আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটকে ঘিরে সারা দেশে বিশেষ টহল, অভিযান ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নির্বাচনি মাঠের আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে বিশেষ তৎপরতা শুরু করেছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, আনসারসহ দায়িত্বশীলরা। গত দুই দিন রাজধানী ঢাকার মোহাম্মদপুরসহ ঝুঁকিপূর্ণ কয়েকটি এলাকায় ব্যাপক টহল বা ‘ফুট প্যাট্রোল’ পরিচালনা করেছে সেনাবাহিনী। নির্বাচনে মাঠে থাকবে ৯ লাখ ফোর্স।
অন্যদিকে নির্বাচনি মাঠের আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে এবং উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট অনুষ্ঠানের জন্য কয়েক দিন ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল পরিদর্শন করছেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। আজ রবিবারও তিনি ময়নমনসিংহ অঞ্চল পরিদর্শন করবেন।
অন্যদিকে উপকূলে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রায় ৫ হাজার সদস্য মোতায়েন হওয়ার পর কন্টিনজেন্টগুলোর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ব্যাপক তৎপরতা বা টহল-অভিযান জোরদার করা হয়েছে। সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সারা দেশে ৩৭ হাজার সদস্য মোতায়েন করার কথা জানিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে পুলিশ, র্যাব, আনসারসহ বিভিন্ন সংস্থা। সরকার ও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নির্দেশনা বাস্তবায়নে এসব বাহিনী পেশাদারত্বের সঙ্গে মাঠে দায়িত্ব পালন করছে বলে মন্তব্য করেন দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।
এ প্রসঙ্গে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সামি-উদ-দৌলা চৌধুরী গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্যে সশস্ত্র বাহিনী তথা সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী সর্বোচ্চ পেশাদারত্ব, শৃঙ্খলা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বেশ কিছু সফল যৌথ অভিযান চালিয়েছে। একইভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। এ ছাড়া নির্বাচন ঘিরে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে বিমানবাহিনী। ফলে যেকোনো ধরনের সন্দেহজনক বা অস্বাভাবিক কার্যকলাপ দেখা গেলে তা সেনা বা নৌবাহিনীর ক্যাম্পকে অবহিত করার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে।’
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গতকাল শনিবার রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করতে সেনাবাহিনীর বিশেষ ‘ফুট প্যাট্রোল’ বা হেঁটে টহল পরিচালিত হয়। স্থানীয় সেনা ক্যাম্পের দায়িত্বশীলরা জানান, গতকাল সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত মোহাম্মদপুরের বছিলা ও শেরেবাংলা আর্মি ক্যাম্পের সদস্যদের রায়েরবাজার ও আদাবর এলাকার বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় এই ‘ফুট প্যাট্রোল’ চালানো হয়। এর আগের দিন শুক্রবার সেনাবাহিনীর আজিমপুর আর্মি ক্যাম্প ও কামরাঙ্গীরচর আর্মি ক্যাম্পের উদ্যোগে ঢাকা¬-৭ সংসদীয় আসনের কামরাঙ্গীরচর, লালবাগসহ আশপাশের এলাকায় একই রকম বিশেষ টহল পরিচালনা করা হয়েছে।
এ ছাড়া জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে গত কয়েক দিনে সেনাপ্রধান ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচনকেন্দ্রিক আইনশৃঙ্খলাব্যবস্থা পরিদর্শন করছেন। গত বৃহস্পতিবার সেনাবাহিনীপ্রধান কক্সবাজার এবং সিলেট এরিয়া পরিদর্শনসহ মতবিনিময় সভায় অংশ নেন। তার আগের দিন বুধবার সেনাপ্রধান পটুয়াখালী ও খুলনা পরিদর্শন ও মতবিনিময় করেন। একইভাবে তারও আগের দিন ২৭ জানুয়ারি সেনাবাহিনীপ্রধান রংপুর ও রাজশাহী অঞ্চল পরিদর্শনসহ বেসামরিক প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। প্রায় সবখানেই আলোচনা বা মতবিনিময়কালে সেনাপ্রধান নির্বাচনি মাঠে নিয়োজিতদের পেশাদারত্ব, নিরপেক্ষতা, শৃঙ্খলা, ধৈর্য ও নাগরিকবান্ধব আচরণের মাধ্যমে দায়িত্ব পালনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
