শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা নদীর পানি সংরক্ষণে নতুন একটি ব্যারাজ নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। বুধবার (১৮ জুন) প্রথম বাজেট অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে এমপিদের প্রশ্নের লিখিত জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ তথ্য জানান।
এ সময় দ্রুত ও নিরাপদ রেলযাত্রা নিশ্চিত করতে প্রধান প্রধান রুটে বৈদ্যুতিক ট্রেন চালু, আগামী পাঁচ বছরে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশে উন্নীত করা, হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি জোরদার, পাবনা মানসিক হাসপাতালকে আন্তর্জাতিক মানের ইনস্টিটিউটে রূপান্তর এবং হজের ব্যয় কমাতে সরকারের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়।
গতকাল বুধবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের নবম দিনে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের লিখিত জবাব টেবিলে উত্থাপন করা হয়। এদিন রাষ্ট্রীয় কাজে সরকারপ্রধান ঢাকার বাইরে থাকায় তিনি অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন না। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।
রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেনের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, তিস্তা নদীতে শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণের জন্য আরও একটি ব্যারাজ নির্মাণের লক্ষ্যে কারিগরি ও আর্থিক বিষয়গুলো বিভিন্ন পর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনায় ১১০ কিলোমিটার নদীশাসন, ১১০ কিলোমিটার ড্রেজিং, ২২৪ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ এবং ১৭০ বর্গকিলোমিটার ভূমি পুনরুদ্ধারের প্রস্তাব রয়েছে।
কুমিল্লা-১০ আসনের সংসদ সদস্য মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রধান প্রধান রেলপথে ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন বা বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মহাসড়কে এক্সপ্রেসওয়ে গ্রিড, মাল্টিমোডাল পরিবহনব্যবস্থা এবং স্মার্ট মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। যমুনা নদীর ওপর দ্বিতীয় যমুনা সেতু এবং পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া এলাকায় দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণের পরিকল্পনাও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।
মুন্সীগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবদুল্লাহর প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কর প্রশাসনের ডিজিটালাইজেশন, কর ফাঁকি রোধ এবং এআইভিত্তিক সেবা চালুর মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব হবে। ২০৩৫ সালের মধ্যে এ হার ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে।
জামালপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশে হামের প্রাদুর্ভাব রোধে ইপিআই কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। টিকা সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনায় কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দিনাজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মনজুরুল ইসলামের প্রশ্নে তিনি জানান, পাবনা মানসিক হাসপাতালকে আন্তর্জাতিক মানের পূর্ণাঙ্গ মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমান সরকার নির্বাচনি ইশতেহারে উল্লেখিত ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ নীতির আলোকে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে। সরকার বিশ্বমানের স্বাস্থ্যসেবা দিতে বদ্ধপরিকর।
গাজীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য সালাহ উদ্দিনের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হজের ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনা হবে। সেই লক্ষ্যে সরকার কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগ গ্রহণ করবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২৫ সালে হজের সর্বনিম্ন প্যাকেজ ছিল ৪ লাখ ৭৮ হাজার ২৪২ টাকা। ২০২৬ সালে হজের ব্যয় ১১ হাজার ৭৫ টাকা কমানো হয়েছে, যার সুফল হজযাত্রীরা পেয়েছেন এবং ২০২৭ সালের হজ প্যাকেজ মূল্য আরও যৌক্তিক করার চেষ্টা করা হবে।
অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদকে জানান, দেশের ৭৫টি কারাগারে ধারণক্ষমতার চেয়ে প্রায় ১ দশমিক ৭ গুণ বেশি বন্দি রয়েছে। তিনি বলেন, মাদক ও সন্ত্রাস নির্মূলে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে। চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ৩০ হাজার ৭৪৪টি মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে ৯ হাজার ৬৮৫ জন মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ৯ হাজার ২৫১টি মামলা করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের পর বাংলাদেশে অবৈধভাবে লোকজন ঠেলে পাঠানোর (পুশইন) ৩৬টি চেষ্টা প্রতিরোধ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত বিএসএফের পুশইন করা ২ হাজার ৩৬৯ জনের মধ্যে ২ হাজার ১৭৫ জনকে সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর, ১১ জনকে বিএসএফের কাছে ফেরত এবং ১৮৩ জনকে পুশব্যাক করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, সীমান্তে পুশইন, মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধে ‘বর্ডার কমিউনিটি ওয়াচ গ্রুপ’ গঠন, জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জনগণের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকার প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। তিনি জানান, অবৈধ অস্ত্র, মাদক ও অপরাধ দমনে বিশেষ অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি, সিসিটিভি, লোকেশন ট্র্যাকিং ও সাইবার মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে।
জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এর আধুনিকায়নও চলমান রয়েছে। একই সঙ্গে মাদক, ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার রোধে সরকার বদ্ধপরিকর বলে উল্লেখ করেন তিনি। বিট পুলিশিং, কমিউনিটি পুলিশিং, উঠান বৈঠক, বিশেষ অভিযান ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। মাদক কারবারি ও কিশোর গ্যাং সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে তাদের তৎপরতার ওপর কঠোর নজরদারি রাখা হচ্ছে।
এদিকে বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য আমির হামজা প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘চানাচুরের মতো বাজেট’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এটি শুনতে ভালো লাগলেও বাস্তবে জনগণের জন্য স্বস্তি বয়ে আনবে না।