মুরগি জবাই করার পর মাথা ছাড়াই কিছুক্ষণ ছোটাছুটি করছে–এমন দৃশ্য গ্রামাঞ্চলে অনেকের পরিচিত। লোকমুখে প্রচলিত আছে যে, মাথা ছাড়াও মুরগি দীর্ঘক্ষণ বেঁচে থাকতে পারে। এমনকি ১৯৪৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ‘মিরাকল মাইক’ নামের একটি মোরগের ১৮ মাস মাথা ছাড়া বেঁচে থাকার খবর বিশ্বজুড়ে শোরগোল ফেলে দিয়েছিল। কিন্তু বিজ্ঞান কী বলে? মুরগি কি আসলে মাথা ছাড়া বেঁচে থাকতে পারে?
বিজ্ঞানীদের মতে, মাথা বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর কোনো মুরগি আসলে দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকে না। ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির পশু চিকিৎসা হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ড. মার্সি লগসডন বলেন, মাথা কাটার পর মুরগি বড়জোর এক মিনিটেরও কম সময় নড়াচড়া করতে পারে। এই সময়ে ডানা ঝাপটানো বা পা ছোড়া মূলত মাংসপেশির শক্তিশালী সংকোচন মাত্র। একে পুরোপুরি ‘বেঁচে থাকা’ বলা যায় না।
সাধারণত কোনো প্রাণীর মৃত্যু হয়েছে কি না, তা নির্ধারণের দুটি পদ্ধতি আছে–মস্তিষ্কের মৃত্যু ও হৃদযন্ত্রের মৃত্যু। মুরগির ক্ষেত্রে মাথা আলাদা হওয়ার পর প্রথমে মস্তিষ্কের মৃত্যু ঘটে। ‘অ্যানিমেলস’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণা অনুযায়ী, মুরগির ঘাড় মটকে দেওয়ার বা মাথা কাটার ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
কানাডার লেথব্রিজ ইউনিভার্সিটির স্নায়ুবিজ্ঞানী অ্যান্ড্রু ইউয়ানিউক বলেন, মস্তিষ্কের মৃত্যুর কয়েক সেকেন্ড পর হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। এই দুই স্তরের মাঝের কয়েক সেকেন্ড সময়কে কেউ বেঁচে থাকা বলতে পারেন, আবার কেউ মৃত হিসেবেও গণ্য করতে পারেন।
মাথা বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরও মুরগির শরীর কেন নড়াচড়া করে, তার একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা রয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মাথার সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও মেরুদণ্ডের স্নায়ুতে কিছু অবশিষ্ট কার্যক্রম চলতে থাকে। মস্তিষ্ক সাধারণত মাংসপেশিকে শিথিল থাকার সংকেত পাঠায়।
মাথা আলাদা হয়ে গেলে সেই সংকেত পৌঁছানো বন্ধ হয়ে যায়। ফলে পেশিগুলো অস্বাভাবিকভাবে সংকুচিত ও প্রসারিত হতে থাকে, যা আমাদের চোখে নড়াচড়া বা ছোটাছুটি হিসেবে ধরা দেয়। অন্যদিকে হৃদযন্ত্রের পেশিগুলো কোনো স্নায়বিক সংকেত ছাড়া অক্সিজেন শেষ না হওয়া পর্যন্ত ধুকপুক করতে পারে।
যেভাবে বেঁচে ছিল ‘মিরাকল মাইক’
‘দ্য হেডলেস চিকেন’ বা মুণ্ডহীন মুরগি হিসেবে পরিচিত মিরাকল মাইক। ১৯৪৫ সালে লয়েড ওলসেন নামের এক কৃষক মোরগটির মাথা কাটার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। কুঠারের ঘা এমনভাবে পড়েছিল যে, মোরগটির ঘাড়ের ওপরের অংশ বা মুখ বিচ্ছিন্ন হলেও মস্তিষ্কের পেছনের অংশটি অক্ষত থেকে যায়।
বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেন, মাইকের মস্তিষ্কের যে অংশ শ্বাস-প্রশ্বাস, হৃৎস্পন্দন এবং শারীরিক ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে (ব্রেইনস্টেম ও সেরিবেলাম), তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। ফলে সে শুধু ডানা ঝাপটানো নয়, বরং দাঁড়িয়ে থাকতে ও হাঁটতেও সক্ষম হয়েছিল।
কৃষক দম্পতি মাইকের খাদ্যনালি দিয়ে তরল খাবার সরবরাহ করতেন এবং সিরিঞ্জের মাধ্যমে তার শ্বাসপথ পরিষ্কার রাখতেন। এভাবে মাইক ১৮ মাস বেঁচে ছিল এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ১৯৪৭ সালে ভুলবশত সিরিঞ্জ হারিয়ে যাওয়ায় শ্বাস আটকে মাইকের মৃত্যু হয়। এটি আসলে মাথা ছাড়া বেঁচে থাকার অলৌকিক কোনো ঘটনা ছিল না, বরং মস্তিষ্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ কোনোভাবে টিকে যাওয়ায় এক বিরল চিকিৎসাবিজ্ঞানসংক্রান্ত ঘটনার জন্ম দিয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানের উন্নত প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পূর্ণাঙ্গ মস্তিষ্ক ছাড়া কোনো উন্নত প্রাণীর দীর্ঘ সময় টিকে থাকা অসম্ভব। মুরগির মাথা বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরবর্তী কার্যক্রমগুলো কেবল ‘পোস্ট-মর্টেম রিফ্লেক্স’ বা মৃত্যুর পরবর্তী শারীরিক প্রতিক্রিয়া। মিরাকল মাইকের ঘটনাটি একটি অত্যন্ত দুর্লভ ব্যতিক্রম, যা সাধারণ শারীরিক নিয়মের আওতায় পড়ে না। প্রমিত বিজ্ঞানের ভাষায়, মাথা ছাড়া সাধারণ অবস্থায় একটি মুরগি কয়েক সেকেন্ডের বেশি সজ্ঞান বা জীবিত থাকতে পারে না।
মুরগির এই নড়াচড়া মূলত স্নায়ুতন্ত্রের শেষ স্পন্দন। বিজ্ঞানীদের মতে, সাধারণ মানুষের কাছে এটি রহস্যময় মনে হলেও এর মূলে রয়েছে নিছক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। তাই মাথা ছাড়া মুরগির ঘুরে বেড়ানোর গল্পগুলো যতটা না অলৌকিক, তার চেয়ে বেশি বিজ্ঞানসম্মত স্নায়বিক ক্রিয়া।
জবাই করার পর মুরগির নড়াচড়া দেখে আমরা অনেক সময় আতঙ্কিত বা বিস্মিত হই। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, এটি কেবল বিচ্ছিন্ন স্নায়ুর শেষ চেষ্টা মাত্র। মিরাকল মাইকের মতো ঘটনা হাজারে একটি ঘটা সম্ভব নয়। তাই মাথা ছাড়া মুরগির দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকার ধারণাটি ভুল প্রমাণিত হয়েছে। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, এটি কেবল একটি যান্ত্রিক শারীরিক প্রতিক্রিয়া ছাড়া আর কিছুই নয়।
মস্তিষ্ক বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর শরীরের ওপর তার আর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। ফলে পেশিগুলোর অনিয়ন্ত্রিত নড়াচড়াই আমাদের কাছে দৌড়াদৌড়ি বলে মনে হয়। এটি কোনোভাবে প্রাণীর বেঁচে থাকার লক্ষণ নয়। বরং এটি মৃত্যুর এক অনিবার্য ও শেষ পর্যায়।


