ক্রোমোজোম হলো কোষের নিউক্লিয়াসের ভেতরে থাকা সুতার মতো কাঠামো, যা প্রোটিন ও ডিএনএ দিয়ে গঠিত এবং বংশগত বৈশিষ্ট্য বহন করে। এটি জীবের জেনেটিক তথ্য সংরক্ষণ করে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সঞ্চারিত করে, যা প্রতিটি জীবকে অনন্য করে তোলে। মানুষের কোষে সাধারণত ৪৬টি (২৩ জোড়া) ক্রোমোজোম থাকে, যার মধ্যে ২২ জোড়া অটোসোম এবং ১ জোড়া সেক্স ক্রোমোজোম।
বাবা দেন ওয়াই, মা দেন এক্স- লিঙ্গ নির্ধারক এই দুই ক্রোমোজোমের সমন্বয়ে মাতৃগর্ভে গড়়ে ওঠে পুরুষ ভ্রূণ। কিন্তু পুরুষের লিঙ্গ নির্ধারণকারী এই গুরুত্বপূর্ণ ওয়াই ক্রোমোজোম নাকি বিলুপ্তির পথে। সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এই ক্রোমোজোম হারিয়ে যেতে বসেছে, বিজ্ঞানীরা সে বিষয়ে নিশ্চিত। এখন প্রশ্ন, তা হলে কি মানবসভ্যতার বিবর্তনের ইতিহাসের এখানেই ইতি ঘটবে? ওয়াই ক্রোমোজোম পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেলে কি পুরুষরাও বিলুপ্ত হয়ে যাবেন? সে ক্ষেত্রে মানবসভ্যতায় লিঙ্গের ভারসাম্য আর থাকবে না?
জীববিজ্ঞানী জেনি গ্রেভস মানুষসহ বিভিন্ন প্রাণীর বিবর্তন নিয়ে কাজ করেন। ২০০২ সালে তিনিই প্রথম পুরুষের ওয়াই ক্রোমোজোমের আয়ু সম্পর্কে সন্দেহপ্রকাশ করেছিলেন। বলেছিলেন, গত ৩০ কোটি বছরে পুরুষের ওয়াই ক্রোমোজোম ক্রমে বিলুপ্তির দিকে এগিয়েছে। উধাও হয়ে গিয়েছে প্রাচীন ওয়াই ক্রোমোজোমের ৯৭ শতাংশ জিনই। এভাবে চলতে থাকলে আগামী কয়েক কোটি বছরেই পুরুষের এই ক্রোমোজোমটি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
তবে জেনি গ্রেভস বলেছেন, এর অর্থ পুরুষের বিলুপ্তি নয়। আগামী ৫০ থেকে ৬০ লাখ বছরের মধ্যে পৃথিবী থেকে পুরুষরা বিলুপ্ত হয়ে যাবেন। এটা নিয়ে চিন্তিত নন এই জীববিজ্ঞানী। তার ভাষ্য, ‘পুরুষরা এটা নিয়ে কেন উদ্বিগ্ন, তা আমি জানি না। পৃথিবীতে আমরা মানুষ হয়ে আছিই তো মাত্র এই কয়েক লক্ষ বছর ধরে।’
গ্রেভস-সহ বিজ্ঞানীদের একাংশের দাবি, ‘ওয়াই ক্রোমোজোম না থাকলেও পুরুষরা পৃথিবীতে থেকে যাবেন। এ ক্ষেত্রে আপাতত তাদের ভরসা অন্য প্রাণীদের নিদর্শন। পৃথিবীর বুকে একাধিক স্তন্যপায়ী প্রাণী, মাছ এবং কিছু সরীসৃপের জিন থেকে লিঙ্গ নির্ধারক বিশেষ সেক্স ক্রোমোজোম বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। তবু তারা বহাল তবিয়তেই আছে। ইঁদুর শ্রেণির কিছু প্রাণীর শরীর থেকে নিঃশব্দে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে ওয়াই ক্রোমোজোম। পরিবর্তে অন্য ক্রোমোজোম সেই জায়গা নিয়েছে। এলোবিয়াস ট্যালপিনাস, এলোবিয়াস টানক্রেই এবং এলোবিয়াস অ্যালাইকাস নামের তিনটি ইঁদুরের শরীরে এখন রয়েছে শুধু এক্স ক্রোমোজোম ওয়াই ক্রোমোজোমের লিঙ্গ নির্ধারক জিন অন্যত্র সরে গিয়েছে। টোকুডাইয়া ওসিমেসিস নামে আরও এক ইঁদুরের শরীরে ওয়াই ক্রোমোজোমের জায়গায় এসেছে নতুন ক্রোমোজোম।’
প্রফেসর গ্রেভস বলেন, ‘যদি নতুন কোনো ক্রোমোজোম আমাদের ওয়াই-এর চেয়ে ভালো কাজ করে, তবে খুব দ্রুত তা ওয়াই-এর বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। হয়তো ইতোমধ্যে পৃথিবীর কোনো প্রান্তে কোনো মানবগোষ্ঠীর মধ্যে সেই ক্রোমোজোম চলেও এসেছে। আমরা তো এখনই তা জানতে পারব না।’
জীববিজ্ঞানী গ্রেভস দাবি করেন, ওয়াই ক্রোমোজোমের ভূমিকাটি যদি মানবদেহের অন্য কোনো ক্রোমোজোমের মধ্যে স্থানান্তরিত হয়ে যায়, তবে পুরুষের শরীরে বিশেষ ফারাক হবে না। পুরুষ থাকবে এবং তাদের প্রজনন ক্ষমতাও অপরিবর্তিত থাকবে।’
ওয়াই ক্রোমোজোমের ভবিষ্যৎ নিয়ে অবশ্য বিজ্ঞানীরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। বিজ্ঞানীদের একাংশ গ্রেভসদের তত্ত্বে বিশ্বাসী নন। ওয়াই ক্রোমোজোম যে বিলুপ্ত হয়ে যাবে, তা তারা মনেই করেন না। তাদের ভাষ্য, ওয়াই ক্রোমোজোম দীর্ঘ সংগ্রামের সম্মুখীন হয়েছে এবং তা টিকে থেকেছে। ভবিষ্যতেও টিকে থাকবে।
এই দ্বিতীয় তত্ত্বে বিশ্বাস করেন বিবর্তনবাদী জীববিজ্ঞানী জেন হিউজেস। ২০১২ সালে তিনি পরিসংখ্যান তুলে দেখান, গত আড়াই কোটি বছরে মানবদেহ থেকে ওয়াই ক্রোমোজোম বিলুপ্তির হার অনেক কমেছে। অর্থাৎ, পুরুষের ওয়াই ক্রোমোজোম স্থিতিশীল হচ্ছে। হিউজেসের ভাষ্য, ‘আমরা একাধিক স্তন্যপায়ী প্রাণীর ওয়াই ক্রোমোজোমের তুল্যমূল্য বিচার করে দেখেছি। প্রথম দিকে জিনের বিলুপ্তির হার খুব বেশি ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে তা স্থিতিশীল হয়েছে এবং একসময় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ, আর কোনো জিন বিলুপ্তই হয়নি।’
নিজের বক্তব্যের সপক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে হিউজেস বলেন, ‘আসলে ওয়াই ক্রোমোজোমের মধ্যে যে জিনগুলো থাকে, মানুষের শরীরে তার গুরুত্ব অপরিসীম। তাই শরীরে সেই জিন ধরে রাখার তাগিদও বেশি। আমাদেরই শরীরই একে সহজে হারিয়ে যেতে দেবে না।’
গ্রেভস অবশ্য হিউজেসের এই যুক্তি মানেন না। শরীরে তার গুরুত্ব বেশি হলে এবং রক্ষণ শক্তিশালী হলেই যেকোনো জিন বিলুপ্ত হতে পারে না, তা তিনি মানতে চান না। তার দাবি, সম্প্রতি মানুষের শরীরে ওয়াই ক্রোমোজোম কিছু বাড়তি জিন তৈরি করছে। সেগুলো অধিকাংশই নিষ্ক্রিয়। এটি বিলুপ্তির অন্যতম লক্ষণ বলে দাবি করেন গ্রেভস।
বিজ্ঞানীদের দাবি, স্তন্যপায়ীদের পূর্বপুরুষদের ক্ষেত্রে এক্স এবং ওয়াই ক্রোমোজোম অভিন্ন ছিল। একত্রে তাদের ছিল প্রায় ৮০০টি জিন। কিন্তু আজ থেকে ২০ কোটি বছর আগে পুরুষের লিঙ্গ নির্ধারণের ‘বিশেষজ্ঞ’ হয়ে ওঠে ওয়াই ক্রোমোজোম। তখন থেকে পুরুষের শরীরে এক্স এবং ওয়াই মিলিত হওয়া বন্ধ করে দেয়। ওয়াই ক্রোমোজোম তার জিন হারাতে শুরু করে। তবে মেয়েদের শরীরে এক্স আরও একটি এক্স ক্রোমোজোমের সঙ্গে মিলিত হতে পারত। তাই এই ক্রোমোজোমটি অপরিবর্তিত থেকে গিয়েছে। জিন হারাতে হারাতে এখন ওয়াই ক্রোমোজোম বিপন্ন। তাতে পড়ে আছে মাত্র ৩ শতাংশ জিন। বিবর্তনকেই এর জন্য দায়ী করছেন বিজ্ঞানীরা। তথ্য সূত্র: এসটি নিউজ