খাদ্যাভ্যাস মানুষের শারীরিক গঠনে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, তার এক অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে আন্দিজ পর্বতমালার আদিবাসীরা। হাজার হাজার বছর ধরে আলু প্রধান খাবার হিসেবে গ্রহণের ফলে তাদের জিনগত পরিবর্তন ঘটেছে। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, আলুর মতো শর্করা জাতীয় খাবার হজম করার জন্য এসব মানুষের শরীরে বিশেষ এক ধরনের জিনের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।
দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ অঞ্চলের আদিবাসীরা আজ থেকে প্রায় ৬ থেকে ১০ হাজার বছর আগে আলুকে চাষযোগ্য শস্য হিসেবে আয়ত্ত করেছিল। তখন থেকে আলু তাদের খাদ্যাভ্যাসের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। নেচার কমিউনিকেশনস সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় জানা গেছে, এই খাদ্যাভ্যাসের ফলে পেরুর আদিবাসী কেচুয়া ভাষাভাষী মানুষের শরীরে ‘এএমওয়াই-১’ নামের জিনের আধিক্য দেখা দিয়েছে। এই জিনটি শর্করা (স্টার্চ) হজম করতে সাহায্য করে।
গবেষকরা দেখেছেন, সাধারণ মানুষের তুলনায় কেচুয়া জনগোষ্ঠীর মানুষের শরীরে এএমওয়াই-১ জিনের সংখ্যা অনেক বেশি। বিশ্বজুড়ে যেখানে অধিকাংশ মানুষের শরীরে এই জিনের কয়েকটি কপি থাকে, সেখানে আন্দিজ অঞ্চলের মানুষের শরীরে গড়ে ১০টি করে জিনের কপি পাওয়া গেছে। মজার বিষয় হলো, এই জনগোষ্ঠীর মানুষের শরীরে জিনের এই পরিবর্তন ঠিক সেই সময়ে শুরু হয়েছিল যখন থেকে তারা আলুর চাষ শুরু করেছিল।
আণবিক (মলিকুলার) পর্যায়ে এএমওয়াই-১ জিনটি লালাগ্রন্থিতে ‘অ্যামাইলেজ’ নামক এনজাইম তৈরিতে ভূমিকা রাখে। এই এনজাইম শর্করা জাতীয় খাবার মুখে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা ভাঙতে শুরু করে। যার শরীরে এই জিনের কপি যত বেশি থাকে, সে তত দ্রুত ও কার্যকরভাবে আলু বা শর্করা জাতীয় খাবার হজম করতে পারে। গবেষক ও বিবর্তনীয় জিনতত্ত্ববিদ ওমের গোকচুমেন একে ‘সংস্কৃতি কর্তৃক জীববিজ্ঞানকে রূপান্তরের এক চমৎকার উদাহরণ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
গবেষণার জন্য গবেষকরা আমেরিকা, ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার ৮৫টি ভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রায় ৩ হাজার ৭০০ জনের জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। এর মধ্যে পেরুর ৮১ জন আদিবাসী কেচুয়া ভাষাভাষী মানুষও ছিলেন। গবেষণায় উঠে এসেছে যে, প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে বিবর্তন প্রক্রিয়া তাদের শরীরে অতিরিক্ত জিনের কপি তৈরি করেছে। যারা বেশি জিনের কপি নিয়ে জন্মেছিলেন, তারা অন্যদের চেয়ে আলুর পুষ্টি বেশি গ্রহণ করতে পেরেছিলেন। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের বংশধরদের মধ্যে এই জিনটি আরও সাধারণ হয়ে ওঠে।
আন্দিজের উচ্চভূমিতে বসবাসরত মানুষের জন্য আলু ছিল ক্যালরির প্রধান উৎস। কারণ, সেখানকার উচ্চতায় অন্যান্য ফসল সহজে জন্মাত না। ১৬০০ শতাব্দীতে স্পেনীয়রা ইনকা সাম্রাজ্য জয় করার পর পেরু থেকে আলু ইউরোপসহ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে পেরুর বাজারে বেগুনি, নীল, লাল, সাদা এমনকি কালো রঙের প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার জাতের আলু পাওয়া যায়। মানুষের বিবর্তন এবং বিপাক প্রক্রিয়ায় খাদ্যাভ্যাসের প্রভাব বোঝার ক্ষেত্রে এই গবেষণা নতুন এক মাত্রা যোগ করেছে।


