বাজেটে মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মানবসম্পদ কি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে তৈরি হয়? মানবসম্পদের ভিত্তি গড়ে ওঠে জীবনের প্রথম কয়েক বছরে। শিশুর মস্তিষ্কের অধিকাংশ বিকাশ ঘটে পাঁচ বছর বয়সের আগেই। ভাষা, চিন্তা, আবেগ, শেখার ক্ষমতা এবং সামাজিক আচরণের ভিত নির্মিত হয় এ সময়েই।...
জাতীয় বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, এটা রাষ্ট্রের নৈতিক অগ্রাধিকারের দলিল। রাষ্ট্র কাদের জন্য ব্যয় করতে চায়, কাদের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেয় এবং উন্নয়নের সুফল কারা পাবে–তার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটে বাজেটে। সেই অর্থে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে বিচার করতে হলে যে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আসে তা হলো–বাংলাদেশের প্রায় চার কোটি শিশু কি এই বাজেটের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে? আরও নির্দিষ্টভাবে বললে, শিশু কি এই বাজেটে দৃশ্যমান?
প্রথম দর্শনে উত্তর ইতিবাচক বলেই মনে হতে পারে। বাজেটের আকার বেড়ে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। মানবসম্পদ উন্নয়নকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু শিশুদের প্রশ্নে কেবল বরাদ্দের অঙ্ক দেখলে চলবে না। কারণ শিশুবান্ধব বাজেটের প্রশ্ন শুধু ‘কত টাকা বরাদ্দ হলো’ নয়, বরং ‘শিশুদের প্রয়োজন কতটা দৃশ্যমান হলো’।
বাজেট ঘোষণার আগে বিভিন্ন শিশু অধিকার সংগঠন, বিশেষ করে ইউনিসেফ, সেভ দ্য চিলড্রেন এবং শিশু অধিকারকর্মীরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিশু সুরক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তায় অধিক বিনিয়োগের দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল–শিশুদের জন্য বরাদ্দকে দৃশ্যমান করতে হবে। অর্থাৎ বাজেটের ভেতরে এমনভাবে শিশুদের উপস্থিতি থাকতে হবে, যাতে সহজেই বোঝা যায় শিশুদের জন্য কত ব্যয় হচ্ছে, কোন খাতে হচ্ছে এবং তার মাধ্যমে কী ফল অর্জন করতে চাওয়া হচ্ছে।
এখানেই মূল প্রশ্নটি তৈরি হয়। সামাজিক সুরক্ষা খাতে বিশাল বরাদ্দ আছে। কিন্তু সেই বরাদ্দের কতটা শিশুদের জন্য? শিশু সুরক্ষা, শিশুশ্রম প্রতিরোধ, বাল্যবিবাহ রোধ, নির্যাতনের শিকার শিশুদের পুনর্বাসন, পথশিশুদের সেবা কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট বরাদ্দ কত? সামাজিক সুরক্ষার বৃহৎ কাঠামোর মধ্যে শিশুদের জন্য সুস্পষ্ট ও দৃশ্যমান অংশ কতটা রয়েছে?
