন তারা নতুন বাড়িতে ওঠা উপলক্ষে ফানুস উড়িয়েছিলেন। এই লণ্ঠনগুলো ১০০০ ফুট উঁচুতে উড়তে পারে এবং বাতাসের কারণে এগুলো সারিবদ্ধ বা বিভিন্ন জ্যামিতিক বিন্যাসে চলছে বলে মনে হয়। এগুলো দূর থেকে উজ্জ্বল কমলা বা রুপালি সাদা দেখায় এবং শব্দহীনভাবে চলাচল করে।
যদিও ফিলের অভিজ্ঞতাটি ছিল ২০০৬ সালের মার্চের, তবে সেই সময় উত্তর-পূর্ব ইংল্যান্ডে ফানুস ওড়ানো অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল। এমনকি সে সময় গেটসহেড এবং ডারহাম সীমান্তে ‘হ্যাপি হার্টস লণ্ঠন প্যারেড’ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। একটি ফানুস জ্বলে শেষ হওয়ার আগে প্রায় ৩০ মাইল পর্যন্ত পথ পাড়ি দিতে পারে। মজার ব্যাপার হলো, সে সময় বিক্রি হওয়া লণ্ঠনের প্যাকেটে সতর্কবার্তাই দেওয়া থাকত যে এগুলোকে অনেকে ইউএফও (আনআইডেন্টিফায়েড ফ্লাইং অবজেক্ট বা অশনাক্ত উড়ন্ত বস্তু) ভেবে ভুল করতে পারেন। বর্তমানে পরিবেশ ও প্রাণীর নিরাপত্তার খাতিরে স্থানীয় কাউন্সিলগুলো ফানুস ওড়ানো নিষিদ্ধ করার পর থেকে আকাশে এমন রহস্যময় আলো দেখার হার নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। ফলে ফিলের দেখা সেই ‘নিখুঁত গতির’ আলোগুলো ভিনগ্রহের কোনো যান নয়, বরং মানুষের তৈরি ভাসমান লণ্ঠন হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ


