মস্তিষ্কের প্রদাহ কমাতে ও স্মৃতিশক্তি ফিরিয়ে আনতে বিজ্ঞানীরা এক নতুন ধরনের ন্যাজাল স্প্রে উদ্ভাবন করেছেন। মাত্র দুই ডোজের এই স্প্রে ব্যবহারের ফলে কয়েক মাস পর্যন্ত এর সুফল পাওয়া সম্ভব বলে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটির গবেষকদের এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে আলঝেইমার বা স্মৃতিভ্রংশের মতো রোগের চিকিৎসায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
গবেষকরা জানিয়েছেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মস্তিষ্কের স্মৃতিকেন্দ্রে এক ধরনের প্রদাহ তৈরি হয়। বিজ্ঞানীরা একে ‘নিউরোইনফ্লামেশন’ বা বার্ধক্যজনিত মস্তিষ্কের প্রদাহ বলে অভিহিত করেন। এর ফলে বয়স্কদের মধ্যে প্রায়ই স্মৃতিভ্রম বা ‘ব্রেন ফগ’ লক্ষ করা যায়। তবে ইঁদুরের ওপর চালানো নতুন এই গবেষণায় দেখা গেছে, ন্যাজাল স্প্রে ব্যবহারের মাধ্যমে এই প্রদাহ কমানো এবং স্মৃতিশক্তি পুনর্গঠন করা সম্ভব।
গবেষণাটির প্রধান লেখক অশোক শেঠি বলেন, ‘আমরা এমন একটি চিকিৎসা পদ্ধতি তৈরি করছি যা একদিন ঝুঁকিপূর্ণ অস্ত্রোপচার বা মাসের পর মাস ওষুধ খাওয়ার প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দেবে। আমাদের লক্ষ্য কেবল মানুষের আয়ু বাড়ানো নয়, বরং বার্ধক্যকালেও মানুষকে মানসিকভাবে সজাগ ও কর্মক্ষম রাখা।’
এই ন্যাজাল স্প্রে মূলত ‘এক্সট্রাসেলুলার ভেসিকলস’ নামের কয়েক কোটি আণুবীক্ষণিক জৈব পার্সেলের সমন্বয়ে গঠিত। এগুলো ‘মাইক্রোআরএনএ’ নামক শক্তিশালী জেনেটিক উপাদান বহন করে মস্তিষ্কে পৌঁছে দেয়। মাইক্রোআরএনএ মস্তিষ্কের বিভিন্ন জিন এবং সংকেত পাঠানোর পথগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে। ন্যাজাল স্প্রের মাধ্যমে এই উপাদানগুলো সরাসরি মস্তিষ্কের টিস্যুতে প্রবেশ করে এবং প্রদাহ সৃষ্টিকারী প্রোটিনগুলোকে দমন করে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এই চিকিৎসা মস্তিষ্কের নিউরনের ভেতর থাকা পাওয়ার প্ল্যান্ট বা ‘মাইটোকন্ড্রিয়া’কে নতুন করে সক্রিয় করে তোলে। এতে মস্তিষ্কের কোষগুলোর কর্মক্ষমতা বাড়ে এবং অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমে যায়। পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই স্প্রে প্রয়োগ করা ইঁদুরগুলো পরিচিত বস্তু শনাক্ত করার পাশাপাশি পরিবেশের ছোটখাটো পরিবর্তন বুঝতে দারুণ উন্নতি দেখিয়েছে।
গবেষকরা আরও জানান, এই পদ্ধতি নারী ও পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই সমানভাবে কার্যকর। এমনকি স্ট্রোকের রোগীদের হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি ও মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ফিরিয়ে আনতেও এটি ভবিষ্যতে ব্যবহার করা যেতে পারে। আগামী চার দশকে বিশ্বে ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশ রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এই উদ্ভাবন অত্যন্ত জরুরি ছিল।
ইতোমধ্যেই এই ন্যাজাল স্প্রের পেটেন্টের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে আবেদন করা হয়েছে। গবেষকদের বিশ্বাস, এটি একদিন বার্ধক্যজনিত নানা রোগের চিকিৎসায় যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে। জটিল কোনো পদ্ধতি ছাড়াই নাকের মাধ্যমে সরাসরি মস্তিষ্কের চিকিৎসা করার এই সহজ উপায়টি আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে যাচ্ছে।