এ প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাজেটে শিশুদের জন্য আলাদা লক্ষ্য ও দৃশ্যমান বরাদ্দ না থাকলে বাস্তবায়নের পর্যায়ে শিশুরা প্রায়ই অগ্রাধিকারের তালিকা থেকে হারিয়ে যায়। সামাজিক সুরক্ষা তখন পরিবার, প্রতিষ্ঠান কিংবা অন্যান্য গোষ্ঠীকে ঘিরে পরিচালিত হয়, কিন্তু শিশুর নির্দিষ্ট চাহিদা আড়ালে থেকে যায়।
একই ধরনের প্রশ্ন মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বাজেটে মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মানবসম্পদ কি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে তৈরি হয়? অর্থনীতিবিদ ও শিশু বিকাশ বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, মানবসম্পদের ভিত্তি গড়ে ওঠে জীবনের প্রথম কয়েক বছরে। শিশুর মস্তিষ্কের অধিকাংশ বিকাশ ঘটে পাঁচ বছর বয়সের আগেই। ভাষা, চিন্তা, আবেগ, শেখার ক্ষমতা এবং সামাজিক আচরণের ভিত নির্মিত হয় এ সময়েই।
ফলে মানবসম্পদ উন্নয়নের কথা বলতে হলে প্রারম্ভিক শৈশব বিকাশ, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা, শিশুর পুষ্টি, মাতৃস্বাস্থ্য, প্যারেন্টিং সাপোর্ট এবং মানসিক বিকাশকে কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখতে হয়। প্রশ্ন হলো, বাজেটে মানবসম্পদ উন্নয়নের যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, সেখানে এই প্রারম্ভিক বিনিয়োগ কতটা দৃশ্যমান?
শিক্ষা খাতেও একই ধরনের বাস্তবতা দেখা যায়। বাজেটে শিক্ষার আধুনিকায়নের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আধুনিক শিক্ষা বলতে আমরা কী বুঝি? শুধু নতুন ভবন, স্মার্ট ক্লাসরুম কিংবা প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগকে আধুনিকায়ন বলা যায় না। আধুনিক শিক্ষা মানে এমন শিক্ষা, যা শিশুর কল্পনাশক্তি, সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং মানবিক বোধকে বিকশিত করে।
আজকের বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের যুগে শিশুরা কেবল মুখস্থনির্ভর শিক্ষার মাধ্যমে টিকে থাকতে পারবে না। তাই শিক্ষার আধুনিকায়নের আলোচনায় গ্রন্থাগার, শিল্প-সংস্কৃতি শিক্ষা, বিজ্ঞানচর্চা, ডিজিটাল সাক্ষরতা এবং মানসিক সুস্থতার বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাজেটে এসব বিষয় কতটা অগ্রাধিকার পেয়েছে, সেটাও বিবেচনার দাবি রাখে।
শিশুদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। অপুষ্টি, রক্তস্বল্পতা, মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। অথচ গবেষণা বলছে, শিশুর জীবনের প্রথম এক হাজার দিনে বিনিয়োগ তার সারা জীবনের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। ফলে প্রারম্ভিক শৈশবকালীন বিকাশে শিশু পুষ্টিতে বিনিয়োগকে স্বাস্থ্য খাতের ব্যয় হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক বিনিয়োগ হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
তবে শিশুর প্রয়োজন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। শিশু সুরক্ষা, নিরাপত্তা, বিনোদন, সংস্কৃতি, মানসিক স্বাস্থ্য এবং আত্মিক বিকাশও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এসব বিষয় বাজেট আলোচনায় তুলনামূলকভাবে অনেক কম দৃশ্যমান।
জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ শিশুদের খেলা, অবসর, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং বিনোদনকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। অথচ বাংলাদেশের বাজেট আলোচনায় শিশুদের আনন্দের অধিকার প্রায় অনুপস্থিত। আমরা শিক্ষা নিয়ে কথা বলি, পুষ্টি নিয়ে কথা বলি, কিন্তু শিশুদের খেলার মাঠ, শিশু পার্ক, পাঠাগার, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র কিংবা নিরাপদ বিনোদনের সুযোগ নিয়ে খুব কমই আলোচনা করি।
