দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হবে। আর এ প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো বিনিয়োগ বৃদ্ধি। বিশেষ করে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ অপেক্ষাকৃত অনেক কম। এক দশক ধরে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ প্রায় স্থবির হয়ে আছে। এ খাতের বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য বেশ কিছু করণীয় আছে। প্রথমত; দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবশ্যই ভালো করতে হবে। দ্বিতীয়ত; অবকাঠামো, ট্রান্সপোর্টসহ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইত্যাদি ক্ষেত্রেও নানা ধরনের সমস্যা আছে। এই সমস্যাগুলোর সমাধান করে অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন পর্যন্ত কোনোভাবেই সন্তোষজনক নয়। প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি এবং সর্বোপরি রিজার্ভের কথা চিন্তা করলে- সব মিলিয়ে পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয়। দীর্ঘ সময় ধরেই অর্থনীতি প্রতিকূলতায় রয়েছে, যা এখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করা না গেলে আগামীতে অবস্থা আরও জটিল হয়ে ওঠার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। আমার মতে, অর্থনীতিতে ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে সংস্কারের চেষ্টা চলছে এবং এটা আবশ্যক। আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা। দ্বিতীয়ত হলো, আমাদের বৈদেশিক বিনিময় হারের ক্রমাগত অবমূল্যায়ন হচ্ছে, সেটি স্থিতিশীল করা। এ জন্য আমাদের রপ্তানি আয় বাড়াতে হবে। অনেকেই আমদানি কমানোর কথা বলতে পারে। তবে আমদানি কমালে আমাদের মতো দেশে, যেখানে আমদানি করা পণ্যের বড় অংশই শিল্পের কাঁচামাল বা মধ্যবর্তী পণ্য- সে ক্ষেত্রে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটতে পারে। কাজেই অর্থনীতিতে বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য এখনই কার্যকর ও উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। রপ্তানি কীভাবে বাড়ানো যায়, সে বিষয়ে আমাদের কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সম্প্রতি প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে কিছুটা প্রবৃদ্ধি লক্ষ করা গেছে। এই ধারা অবশ্যই যেন বজায় থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা যথাসময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত ও কার্যকর উদ্যোগ নিতে সক্ষম হই, তবে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিকতার পথে ফিরে আসবে।
বেশ কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও কয়েকবার মুদ্রানীতি পরিবর্তন করেছে। যদিও বাংলাদেশের মতো অর্থনীতিতে শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এ জন্য মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির সমন্বয় সাধন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, মূল্য বৃদ্ধি করে পণ্যের চাহিদা হয়তো কমানো যাবে। কিন্তু পণ্যের জোগান যদি একই সঙ্গে বৃদ্ধি না পায়, তাহলে মূল্যস্ফীতি কমবে না।
দেশের সাধারণ জনগণ বর্তমানে তীব্র চাপ ও সংকটের মধ্যে দিন যাপন করছে। উচ্চ মধ্যবিত্তের মানুষ হয়তো তাদের সঞ্চয় ভেঙে জীবনযাত্রার মানটা রক্ষা করতে পারে। কিন্তু প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কোনো সঞ্চয় নেই। সাধারণ মানুষের জীবনমান ক্রমাগত অবনতির দিকে যাচ্ছে। বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্যের ফলে দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ চরম সংকট ও অসুবিধার মধ্যে রয়েছে। অনেক পরিবার তাদের খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে। কেউবা তুলনামূলক কম পুষ্টিসম্পন্ন খাবার গ্রহণ করছে। অধিকাংশ দরিদ্র মানুষই এখন উচ্চ মূল্যস্ফীতির কশাঘাতে জর্জরিত। প্রান্তিক মানুষের জীবনযাপনের মান ফিরিয়ে আনতে এই শ্রেণির দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হবে। তাদের কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। এ পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় হলো, সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় থাকা প্রকল্পগুলো সুষ্ঠুভাবে কার্যকর হওয়া নিশ্চিত করা। এজন্য যথাযথ নজরদারি ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করতে হবে। দিনের পর দিন সাধারণ মানুষের জীবনমানের ওপর যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে দ্রুতই জনবান্ধবমূলক কর্মসূচি বা পদক্ষেপ নিতে হবে। তা ছাড়া মূল্যস্ফীতির হার যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, মজুরি বৃদ্ধির হার সেভাবে বাড়ছে না। মূল্যস্ফীতি আর মজুরি বৃদ্ধির এই পার্থক্যের কারণে সাধারণ মানুষ সংসারের ব্যয় নির্বাহের ক্ষেত্রে হিমশিম খাচ্ছে। অর্থনৈতিক কার্যক্রম সফল হতে হলে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে হবে। পণ্য পরিবহনকালে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। মূল্যস্ফীতির জন্য রাস্তায় রাস্তায় পণ্য চলাচলকালে এসব চাঁদাবাজি অনেকটাই দায়ী। বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেটের এ ধরনের কারসাজি বন্ধে সরকারি-বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