অন্যদিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশ নৌবাহিনী সমুদ্র ও উপকূলীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাস, মাদক চোরাচালান ও অন্য অপরাধ দমনে সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে উপকূলীয় এলাকা ও অন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ৮টি জেলায় ১৬টি সংসদীয় আসনে নৌবাহিনীর প্রায় ৫ হাজার সদস্য মোতায়েন রয়েছেন।
পুলিশের মূল লক্ষ্য সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ ভোটের পরিবেশ
জাতীয় নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় ডেভিল হান্ট ফেজ-২ অভিযান চলমান রেখেছে বাংলাদেশ পুলিশ। মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রথম ও প্রধান দায়িত্বপ্রাপ্ত এই বাহিনী এককভাবে, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী বা যৌথ বাহিনীর সহযোগিতা নিয়ে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে গতকাল পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (গণমাধ্যম) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পুলিশের প্রধান দায়িত্ব বা মূল লক্ষ্য হচ্ছে, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষভাবে ভোটের পরিবেশ বজায় রাখা। পুলিশ দায়িত্ব অনুসারে কাজ করে যাচ্ছে। পাশাপাশি ‘ডেভিল হান্ট ফেজ-২’-এর অধীনে অবৈধ অস্ত্র ও চিহ্নিত অপরাধী-সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে বিশেষ অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।’
নির্বাচনে মারণাস্ত্র ব্যবহার করবে না বিজিবি
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ঢাকা সেক্টর কমান্ডার কর্নেল এস এম আবুল এহসান বলেছেন, নির্বাচনকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ‘লেথাল ওয়েপন’ (মারণাস্ত্র) ব্যবহার করবে না। গতকাল মিরপুর জাতীয় সুইমিং কমপ্লেক্সের অস্থায়ী বেস ক্যাম্পে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও জানান, ভোটাররা যাতে নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন পরিবেশে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সে লক্ষ্য সামনে রেখেই এই প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। দেশের ৪ হাজার ৪২৭ কিলোমিটার সীমান্ত সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রেখেই সারা দেশে ৩৭ হাজারের বেশি বিজিবি সদস্য মোতায়েন থাকবেন। দেশের ৪৯৫টি উপজেলার মধ্যে ৪৮৯টিতে বিজিবি নির্বাচনি দায়িত্ব পালন করবে। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী ৬১টি উপজেলায় বিজিবি এককভাবে নির্বাচনি দায়িত্ব পালন করবে।
তিনি আরও জানান, নির্বাচনকালীন যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবির র্যাপিড অ্যাকশন টিম (আরএটি) এবং হেলিকপ্টারসহ কুইক রেসপন্স ফোর্স (কিউআরএফ) প্রস্তুত থাকবে, যারা প্রয়োজন হলে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে সক্ষম হবে। পাশাপাশি নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আরও জোরদার করতে বিশেষায়িত কে-৯ ডগ স্কোয়াড ইউনিটও মোতায়েন থাকবে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আবুল এহসান বলেন, “নির্বাচনে এখন পর্যন্ত কোনো শঙ্কা দেখছি না। বিজিবি মহাপরিচালকের নির্দেশ আমরা নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সর্বচ্চো চেষ্টা করে যাব। তবে কোনো ধরনের ‘লেথাল ওয়েপন’ ব্যবহার করব না।”
১ লাখ সেনাসহ প্রায় ৯ লাখ সদস্য মোতায়েন থাকবেন
গত ১৯ জানুয়ারি সচিবালয়ে এক সভা শেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানিয়েছিলেন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ৮ লাখ ৯৭ হাজার ১১৭ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হবে। যার মধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রায় ১ লাখ সদস্য, নৌবাহিনী ৫ হাজার, বিমানবাহিনী ৩ হাজার ৭৩০ (স্থলভাগ-১ হাজার ২৫০), পুলিশ ১ লাখ ৪৯ হাজার ৪৪৩, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৩১৪, বিজিবি ৩৭ হাজার ৪৫৩, বাংলাদেশ কোস্টগার্ড ৩ হাজার ৫৮৫, র্যাব ৭ হাজার ৭০০ এবং সাপোর্ট সার্ভিস হিসেবে ফায়ার সার্ভিসের ১৩ হাজার ৩৯০ জনসহ সর্বমোট ৮ লাখ ৯৭ হাজার ১১৭ জন সদস্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মোতায়েন থাকবেন। দেশজুড়ে দুই পর্বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তারা মোতায়েন থাকবেন বলে জানান স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা।