প্রযুক্তি বিশ্বে এক অবিশ্বাস্য অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। প্রচলিত সিলিকন চিপের বদলে এবার মানুষের জীবন্ত মস্তিষ্কের কোষ ব্যবহার করে ডেটা সেন্টার চালানোর পরীক্ষা শুরু হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার একটি স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান গবেষণাগারে তৈরি মানুষের নিউরন (স্নায়ুকোষ) দিয়ে বিশ্বের প্রথম ‘বায়োলজিক্যাল ডেটা সেন্টার’ তৈরির কাজ শুরু করেছে। কম্পিউটিং ব্যবস্থাকে আরও সাশ্রয়ী ও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে এই অপ্রচলিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অস্ট্রেলীয় স্টার্টআপ ‘কর্টিক্যাল ল্যাবস’ মেলবোর্নে তাদের প্রথম কেন্দ্রটি স্থাপন করেছে এবং সিঙ্গাপুরে আরও বড় পরিসরে কাজ করার পরিকল্পনা করছে। সাধারণত ডেটা সেন্টারে সারিবদ্ধভাবে রাখা সার্ভার র্যাকগুলোয় শুধু সিলিকন চিপ থাকে। কিন্তু কর্টিক্যাল ল্যাবসের ‘সিএল-ওয়ান’ সিস্টেমে সিলিকন চিপের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে ল্যাবে তৈরি মানুষের জীবন্ত নিউরন।
বিজ্ঞানীদের মূল উদ্দেশ্য সিলিকন চিপকে পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়া নয়, বরং নির্দিষ্ট কিছু জটিল কাজে জীবন্ত কোষ কীভাবে হার্ডওয়্যারকে সহায়তা করতে পারে তা যাচাই করা।
মস্তিষ্কের নিউরন প্রাকৃতিকভাবে তথ্য প্রক্রিয়াকরণে দক্ষ। এগুলো একে অপরের কাছে বৈদ্যুতিক সংকেত পাঠায় এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের সংযোগগুলোকে শক্তিশালী বা দুর্বল করে শেখে। প্রচলিত কম্পিউটিং চিপ এভাবে পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে না। কম্পিউটিং চিপ কেবল আগে থেকে দেওয়া নির্দেশ মেনে চলে।
গবেষকরা দীর্ঘ সময় ধরে এই জৈবিক শেখার ক্ষমতাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন। ইতিপূর্বে ‘নিউরন’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, চিপে বড় হওয়া নিউরনগুলো ভিডিও গেমের প্রাথমিক সংস্করণ খেলতে শিখেছে।
সিএল-ওয়ান সিস্টেমটি একটি হাইব্রিড ডিভাইস। এর প্রতিটি ইউনিটে স্টেম সেল থেকে তৈরি প্রায় ২ লাখ মানুষের নিউরন সরাসরি সিলিকন চিপের ওপর বসানো হয়েছে। একটি বিশেষ ইলেকট্রোড অ্যারের মাধ্যমে জীবন্ত কোষ ও ইলেকট্রনিকসের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা হয়। এই ইলেকট্রোডগুলো কোষকে উদ্দীপিত করতে পারে এবং তাদের প্রতিক্রিয়া রিয়েল টাইমে রেকর্ড করতে পারে। এই নিউরনগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে একটি কৃত্রিম জীবনরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে, যা পুষ্টি, তাপমাত্রা ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে।
বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডেটা সেন্টারগুলোয় প্রচুর বিদ্যুৎ ও পানির প্রয়োজন হচ্ছে। মানুষের মস্তিষ্ক মাত্র ২০ ওয়াট বিদ্যুৎ খরচ করে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় প্যাটার্ন শনাক্ত করা বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো কাজ করতে পারে।
গবেষকদের মতে, নিউরন-ভিত্তিক এই সিস্টেমগুলো সিলিকন চিপের তুলনায় অনেক কম শক্তিতে নির্দিষ্ট কিছু কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম। বিশেষ করে অসম্পূর্ণ ও অস্পষ্ট তথ্য থেকে শেখার ক্ষেত্রে নিউরন অত্যন্ত কার্যকর।
তবে এই প্রযুক্তি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান যেমন গুগল ও অ্যামাজনের ডেটা সেন্টারে লাখ লাখ সার্ভার থাকে, যেখানে কর্টিক্যাল ল্যাবসের কার্যক্রম এখনো ছোট পরিসরে সীমাবদ্ধ। এছাড়া জিপিইউ বা সিপিইউয়ের মতো উচ্চগতির প্রসেসিংয়ের কাজে জৈবিক সিস্টেম কতটা সফল হবে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে।
কম্পিউটার বিজ্ঞানী স্টিভ ফারবার বলেন, ‘মস্তিষ্ক কীভাবে তথ্য সঞ্চয় করে তা আমরা এখনো পুরোপুরি বুঝতে পারিনি। এই প্রযুক্তিকে সাধারণ ব্যবহারের উপযোগী করতে এখনো অনেক পথ বাকি।’
জীবন্ত কোষ নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে কিছু বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। সিলিকন চিপ সব সময় একই ফলাফল দিলেও জীবন্ত কোষের আচরণ সব সময় এক হয় না। তাদের জীবনকাল সীমিত ও নির্দিষ্ট পরিবেশ ছাড়া তারা বাঁচতে পারে না। এছাড়া গবেষণাগারে তৈরি কোষের ব্যবহার নিয়ে নৈতিক প্রশ্নও উঠছে। যদিও বর্তমানের এই কোষগুলোর কোনো চেতনা নেই, তবু ভবিষ্যতে এগুলো আরও জটিল হলে নির্দিষ্ট নির্দেশিকা প্রয়োজন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে সব মিলিয়ে এই উদ্ভাবন কম্পিউটিং জগতের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নতুন করে ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। সূত্র: লাইভ সায়েন্স