শিশু কেবল পরীক্ষার্থী নয়। সে খেলবে, গল্প পড়বে, ছবি আঁকবে, গান শিখবে, নাটক করবে, বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে দৌড়াবে। আনন্দও শিশুর অধিকার। শিশুবান্ধব সমাজ কেবল শিশুদের বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করে না, তাদের আনন্দময় শৈশবও নিশ্চিত করে।
একইভাবে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য এখন বৈশ্বিক উদ্বেগের বিষয়। প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষাব্যবস্থা, ডিজিটাল আসক্তি, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, পারিবারিক চাপ এবং জলবায়ুজনিত অনিশ্চয়তা শিশুদের মানসিক সুস্থতাকে প্রভাবিত করছে। কিন্তু বাজেটে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, কাউন্সেলিং বা মনোসামাজিক সহায়তা কতটা দৃশ্যমান, সে প্রশ্নও রয়ে যায়।
ডিজিটাল নিরাপত্তাও এখন শিশু অধিকার প্রশ্নের অংশ। শিশুরা ক্রমশ অনলাইন জগতে প্রবেশ করছে। কিন্তু সাইবার বুলিং, অনলাইন হয়রানি, ক্ষতিকর কনটেন্ট এবং ডিজিটাল ঝুঁকি থেকে তাদের সুরক্ষার জন্য কী ধরনের বিনিয়োগ ও প্রস্তুতি রয়েছে, তা নিয়ে আরও স্পষ্টতা প্রয়োজন।
শিশুদের আত্মিক ও নৈতিক বিকাশের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। আত্মিক বিকাশ বলতে এখানে ধর্মীয় শিক্ষার বাইরে সততা, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ, মানবিকতা, নাগরিক চেতনা এবং সামাজিক সম্প্রীতির মতো মূল্যবোধের বিকাশকে বোঝানো হচ্ছে। একটি উন্নত রাষ্ট্র কেবল দক্ষ কর্মী তৈরি করে না, দায়িত্বশীল মানুষও তৈরি করে। কিন্তু শিশুর ভেতর নেতৃত্বে এই দক্ষতা বৃদ্ধি ও মানবিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক বিনিয়োগ বাজেটে কতটা প্রতিফলিত হয়েছে, সেটাও বিবেচনার বিষয়।
শিশুদের নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা প্রায়ই একটি প্রচলিত বাক্য ব্যবহার করি–‘শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ।’ কথাটি ভুল নয়, কিন্তু অসম্পূর্ণ। কারণ শিশুরা শুধু ভবিষ্যতের নাগরিক নয়, তারা বর্তমানেরও নাগরিক। তাদের অধিকার ভবিষ্যতের জন্য স্থগিত রাখা যায় না। তাদের নিরাপত্তা, আনন্দ, মানসিক সুস্থতা, সৃজনশীলতা এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকার আজকের, এই মুহূর্তের।
তাই শিশুবান্ধব বাজেটের প্রশ্ন কেবল আগামী দিনের মানবসম্পদ গড়ার প্রশ্ন নয়, এটা আজকের শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্ন। শিশুবান্ধব রাষ্ট্রের পরিচয় পাওয়া যায় তখনই, যখন রাষ্ট্র শিশুদের ভবিষ্যতের বিনিয়োগ হিসেবে নয়, বর্তমানের মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শিশুদের জন্য কিছু ইতিবাচক বার্তা আছে। কিন্তু প্রয়োজন ও বরাদ্দের তুলনামূলক বিশ্লেষণ বলছে, মূল চ্যালেঞ্জ বরাদ্দের পরিমাণে নয়, শিশুদের দৃশ্যমানতায়। সামাজিক সুরক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষা সংস্কার কিংবা স্বাস্থ্য খাত–সব ক্ষেত্রেই শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট লক্ষ্য, দৃশ্যমান বরাদ্দ এবং পরিমাপযোগ্য ফলাফল আরও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
কারণ কোনো দেশের উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত জিডিপি, অবকাঠামো বা প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে নয়, দেশের শিশুরা কতটা নিরাপদ, কতটা সুখী, কতটা সৃজনশীল এবং কতটা মর্যাদার সঙ্গে বেড়ে উঠছে, তা দিয়েও পরিমাপ করা হয়। আর সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য বাজেটকে শুধু শিশুবান্ধব হলেই চলবে না, শিশুদের জন্য দৃশ্যমানও হতে হবে।
লেখক: কথাসাহিত্যিক