গত মাসে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসার হোয়াইট হাউস সফরে আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের খুবই সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু রামাফোসা এবং তার বর্ণবাদী প্রতিনিধিদল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অদ্ভুত কর্মকাণ্ডের কেবল নীরব দর্শক ছিল, এবং শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানদের প্রতি স্থানীয়দের মনোভাব আকর্ষণে ব্যর্থ চেষ্টা করা হয়েছিল।
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউস পরিদর্শনকারী প্রথম আফ্রিকান নেতা। ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে তিনি যেমন খারাপভাবে আচরণ করেছিলেন, তেমনি ওভাল অফিসে রামাফোসার সঙ্গেও টেলিভিশন সাক্ষাৎকারকে তিনি অদ্ভুত নাটকে পরিণত করেছিলেন।
রামাফোসা এবং তার বহুজাতিক প্রতিনিধিদল ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ ধর্মাবলম্বী এবং বিশ্বজুড়ে ডানপন্থি জেনোফোবদের অর্থাৎ ‘বহিরাগতভীতি’কে লক্ষ্য করেই সহায়তা করে আসছিল। ট্রাম্প বর্ণবাদী প্রথা বজায় রেখে কৃষ্ণাঙ্গদের বর্বর আচরণের মাধ্যমে শ্বেতাঙ্গ কৃষকদের নীচু করার অভিযোগ তুলেছেন। এটি ঐতিহাসিক রেকর্ড ছিল- শ্বেতাঙ্গ সংখ্যালঘুরা তিন শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে কৃষ্ণাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকানদের জমি এবং শ্রমঅধিকার থেকে বঞ্চিত করে রেখেছিল।
ট্রাম্প অবশ্যই সেই ইতিহাস জানেন না। দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ-সংখ্যালঘু সরকার কর্তৃক প্রণীত ১৯১৩ সালের আদিবাসী ভূমি আইন; যা দেশের ৯৩ শতাংশ জমি শ্বেতাঙ্গ মালিকানার জন্য সংরক্ষিত রেখেছিল। বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকার জনসংখ্যার ৭ শতাংশ শ্বেতাঙ্গ এখনো ব্যক্তিগত কৃষিজমির ৭২ শতাংশের মালিক। যদিও রামাফোসার প্রশাসন ২০২৪ সালে একটি আইন প্রণয়ন করে ক্ষতিপূরণ ছাড়াই জমি দখলের অনুমতি দেয়। তবুও এ ধরনের জমি শুধু জনসাধারণের কল্যাণের জন্য ব্যবহার করা হবে এবং যেকোনো বাজেয়াপ্তির বিষয় বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনা সাপেক্ষে হবে।

আজ বিশ্বের সবচেয়ে অসম দেশটিতে ১ কোটি ৩২ লাখ মানুষ অর্থাৎ জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এখনো চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করে, যার মধ্যে বেশির ভাগই কৃষ্ণাঙ্গ। ২০২৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় ২৬,২৩২টি খুনের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছিল, যার মধ্যে ৪৪টি ঘটেছে কৃষক সম্প্রদায়ের মধ্যে। এই ৪৪ জনের মধ্যে আটজন ছিলেন কৃষক। ট্রান্সভাল কৃষি ইউনিয়ন হলো একটি আফ্রিকান কৃষক ইউনিয়ন। সংগৃহীত তথ্যমতে, ১৯৯০ সাল থেকে মাত্র ১,৩৬৩ জন শ্বেতাঙ্গ কৃষককে হত্যা করা হয়েছে, যা সেই সময়ের মধ্যে মোট খুনের ১ শতাংশেরও কম। ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের মার্চের মধ্যে খামারে খুন হওয়া ১৮ জনের মধ্যে মাত্র দুজন শ্বেতাঙ্গ ছিলেন।
বর্ণবাদ যুগের নৃশংসতার সঙ্গে শ্বেতাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকানদের বর্তমান দুর্দশা তুলনা করা যায়, যারা এখনো দেশের বেশির ভাগ সম্পদের মালিক, যা হাস্যকর। তা সত্ত্বেও ট্রাম্প দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ কৃষকদের শরণার্থীর মর্যাদা দিয়েছেন, যাদের মধ্যে ৫৯ জন রামাফোসার সঙ্গে তার সাক্ষাতের কয়েকদিন আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন। এই গোষ্ঠীর জন্য আমেরিকার দরজা খুলে দেওয়া বিশেষ করে যখন ট্রাম্প প্রশাসন অবৈধ ও বৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে, তখন বিপন্ন সংখ্যালঘুদের রক্ষার চেয়ে বরং শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানদের মধ্যে আদিবাসী মনোভাবকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
অবাক করা বিষয়, ট্রাম্প রামাফোসাকে আক্রমণ করেছেন। সর্বোপরি, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন কর্মসূচির ওপর আক্রমণ শুরু করেছেন। বিশ্বস্ত জেনারেলদের সম্মানে সামরিক ঘাঁটির পুরোনো নাম পুনরুদ্ধার করছেন। তিনি আমেরিকার দাসত্বের দীর্ঘ ইতিহাস মুছে ফেলার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছেন।
রামাফোসা এবং ট্রাম্পের মধ্যে কথোপকথনের শুরুতে যথেষ্ট বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু খুব দ্রুতই তা বিতর্কে পরিণত হয়।
রামাফোসাকে ‘বিতর্কিত’ হিসেবে বর্ণনা করার পর আফ্রিকাকে ‘নোংরা দেশ’ বলে আখ্যা দেন ট্রাম্প। তিনি কৃষ্ণাঙ্গ বর্বরতার কথা বলতে গিয়ে বলেন, আফ্রিকায় অনেক খারাপ কাজ চলছে।
ট্রাম্প দক্ষিণ আফ্রিকায় জন্মগ্রহণকারী বিলিয়নিয়ার ইলন মাস্কের গুরুতর দাবির ওপর জোর দিয়েছিলেন যে, কৃষ্ণাঙ্গ নেতৃত্বাধীন আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস (এএনসি) সরকার শ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালাচ্ছে। ট্রাম্প দক্ষিণ আফ্রিকার একজন তুখোর বিরোধী নেতা জুলিয়াস মালেমার একটি ভিডিও প্রদর্শন করেন, যিনি ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে এএনসি থেকে বহিষ্কৃত হন। সেই ভিডিওতে তিনি শ্বেতাঙ্গ কৃষকদের উল্লেখ করে বর্ণবাদ-যুগের একটি গান ‘কিল দ্য বোয়ার’ গেয়েছিলেন। যদিও দক্ষিণ আফ্রিকার সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছিল যে, এ স্লোগানটি সহিংসতার প্ররোচনা নয়, এটি বিভেদ সৃষ্টিকারী প্রতীক।
পরবর্তী ভিডিও যা ইলন মাস্ক ওভাল অফিসের বৈঠকের আগে দুবার পোস্ট করেছিলেন। তাতে সাদা ক্রুশ দেখানো হয়েছিল, যা ট্রাম্প মিথ্যাভাবে দাবি করেছিলেন যে, এটি ১ হাজার জনেরও বেশি খুন হওয়া শ্বেতাঙ্গ কৃষকের সমাধিস্থল। তবে এগুলো ছিল অস্থায়ী স্মারক, কবরস্থান নয়। যদিও তা পরে সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। ট্রাম্প রামাফোসাকে একটি ছবিও দেখিয়েছিলেন, যাতে গণহত্যার শিকার শ্বেতাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকান কৃষকদের একটি ছবি ছিল। পরে জানা যায় যে, এটি কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে তোলা একটি ছবি।
ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব কালারড পিপলের সভাপতি ডেরিক জনসন ট্রাম্পের মন্তব্যকে ‘চরম পক্ষপাতদুষ্ট এবং বর্ণবাদী’ বলে বর্ণনা করেছেন। এগুলো ছিল ক্ষমতার খেলা। কেউ কল্পনাও করতে পারবে না যে, রামাফোসা ট্রাম্পকে প্রিটোরিয়ার ইউনিয়ন ভবনে আমন্ত্রণ জানিয়ে আমেরিকায় ‘কৃষ্ণাঙ্গ গণহত্যা’র অভিযোগ আনবেন। তার পর তাকে শ্বেতাঙ্গ পুলিশ সদস্যদের দ্বারা নির্মমভাবে কৃষ্ণাঙ্গ গাড়িচালকদের হত্যা ও নির্যাতনের একটি ভিডিও দেখাবেন।
হোয়াইট হাউসের বৈঠকে রামাফোসা নির্বোধের মতো বিশ্বাস করেছিলেন যে, তিনি একজন মাফিয়া ডনের সঙ্গে পিস্তল হাতে নিয়ে যুক্তি দেখাতে পারবেন। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট মর্যাদাপূর্ণ শান্ত অবস্থা বজায় রেখেছিলেন। কিন্তু ট্রাম্পের ভুয়া দাবি খণ্ডন করার জন্য যথেষ্ট যুক্তি দেখাতে পারেননি। ট্রাম্পের নির্দেশে তার প্রতিনিধিদল যার মধ্যে তিনজন শ্বেতাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকান, বিলিয়নিয়ার জোহান রুপার্ট, গল্ফারস আর্নি এলস এবং রেটিফ গুসেন ছিলেন। কিন্তু তারাও এই বিষয়টিকে সাহায্য করতে পারেননি।
এই ধনী শ্বেতাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকানদের উপস্থিতি ট্রাম্পকে আশ্বস্ত করেছিল। তিনি উৎসাহের সঙ্গে তাদের বক্তৃতা দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। যদিও তিনি তার কৃষ্ণাঙ্গ প্রতিপক্ষের সঙ্গে মনোযোগ দিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। এলস ইতিহাস সম্পর্কে তার জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করেছিলেন যখন তিনি ১৯৮০-এর দশকে অ্যাঙ্গোলায় বর্ণবাদী সেনাবাহিনীর আক্রমণকে সমর্থন করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন। রুপার্ট দক্ষিণ আফ্রিকার পুলিশ স্টেশনগুলোকে সজ্জিত করার জন্য মাস্কের স্টারলিংক স্যাটেলাইট কোম্পানির পক্ষে লবিং করেছিলেন।
এই প্রতিক্রিয়াগুলো ‘শ্বেতাঙ্গ ত্রাণকর্তা’ কমপ্লেক্সে প্রবেশ করতে বাধ্য করে। আমেরিকান নাইটদের বর্বর কৃষ্ণাঙ্গ অপরাধীদের হাত থেকে দক্ষিণ আফ্রিকানদের বাঁচানোর জন্য বর্ম পরিধান করার জন্য অনুরোধ করে। এমনকি জমি দখলের রেকর্ড স্থাপনের চেষ্টাকারী কৃষ্ণাঙ্গ ট্রেড ইউনিয়নবাদী জিঙ্গিসওয়া লোসিও কৃষ্ণাঙ্গ মহিলাদের ধর্ষণ ও হত্যার কথা বলেছিলেন। এসব বার্তা জোরদার করে, দক্ষিণ আফ্রিকা বড় অপরাধের ক্ষেত্র। বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং পর্যটকদের আকর্ষণ করা থেকে অনেক দূরে।
এ সফরের উদ্দেশ্য ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা-মার্কিন সম্পর্ক ‘পুনঃস্থাপন’ করা এবং বাণিজ্য আলোচনা শুরু করা; যেখানে রামাফোসা তার দেশের গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের কথা তুলে ধরেন। দক্ষিণ আফ্রিকার কর্মকর্তারা এবং কিছু গণমাধ্যমের এ সাক্ষাৎকে সফল বলে প্রচার করার চেষ্টা সত্ত্বেও এটি দুই দেশের মধ্যে গভীর এবং ক্ষতিকারক বিভাজন তৈরি করে। একমাত্র সান্ত্বনা রামাফোসা অন্তত আনুষ্ঠানিক মধ্যাহ্নভোজে অংশ নিতে পেরেছিলেন। কিন্তু জেলেনস্কির ভাগ্যে সেটাও জোটেনি।
লেখক: অধ্যাপক ও সিনিয়র রিসার্চ ফেলো, প্রিটোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, দক্ষিণ আফ্রিকা
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ: সানজিদ সকাল