আমাদের দেশে বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সময় নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন। ফলে একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ করতে হয়। অধিকাংশ সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। রাষ্ট্রীয় সেবামূলক প্রতিষ্ঠান থেকে বিনিয়োগ প্রস্তাব অনুমোদন এবং সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতার সম্মুখীন হতে হয়। নির্দিষ্ট সময় প্রকল্পগুলো বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে যেতে পারে না বলে অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে উৎপাদিত পণ্য অনেক সময়ই উপযোগিতা হারায়। ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো না গেলে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উন্নয়ন অর্জন কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। পণ্যের দাম নির্ভর করে চাহিদার সরবরাহের ওপর। আমাদের চাহিদাও অনেকটা কমে গেছে মনে হচ্ছে। কেননা, ব্যাংকে ঋণের সুদহার বেড়েছে, সরবরাহ বাড়েনি। তা ছাড়া পণ্য সরবরাহে সমস্যা আছে। আমদানি শুল্ক প্রত্যাহারের পরও দাম কমছে না বরং বাড়ছেই। বর্তমানে নীতিনির্ধারক যারা আছেন তাদের এ ব্যাপারে আরও অধিক মাত্রায় তৎপর হতে হবে। ব্যাংক ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি পেলে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ কমে যায়। বিনিয়োগ কমে গেলে উৎপাদন কমে যাবে। আর উৎপাদন কমে গেলে কর্মসংস্থানের পর্যাপ্ত সুযোগ সৃষ্টি হবে না। আর সবার জন্য উপযুক্ততা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা না গেলে দেশে দারিদ্র্য বিমোচন কার্যক্রম কোনোভাবেই কাজে আসবে না। কাজেই মূল্যস্ফীতির অভিঘাত রক্ষার পাশাপাশি আমাদের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে আমাদের রপ্তানি বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতির যে আকার এবং শক্তি, তাতে ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে অন্তত ৪ থেকে ৫ শতাংশ বিনিয়োগ হতে হবে। এই বিনিয়োগ হতে হবে ব্যক্তি খাতে। আমার মতে, বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বৃদ্ধি না পাওয়ার কারণে প্রত্যাশিত মাত্রায় জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করা যাচ্ছে না। বর্তমানে রপ্তানি খাতে সংকোচন প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে। পণ্য রপ্তানি খাত সংকুচিত হলে তা বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ওপর এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করে। রপ্তানি আয় কমে গেলে বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রা টাকার বিনিময় হার বা মান কমে যেতে পারে। স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন হলে সেটা আবার মূল্যস্ফীতিকে ঊর্ধ্বমুখী করে তোলে। কাজেই রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পাশাপাশি অর্থনীতিকে চাঙা করতে হলে রপ্তানি খাতকে আরও বেশি শক্তিশালী করতে হবে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়নে অধিকমাত্রায় গতিশীলতা বৃদ্ধি করা দরকার।
দেশের পুঁজিবাজার সংস্কারে অন্তর্বর্তী সরকার নিশ্চয়ই কাজ করছে। আমি মনে করি, সাধারণ মানুষকে অর্থাৎ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের শেয়ারবাজার সম্পর্কে সঠিকভাবে জেনেবুঝে বিনিয়োগ করতে হবে। তাদের বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকতে হবে। তাদের ভালো কোম্পানির শেয়ার কিনতে হবে। এখানেও যারা দুর্নীতি করবে অথবা আগে যারা দুর্নীতি করেছে তাদের জরিমানাসহ আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। ক্ষতিগ্রস্তরা সচেতন না থেকে বিভিন্ন অপপ্রচার ছড়ায়, যা বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। আমাদের সেগুলো বন্ধ করতে হবে। এসব বিষয়ের মধ্যে যদি আমরা সমন্বয় করতে পারি, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি যদি সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারি এবং নিয়মানুযায়ী অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়ন করতে পারি, তাহলে আশা করা যায় যে, প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে একটি স্থিতিশীল পরিবেশে ফিরে যাওয়া সম্ভব হবে।
লেখক: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা

